গার্মেন্টস কারখানার ৩০ শতাংশ নারী শ্রমিক মনে করেন কারখানায় যথাযথ নিরাপত্তা নেই। এছাড়া ৭৬ শতাংশ নারী শ্রমিকই মনে করেন তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নেই। তাদের আশংকা যে কোন সময় তারা কাজ হারাতে পারেন। অন্যদিকে মালিকদের পক্ষ থেকে নতুন ন্যূনতম মজুরি শতভাগ বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও প্রায় ৪০ শতাংশ নারী শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি পাননি বলে জানিয়েছেন। অবশ্য শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে অসন্তুষ্টি আগের তুলনায় কমছে। দুই-তৃতীয়াংশ নারী শ্রমিক তাদের মজুরি নিয়ে সন্তুষ্ট।
বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের অবস্থা নিয়ে মহিলা পরিষদের সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ওই সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানমের সভাপতিত্বে গবেষণা প্রতিবেদনের বিস্তারিত তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সামিনা লুত্ফা ও ড. জাহিদ চৌধুরী। এ সময় অর্থনীতিবিদ, গার্মেন্টস মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা ছাড়াও বিভিন্ন নারী অধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সদস্য এমন ১২টি কারখানার ১ হাজার ১৩ জন নারী শ্রমিকের উপর এই জরিপটি চালানো হয় গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৮৭ শতাংশ নারী শ্রমিকের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি। এদের ৯৭ শতাংশই ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং বাকিরা হিন্দুসহ অন্য ধর্মাবলম্বী।
জরিপে দেখা গেছে, ৯৬ শতাংশ নারী শ্রমিকই ভাগাভাগি করে টয়লেট, গোসলখানা ও রান্নাঘর ব্যবহার করেন। এর মধ্যে প্রতি ২২ জন মিলে একটি টয়লেট ব্যবহার করেন। আর প্রতি ৬৫ জনে একটি চুলা এবং গড়ে সাড়ে তিন জন একটি রুমে থাকেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে পরিষ্কার বোঝা যায়, এসব কারণে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত প্রভাব কত মারাত্মক। জরিপে দেখা যায়, অন্তত অর্ধেক শ্রমিক কোন না কোন ধরনের স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছেন। অন্যদিকে গার্মেন্টস কারখানার মালিকরা অস্বীকার করলেও কারখানায় এখনো শিশু শ্রম রয়েছে। গার্মেন্টস কারখানার নারী শ্রমিকদের অন্তত ৮ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
অবশ্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আনোয়ার উল-আলম চৌধুরী পারভেজ শিশু শ্রমসহ প্রতিবেদনের কয়েকটি বিষয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, শিশুশ্রম নিরসনে ১৯৯৫ সাল থেকেই বিজিএমইএ চুক্তিবদ্ধ। কোন কারখানার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এলে বিজিএমইএ থেকে সদস্যপদ চলে যাবে। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট তথ্য বিজিএমইএ’র কাছে দেয়ার অনুরোধ করেন তিনি। এছাড়া কারখানার কমপ্লায়েন্স (কর্মপরিবেশ) তৈরিতে বিজিএমইএ’র নানামুখী উদ্যোগ তুলে ধরেন তিনি।
অনুষ্ঠানে গ্রীন টেক্সটাইল নামক একটি কারখানার শ্রমিক নিলুফার ইয়াসমিন কারখানা, বাসা ও সমাজে শ্রমিক হিসেবে তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ শ্রমিকদের পাশাপাশি মালিকদের নিয়েও একটি গবেষণা জরিপ চালানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মালিকরা কত টাকা আয় করেন, তাদের ওই টাকা কোথায় কোথায় যায় তা নিয়েও একটি জরিপ হওয়া দরকার। সুইস ব্যাংক, কানাডা, মালয়েশিয়াসহ কোথায় কত টাকা যাচ্ছে তারও হিসাব আসা দরকার। এছাড়া গ্যাস, বিদ্যুত্, জমি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, স্বল্প সুদে ঋণ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়া রানা প্লাজার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নানা বাধা প্রদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর কোর্ট এখন চুপচাপ।
অনুষ্ঠানে গার্মেন্টস মালিকদের সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া করসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কতটুকু শ্রমিকদের জন্য ব্যয় হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অর্থনীতিবিদ ড. বিনায়ক সেন। তিনি সরকার ও বিজিএমইএ’র উদ্যোগে গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকের সংখ্যাসহ কয়েকটি বিষয়ের জন্য একটি সঠিক জরিপ করার আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে দেয়া শুল্কের একটি অংশ, কারখানার কমপ্লায়েন্স তহবিল বাবদ একটি অংশ, ক্রেতার কাছ থেকে শ্রমিকের কল্যাণে একটি অংশ আদায় করার উপায় বের করার আহ্বান জানান।
