জলাবদ্ধতা বন্দরনগরীর ৬০ লাখ মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক ঘণ্টার টানা ভারি বর্ষণ হলেই নগরীর এক তৃতীয়াংশ এলাকা কোমর পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়। প্রতিবছর জলাবদ্ধতায় হাজারো কোটি টাকার সম্পদ ও ব্যবসায়িক ক্ষতি হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পুকুর, খাল ও নালা-নর্দমা ভরাট, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, পাইলিং ও পাহাড়ি পলি মাটি নগরীর পানি নিষ্কাশনের সকল পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। যানজট নিরসনে হাজারো কোটি টাকা বরাদ্দ মিললেও জলজট নিরসনে মিলে না। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সিটি কর্পোরেশন ও সিডিএ’র মধ্যে কোন সমন্বয় নেই। নিজেদের মতো করেই কাজ করছে তারা। জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত সময়ে বাকলিয়ায় একটি ডাইভারশন খাল ও শেখ মুজিব রোডে বাদামতলী থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত কালভার্ট নির্মাণ ছাড়া অন্য কোন বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি।
সিটি কর্পোরেশনের গৃহীত প্রকল্প : রাজাখালী, চাক্তাই খাল, চাক্তাই ডাইভারশন খাল, মহেশ খাল, শীতল ঝর্ণা খাল, খন্দকিয়া খাল, বামনশাহী খাল, মির্জাখালসমূহ খনন ও সংস্কার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে ৪৫ কিলোমিটার সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আরাকান রোড সংলগ্ন ডোমখালী খালের সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে বিবেচনাধীন রয়েছে। অনুমোদনের জন্য ৩টি ড্রেনেজ প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- হিজরা খাল পুনঃখনন, ষোলশহর হতে বহদ্দারহাট পর্যন্ত সিডিএ এভিনিউ সংলগ্ন খাল পুনঃখনন ও নতুন খাল খনন এবং বহদ্দারহাট বারইপাড়া চাক্তাই খাল হতে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাজা রোডের সমান্তরাল ২৭৩০ মিটার দীর্ঘ প্রাইমারি খাল খনন।
চট্টগ্রাম মহানগরীর উন্নয়নের দায়িত্বে রয়েছে সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এম মনজুর আলম বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। এর আগে টানা তিনবার মেয়র ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। সিডিএ’র চেয়ারম্যানের দায়িত্ব রয়েছে মহানগর আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক আব্দুস ছালাম।
মেয়রের বক্তব্য : বহদ্দারহাট বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত ২ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল খনন প্রকল্প একনেকে অনুমোদন করায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মেয়র এম মনজুর আলম বলেন, ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন ছাড়া জলবদ্ধতা নিরসন হবে না। ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের আওতায় প্রস্তাবিত অন্যান্য প্রকল্পগুলো অনুমোদনের আহবান জানান তিনি। এসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে সম্ভব নয়। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী সংবাদপত্রে প্রেরিত এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে জলাবদ্ধতা এবার নজির বিহীন পর্যায়ে পৌঁছে। এ জন্য মূলত ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন না হওয়া যেমন দায়ী তেমনি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উদাসিনতাও কম দায়ী নয়। খাল খননের জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাদ্দপ্রাপ্ত টাকা সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য আহবান জানান তিনি।
সিডিএ চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম বলেন, কি কারণে জলাবদ্ধতা হচ্ছে, কারা দায়ী তা চিহ্নিত করতে একটি টিম গঠন করা হয়েছে। তারা প্রতি এলাকায় গিয়ে জলাবদ্ধতার কারণ চিহ্নিত করবেন। জনগণকে আমরা এই প্রক্রিয়ারয় সাথে সম্পৃক্ত করতে চাই। কারণ চিহ্নিত হওয়ার পর তা কারা কিভাবে বাস্তবায়ন করবে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহ-সভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া ইত্তেফাককে বলেন, ‘চট্টগ্রামে পরিকল্পিত নগরায়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট কোন প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে সরকারের কাছে সমস্যাগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা যাচ্ছে না। পুকুর, খাল, নালা, ভরাট করা হচ্ছে। সরকারও সমস্যাগুলো দেখতে পাচ্ছে না। ফলে জলাবদ্ধতার জন্য নগরবাসী, সরকার ও সিটি কর্পোরেশন সকলেই দায়ী। উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন।’
