২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। বেসরকারি একটি উদ্যোগ। বদলে যায় রাজধানীর মালিবাগ বাজারের দৃশ্যপট। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) সরবরাহ করে একটি ফরমালিন শনাক্তকরণ যন্ত্র। ‘ফরমালিনমুক্ত’ হয় মালিবাগ বাজার। পরে ঢাকার আরো ১০টি বাজারকে ‘ফরমালিনমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়। তবে পৌনে দুই বছরের মাথায় এসে সেই উদ্যোগটি এখন হতাশার আরেক নামে পর্যবসিত হয়েছে।
ফরমালিনমুক্ত এই বাজারগুলোতে এখন আর নিয়মিত ফরমালিন পরীক্ষা হয় না। যন্ত্রটি তালাবদ্ধ থাকে বাজার ব্যবসায়ী সমিতির কার্যালয়ে। অন্যদিকে এফবিসিসিআই যে যন্ত্রগুলো সরবরাহ করেছিল সেগুলোর কিটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। বাজার সমিতি কিটগুলো পাল্টায়নি। ফলে মেয়াদহীন যন্ত্রগুলো এখন আর কাজে আসছে না।
বর্তমানে রাজধানীর ১১টি বাজার এবং রাজধানীর বাইরে ১২টি জেলার বাজারে এফবিসিসিআইয়ের উদ্যোগে ফরমালিন সনাক্তকরণ যন্ত্র রয়েছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন ফরমালিন মুক্তকরণের এই উদ্যোগের সঙ্গে শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন। গতকাল যোগাযোগ করা হলে ইত্তেফাককে এ বিষয়ে তিনি বলেন, বাজারগুলোতে কেবল মাছ পরীক্ষা করার জন্যই এই যন্ত্র দেয়া হয়েছিল। রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাজার ও মহাখালী কাঁচাবাজারে এই যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে না। অন্যান্য বাজারে এই যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে বাজারগুলোতে এই যন্ত্র শতভাগ ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন।
অবশ্য বিকল যন্ত্র দিয়ে খাদ্যে ফরমালিন মেশানো বন্ধ হবে না বলে মত দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে বলেন, ফরমালিন মেশানো বন্ধ করতে হলে যথাযথ আইন ও এর প্রয়োগ থাকতে হবে। জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হবে বলে আইনমন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন।
সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা বাজারে অভিযান চালিয়ে মাছ ও ফলে ফরমালিন শনাক্ত করছে। তবে তারা এমন কোনো বাজারের খোঁজ দিতে পারেনি যেখানে গেলে ক্রেতারা নিশ্চিন্তে পণ্য কিনতে পারবেন। বেসরকারি উদ্যোগে নিশ্চয়তার খোঁজ মিলেছিল। পণ্য কিনে পরীক্ষার সুযোগও হয়েছিল। এখন ফরমালিনমুক্ত বাজারের হতাশাজনক অবস্থায় হতাশ ক্রেতারা। তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।
মালিবাগ বাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণার পর শান্তিনগর কাঁচাবাজার, গুলশান-২ কাঁচাবাজার, মহাখালী কাঁচাবাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজার, মালিবাগ বাজার, উত্তরার আজমপুর, বনানী কাঁচাবাজার, কাপ্তানবাজার, নিউমার্কেট বনলতা, শাহ আলী সিটি করপোরেশন মার্কেটকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করা হয়। এসব মার্কেটে ফরমালিন পরীক্ষার জন্য বেসরকারি ব্যাংকের সহায়তায় ফরমালিন ডি-হাইড্রেড যন্ত্র দেয়া হয়। একেকটি যন্ত্রের দাম সোয়া লাখ টাকা। আমেরিকা থেকে আমদানি করা ওই যন্ত্র চালানোর জন্য বাজার সমিতির দু’জন কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেয় এফবিসিসিআই।
যন্ত্র দেয়ার পর বেশ কিছুদিন অবস্থা ভালো ছিল। বিভিন্ন সংস্থা অভিযান চালিয়ে ওইসব বাজারে ফরমালিন পায়নি। বাজারগুলোতে সকালে ফরমালিন পরীক্ষা করে পণ্য প্রবেশ করতে দেয়া হতো। পরে ক্রেতারা চাইলে পরীক্ষা করিয়ে দিত বাজার সমিতি। পরবর্তী সময়ে এই নিয়ম রক্ষা করা যায়নি। যন্ত্রটি তালাবদ্ধ হয় সমিতির কার্যালয়ে।
সমপ্রতি এই প্রতিবেদক কয়েকটি বাজারে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। প্রতিটি বাজারেই মোটামুটি একই চিত্র পাওয়া গেছে। ২০ জুন মহাখালী কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, একজন ক্রেতা মাছ কিনে ফরমালিন পরীক্ষা করতে চাইলেন। তবে ফরমালিন শনাক্তকরণ যন্ত্রটি বাজারের কোথাও পাওয়া যায়নি। পরে জানা গেল, সেটি বাজার সমিতির কক্ষে তালাবদ্ধ। বাজার করতে আসা আবদুল হক নামের একজন ক্রেতা বলেন, বিশ্বাস করে কিনতে হচ্ছে। কতটা ফরমালিনমুক্ত তা নিশ্চিত নই। ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। নিয়মিত ফরমালিন পরীক্ষা করা হয় বলে জানি। বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল গাফ্ফার জানান, যন্ত্রটি সমিতির কার্যালয়ে আছে। লোকবল সংকটের কারণে নিয়মিত পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না।
২১ জুন শান্তিনগর বাজার ঘুরে দেখা যায়, ফরমালিন মাপার মেশিনটি বাজার কমিটির কার্যালয়ে সব সময়ই থাকে তালাবদ্ধ। বিক্রির সময় ক্রেতা চাইলেও ফরমালিন পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকে না। ফরমালিনমুক্ত বাজার ঘোষণার সময় যন্ত্রটি বাজার কমিটির যে অফিস কক্ষে রাখা হয়েছিল, আজও সেখানেই পড়ে আছে। তবে সেটি আদৌ সচল আছে কি-না তা জানা যায়নি। বাজার কমিটির একজন জানান, ফরমালিন মাপার যন্ত্রটি আমাদের অফিসে আছে।
২২ জুন মালিবাগ বাজারে দিনভর অবস্থান করেও ফরমালিন পরীক্ষার কোনো আয়োজন চোখে পড়েনি। তবে বাজারে নিয়মিত ফরমালিন পরীক্ষা করা হয় বলে দাবি করেন মাছ ব্যবসায়ী আবু বকর। তিনি বলেন, সকালে পরীক্ষা করা ছাড়া কোনো পণ্য বাজারে ঢুকতে দেয়া হয় না। ফরমালিন পাওয়া গেলে তা পাইকারি বাজারে ফেরত পাঠানো হয়। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরমালিন পরীক্ষার যন্ত্রটি থাকে মালিক সমিতির তত্ত্বাবধানে। মাছ বিক্রেতা আশরাফ মিয়া জানান, মাস তিনেক আগে একদিন ফরমালিনের পরীক্ষা হয়েছিল।
