যারা উড়ে এসে জুড়ে বসে তাদের কাছে ভোগ-বিলাসই বড়

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৪, ২২:৩৯
২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সময়োপযোগী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, এই বাজেট অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে, ২০২১ সালের অনেক আগেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। আমাদের সম্পদ একটিই-দেশপ্রেম। যারা ক্ষমতা দখল করে হঠাত্ উড়ে এসে জুড়ে বসেন তাদের কাছে ভোগ-বিলাসই বড়। আগের বিরোধী দল (বিএনপি) ষড়যন্ত্র করেছিল যাতে নির্বাচন না হয়। সে ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে নির্বাচন করেছি, দেশে গণতন্ত্র সুসংহত করেছি। তবে তারা কিসের স্বার্থে ষড়যন্ত্র করেছিল, জানি না। গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর দীর্ঘ আলোচনা শেষ হয়। এরপর অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত ‘অর্থবিল-২০১৪’ পাস হয়েছে। আজ রবিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত অধিবেশন মূলতবি করেন স্পিকার। আজ ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পাস হওয়ার কথা। গত ৫ জুন অর্থমন্ত্রী সংসদে এই বাজেট প্রস্তাব করেন। শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বাজেটে কয়েকটি খাতে প্রস্তাবিত শুল্ক কমিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর সারচার্জ আরোপের পরামর্শ দেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, মোবাইল ফোনসেট আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক বেশি। এটা কিছুটা কমানোর জন্য অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করব। মোবাইল ব্যবহারের উপর সারচার্জ আরোপ খাত থেকে যে রাজস্ব আয় আসবে, তা শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। পরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত তার বক্তব্যে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কিছু সুপারিশ করেছেন। তার সুপারিশ তো সুপারিশ নয়, সেটি আমার কাছে নির্দেশ হিসেবে বিবেচিত।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ করেছি। বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনছি। সুইচ ব্যাংকের কাছে তালিকা চেয়েছি- কারা টাকা পাচার করেছে। ওই টাকা ফেরত এনে দেশের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ এগিয়ে চলছে। এই বিচার শেষ করে জাতিকে আমরা কলঙ্কমুক্ত করবো। এর আগে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদের দেয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ এনে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি সরকারের অনেক সমালোচনা করেছেন। কিন্তু সেটা গঠনমূলক এবং জনস্বার্থে। অতীতে এমন ছিল না। বিগত সংসদে বিরোধী দল এই সংসদে চেয়ার ভাঙ্গা, কাগজ ছেঁড়া থেকে শুরু করেও এমন সব জঘন্য কাজ করেছে যে, টিভি ক্যামেরাম্যানও রেহাই পায়নি। সংসদে স্বাভাবিক আলোচনা ও গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ ছিল না। তিনি বলেন, দেশের আর্থ-সামজিক উন্নয়নে আওয়ামী লীগের একটি লক্ষ্য ও নীতিমালা আছে। সেটাকে সামনে রেখেই এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এই বাজেট বাস্তবায়িত হলে মানুষ উপকৃত হবে, দেশ এগিয়ে যাবে। এজন্য তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। আবাসন খাতে মন্দার কথা বিবেচনা করে দালান ও ফ্ল্যাট বিক্রির ওপর উেস কর আরোপের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীকে আরও নমনীয় হওয়ার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার উত্সাহিত করার জন্য সহজভাবে আমদানির ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে যে শুল্ক প্রস্তাব করা হয়েছে তা বিবেচনা করা যেতে পারে। সাবানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক প্রত্যাহার করলেও কোনো সমস্যা হবে না। কিডনী ডায়ালেসিস সংশ্লিষ্ট জিনিসপত্রের ওপর শুল্ক আরোপ না করারও পরামর্শ দেন তিনি। পুঁজিবাজারে সরকারের নেয়া পদক্ষেপ ও সংস্কার অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন যে সংস্কার করেছে তাতে সেখানে স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এজন্য তারা প্রথম গ্রেডে উন্নীত হয়েছে। অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়া। কারণ আমাদের কাছে এই দেশ ও দেশের মানুষই বড়। শেখ হাসিনা বলেন, মানুষ যাতে শহরমুখী না হয় সেজন্য গ্রামের মানুষের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণসহ সকল ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বর্তমানে ৬২ ভাগ মানুষ বিদ্যুত্ ব্যবহার করছে। আমরা ঘরে ঘরে আলো দেয়ার ব্যবস্থা করবো। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে ওয়েভপোর্টাল চালু করেছি। প্রতিটি ইউনিয়নে ইন্টারনেট সুযোগ তৈরি করেছি, ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ যা ব্যবহার করছে। মোবাইল ফোন এখন হাতে হাতে। ১১ কোটি সিম ব্যবহূত হচ্ছে। মোবাইলের মাধ্যমে মানুষ টাকা পাঠাচ্ছে, বিল দিচ্ছে, পরীক্ষার ফলাফল জানতে পারছে। উন্নত বিশ্ব এসে আমাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করছি। ঢাকার চেহারাই পাল্টে গেছে। ঢাকায় আগের মত পানির হাহাকার নেই। খাদ্যে ভেজাল ও ফরমালিনের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। আগের সরকারগুলো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। শুরুতে তারা ব্যবস্থা নিলে আজ এ অবস্থা হতো না। বিদেশি পানি কে খান? বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেছিলেন ‘মানুষ বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারছে না। খাবার পানিও দূষিত। আপনি তো ভালো পানি খান, বিদেশি পানি খান, এজন্য বুঝতে পারেন না।’ পরে এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন ‘আমি বিদেশি পানি খাই না, দেশি পানি খাই। বিরোধী দলীয় নেতাই বিদেশি পানি খান।’ একথা বলে সামনে থাকা গ্লাসের পানি পান করেন তিনি। এসময় উপস্থিত সবাই হেসে ওঠেন। উল্লেখ্য, রওশন এরশাদ যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন তার সামনে সবুজ বোতলে বিদেশি পানি রাখা ছিল। আগেরদিন এরশাদ যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন তার সামনেও একই ধরনের বোতলের পানি ছিল। যারা এই সরকারকেই মানে না, তাদের সঙ্গে কীসের আলোচনা: আমু প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা ও অর্থমন্ত্রীর আগে গতকাল বাজেটের ওপর আলোচনা করেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ও বিএনপি নেতারা বিদেশিদের যেখানে যাকে পাচ্ছেন, তার কাছে নালিশ করছেন। রাজনৈতিক সমস্যা থাকলে তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ। খালেদা জিয়া এই সরকারে পচন ধরানোর চেষ্টা করছেন। তাকে বলবো, আগে পচন ধরান, তারপর আপনি আন্দোলন করুন। তিনি বলেন, যারা এই সরকারকেই মানে না; যারা মুক্তিযুদ্ধ, দেশের সংবিধান, সংসদ ও আইন মানেন না, পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে যারা আলোচনা বানচাল করেছেন, তারা এখন আবার সংলাপের কথা বলছেন। তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে কীভাবে সমস্যার সমাধান সম্ভব তা আমি বুঝি না।