টানা সাতবার। না ভুল শুনেননি; গত সাত বছর ধরে বিশ্বসেরাদের পুরস্কার মঞ্চে উঠেছেন তিনি। তার মধ্যে দুবার হয়েছিলেন বিশ্বসেরা। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা, লা লিগার শিরোপা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি — কি নেই তার! ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নক্ষত্র হতে আর কি করা লাগে?
কিন্তু, কাকা, জিদান, পেলে, ম্যারাডোনার থেকে যে একটা জায়গায় সব সময়ই পিছিয়ে পড়েন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সেই পিছিয়ে পড়া হলো বিশ্বকাপে বড় কিছু করতে না পারার ব্যর্থতা। ১৯৬৬ সালে কিংবদন্তী ফুটবলার ইউসেবিওর জমানায় বিশ্বকাপে তৃতীয় অবস্থানে থেকে বিশ্বকাপ শেষ করেছিল পর্তুগাল। তারপর বড় একটা সময় কাটে বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে। ইউরোপিয়ান দেশটি নতুন করে ফুটবল-স্বপ্ন দেখতে শুরু করে নতুন একটি প্রজন্মের আগমনের মধ্য দিয়ে। লুইস ফিগো, ডেকোদের নিয়ে সমর্থকরা আরও ভাল পারফরম্যান্স আশা করতে থাকেন। সব মিলিয়ে সেই আশায় তাদের ধুলোয় মিশে যায়। ২০০৪ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের রানার আপ হওয়া ও দুবছর পরের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পৌঁছান বাদ দিলে বড় কোন সাফল্য নেই দলটির।
২০০৬ সালের জার্মানিতে সেই বিশ্বকাপ দলে ছিলেন রোনালদো। গ্রুপ পর্যায়ের ম্যাচে ইরানের বিপক্ষে গোলও করেছিলেন। সেদিনের সেই ক্ষুদে রোনালদো এবার পর্তুগালের তো বটেই বিশ্বকাপেরই অন্যতম বড় তারকা। তাই তাকে ঘিরে প্রত্যাশাও ছিল বেশি। সাথে ছিলেন পেপে, ফ্যাবিও কোয়েন্ত্রাও, রাউল মেরিলেসের মত এক ঝাঁক তারকা।
কিন্তু সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেলো এক ঝাঁপটায়। ঝড় তুললেন জার্মানরা। প্রথম ম্যাচে ৪-০ গোলে হারের পরই আর মাথা তুলে দাঁড়ানো হয়নি দলটির। সেই ম্যাচে লাল কার্ড দেখা পেপে খেলতে পারেননি যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। সাথে, ফ্যাবিও কোয়েন্ত্রাওয়ের ইনজুরিতে বড় একটা বিপাকেই পড়ে গিয়েছিল পতুর্গাল। শেষ ম্যাচে তাই তাদের সামনে ছিল প্রায় অসম্ভব এক সমীকরণ।
কিন্তু, হলো না! পারলেন না ‘সি আর সেভেন’। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে একের পর এক অসম্ভবকে সম্ভব করা এই তারকা ব্যর্থ হলেন জাতীয় দলের হয়ে। যদিও ঘানার বিপক্ষে শেষ ম্যাচটি ২-১ গোলে জিতে নিয়েছে পতুর্গাল। ডি স্টেফানো, জর্জ বেস্টদের মত কিংবদন্তীরা কোনদিন বিশ্বকাপ খেলারই সুযোগ পাননি! সেই তুলনায় অন্তত নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতে পারেন রোনালদো।
আশি মিনিটে দলকে এগিয়ে নেয়ার গোলটি করেন রোনালদোই। খেলার ধারার বিপরীতেই গোল করে দলকে লিড এনে দেন তিনি। জোনাথন মেনসাহর হেড না ধরে দাউদা সামনে ফেলে দিয়েছিলেন। বল পেয়ে যান রোনালদো। গোল করার সহজতম সুযোগটি হাতছাড়া করেননি তিনি। যেভাবেই গোলটি আসুক না কেন রোনালদোর জন্য এটা হতে পারতো অসামান্য আনন্দের এক মুহূর্ত। এটাই যে তার ৫০ তম আন্তর্জাতিক গোল।
কিন্তু বিশ্বকাপে টিকে থাকতে হলে যে, আরো তিনটি গোল প্রয়োজন ছিল পর্তুগালের। শেষ দশ মিনিট আর যোগ করা পাঁচ মিনিটে অসংখ্য সুযোগও তৈরি করেছিল তারা। কিন্তু আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের ব্যর্থতায় তার একটিও কাজে লাগাতে পারেনি দলটি। পর্তুগালের সাথে সাথে ব্যর্থ হলেন রোনালদো।
ব্রাসিলিয়ার মানে গ্যারিঞ্চা ন্যাসিওনাল স্টেডিয়ামের দর্শকরা উঠে দাঁড়িয়ে করতালি দিলেন। রোনালদো যেন কান্না ধরে রাখতে পারলেন না। চোখে-মুখে রাজ্যের হতাশা ঢাকতে দু’হাত দিয়ে চেপে ধরলেন মুখ। সে জন্যই হয়তো অশ্রু চোখে পড়লো না।
বিশ্বকাপ দেখলো এক নক্ষত্রের পতন!
