অপর্যাপ্ত ড্রেনেজব্যবস্থা ও পানি নিষ্কাশনের অভাবে রাজধানীতে বর্ষা হলেই দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা। কোনো কোনো এলাকা দিনের পর দিন জলাবদ্ধ হয়ে থাকাও নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মৌসুমে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নাগরিকজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। জলাবদ্ধতা কমাতে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ একের পর এক পরিকল্পনা নিলেও তাতে তেমন কোনো লাভ হচ্ছে না। রাজধানীর জলাবদ্ধতা কমাতে নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন, সমপ্রসারণ, খাল সংস্কার, নর্দমা ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কারের কাজে গত কয়েক অর্থবছরে কয়েক শ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু তারপরও এই বিপুল অর্থ ব্যয় জলাবদ্ধতা হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারেনি।
সমপ্রতিক সময়ে টানা বর্ষণে রাজধানীর অনেক এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে নগরজুড়ে। রাজধানীতে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ন। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতো নগরায়নের সর্বক্ষেত্রে যে অব্যবস্থাপনার ছাপ রয়েছে, তার খেসারত দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
এক সময় রাজধানীর পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহূত হতো বেশ কিছু প্রাকৃতিক খাল। এসব খালের বেশিরভাগই বেদখল এবং ভরাট হয়ে গেছে। অদ্ভুত এ দেশে সরকারি বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন খাল এমনকি নদীও বেদখল হয়ে যায়। যারা জনগণের ট্যাক্স-টাকায় পরিচালিত হয়, সরকারের সেই ভূমি দফতরের কিছু অসত্ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে খালখেকোদের পোয়াবারো। ফলে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয় রাজধানীতে। অচলাবস্থা সৃষ্টি হয় নগরজীবনে। নাগরিকদের ভোগান্তির সৃষ্টি হয়।
জলাবদ্ধতা নিরসনে রাজধানীতে ড্রেন ও সুয়ারেজ মেরামত এবং উন্নয়ন কাজগুলো মার্চ মাসের আগেই শেষ করা উচিত। প্রতিবছর এসব কাজ এপ্রিল-মে মাসে শুরু করা হয় এবং জুন, জুলাই ও আগস্টের ভরা বর্ষা মৌসুমে ঠিকাদাররা রাস্তা খুঁড়ে বসে থাকে। এসব কারণেও রাজধানীর অনেক স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অর্থবছর যেখানে শুরু হয় জুলাই মাসে, সেখানে নয়-দশ মাস পার করে বর্ষার আগে কাজ শুরু করার বদভ্যাসটি বন্ধ হওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি। জলাবদ্ধতা বন্ধে রাজধানীর তিন সেবাদানকারী সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয় করা ছাড়া উপায় নেই। ওয়াসা, ডেসা ও সুয়ারেজের কাজের সমন্বয়ে আলাদা কোনো মন্ত্রণালয়কে অথবা সিটি কর্পোরেশনকে এর তদারকির দায়িত্ব দিতে হবে।
অপরিকল্পিত নগরায়নের কুফল ভোগ করছে রাজধানীর সমস্ত মানুষ। এত মানুষের এই দুর্ভোগ যদি রাজধানীতে প্রতিবারই সৃষ্টি হয় আর এর পরেও যদি যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তবে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে! ক্রমাগত সৃষ্টি হওয়া রাজধানীর এই জলাবদ্ধতা যেভাবে ঘটে চলেছে, তা নিরসনে সঠিক উদ্যোগ নিতে হবে। কেননা একটি স্বাধীন দেশে গণতান্ত্রিক সরকার থাকতে এভাবে বৃষ্টির পানি আটকে পুরো শহরের মানুষের স্বাভাবিক গতি থমকে যাবে, তা হতে পারে না। ফলে এ অবস্থাকে কাটিয়ে উঠতে পদক্ষেপ নিতেই হবে। গড়ে তুলতে হবে পর্যাপ্ত ড্রেনেজব্যবস্থা। পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক পাম্প বসানো, নর্দমা, কালভার্ট এবং খালগুলো পরিষ্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। আর এগুলো যতদিন না বাস্তবায়ন করা হবে, ততদিন এই দুর্ভোগের কবলে পড়তে থাকবে রাজধানীবাসী। বছরের পর বছর ধরে সামান্য বৃষ্টিতেই এ নগরীর অধিকাংশ রাস্তায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। দুর্বল ও অপ্রতুল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাই এর প্রধান কারণ। রাজধানীর গুলশান, ধানমন্ডি, বনানী ও উত্তরার লেকের আশেপাশের নির্মাণাধীন ভবনের ব্যবহূত রাবিশ লেকে ফেলা হচ্ছে। যার কারণে লেকের নাব্যতা হারিয়ে ময়লার স্তূপ হতে বসেছে। কর্তৃপক্ষকে সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে।
আমার মতে, নাগরিকদের ভোগান্তি দূর করতে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অধীনে অতি সহজেই রাজধানীর মধ্যকার লেকগুলোকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রয়োজনীয় খননকাজ করে নাব্য করতে হবে। গুলশান, ধানমন্ডি, বনানী ও উত্তরার লেক তদুপরি হাতিরঝিলের মতো প্রাকৃতিক জলাধারগুলোকে দখলদারমুক্ত ও রক্ষা করার মাধ্যমেও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে অগ্রগতি অর্জন করা যায়। রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে বেদখল হওয়া খালগুলো। ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন ও সমপ্রসারণ ঘটিয়ে দ্রুত পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা