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন জানায়, প্রায় ৬০ বর্গমাইল আয়তনের নগরীতে পানি নিষ্কাশনের জন্য ছোট-বড় ১৭টি খাল রয়েছে। খালের পরিমাণ আরো বেশি ছিল। ১৭টি খালের দৈর্ঘ্য ১৪৪ কিলোমিটার। ড্রেন রয়েছে ৪০০ কিলোমিটার। ১০০ মিলিমিটারের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ধারণ ক্ষমতা রয়েছে এসব খালে। নালা খালের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ দখলদারদের স্থাপনা নির্মাণ, পাইলিংয়ের মাটি, পাহাড়ি মাটি ও ময়লা আবর্জনার স্তূপের কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত করছে। পানি নিষ্কাশন স্বাভাবিক রাখতে খালের দেয়াল নির্মাণ ও তলা পাকাকরণ, নালা পরিষ্কার করা ও সরানো এবং যন্ত্রপাতি কিনতে সিটি কর্পোরেশন গত চার বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা খরচ করেছে। এসব নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সমপ্রতি সিটি কর্পোরেশন খাল ও নালার অবৈধ দখলমুক্ত করতে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান শুরু করেছিলেন। এই কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে অবৈধ দখলদারদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন ধরে এই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট নাজিয়া শিরিন ইত্তেফাককে বলেন, ‘অবৈধ দখল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। যেসব ফাইল পাঠানো হয়েছে তা উচ্ছেদ করা হয়েছে। আমার কাছে কোন পেন্ডিং ফাইল নেই।’
কর্পোরেশনের বিভিন্ন উত্স থেকে বছরে আয় হয় প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। সরকার থেকে পাওয়া যায় ১২০ থেকে ১৩০ কোটি। আর বেতন-ভাতাসহ বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৪৯৮ কোটি টাকা। ফলে নিজস্ব অর্থ দিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের মুখাপেক্ষী হতে হয়।
সিডিএ : বর্তমান সিডিএ নগরীর যানজট নিরসনের জন্য হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করেছে। সড়ক সমপ্রসারণ ছাড়াও দু’টি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। যদিও এসব ফ্লাইওভার নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা বা জলজট নিরসনে প্রকল্প জমাদানের পরও বরাদ্দ মিলেনি বলে অভিযোগ সিটি কর্পোরেশনের। নগরীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সিটি কর্পোরেশন ও সিডিএ জড়িত থাকলেও দুই সংস্থার মধ্যে কাজের কোন সমন্বয় নেই। যে যার মতো করে কাজ করছে।
মাস্টার প্ল্যান : সিডিএ ১৯৯৫ সালে ইউএনডিপি’র আর্থিক সহায়তায় ইউএনসিএইচএস এর কারিগরি সহায়তায় ২০ বছর মেয়াদী একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করে। এতে ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় অনেকগুলো সুপারিশ করা হয়েছে। প্ল্যানে চট্টগ্রাম শহরকে ১০ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সুপারিশের মধ্যে রয়েছে ৫টি নতুন খাল খনন, এলাকাভিত্তিক খাল খনন, পুরাতন খালের গভীরতা বৃদ্ধি ও প্রশস্তকরণ, পাহাড়ের পলি মাটি ধারণের জন্য সিল্টট্র্যাপ নির্মাণ, স্লুইজ গেইট নির্মাণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ। ৫টি নতুন খালের মধ্যে ইতিপূর্বে ২টি খনন হয়েছে। প্রস্তাবনায় বাকি তিনটি নতুন খালের মধ্যে রয়েছে বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত, ষোলশহর থেকে বহদ্দারহাট, শীতল খাল থেকে নয়াখাল। ড্রেনেজ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও খনন কাজে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে।
জলাবদ্ধতায় ক্ষয়ক্ষতি : চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অধীনে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা রয়েছে। বৃষ্টি ও জলবদ্ধতায় এর মধ্যে প্রায় ১০০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, এসব ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত করতে প্রায় ৫০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। জলাবদ্ধতায় দেশের প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ে ব্যবসা বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। দোকানে ও গুদামে পানি ঢুকে পড়েছে। এই বাণিজ্যিক এলাকায় ৫ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় দৈনিক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু জলাবদ্ধতায় পণ্য লোড-আনলোড বন্ধ হয়ে যায়। বেচা-কেনা ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে নেমে আসে। সিইপিজেডসহ শিল্প-কারখানায় পানি ঢুকে উত্পাদন বন্ধ থাকে কারখানায়। ইঞ্জিনচালিত বিভিন্ন যানবাহন, মোটর চালিত রিকশা, অটোরিকশা, পানির মোটর নষ্ট হয়ে যায়।
