নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সব সমাজেই সমস্যা-সংকট রয়েছে। তবে কোন সমস্যা স্থায়ী হলে শান্তি ও উন্নয়ন অর্জনের পথ প্রবলভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। আমাদের নিজেদের সমস্যাকে নিজেরাই চিহ্নিত করে তা সমাধানের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে। চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার সবচেয়ে বড় সাহস ও শক্তি আছে তারুণ্যের। আমাদের তরুণদের শক্তি ও সম্ভাবনা ব্যবহার করতে হবে। তরুণদের বড় সমস্যা বেকারত্ব। এ বেকারত্ব সব জায়গায় রয়েছে। একদিন পৃথিবীতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে যখন বেকারত্ব বলে কিছু থাকবে না। সুস্থ শরীরের একজন মানুষ বেকার থাকবে, এটা হতে পারে না। এটাই আমাদের চ্যালেঞ্জ। আর সামাজিক ব্যবসা এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রধান হাতিয়ার হতে পারে। এর মাধ্যমে তরুণরা চাকরি প্রার্থী নয়, চাকরিদাতায় পরিণত হবে। নতুন ব্যবসা ও পরিকল্পনা নিয়ে তাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে।
শনিবার রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে পঞ্চম সামাজিক ব্যবসা দিবসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। ইউনূস সেন্টার এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এ অর্থনীতিবিদ বলেন, অর্থনীতি আমাদের সঙ্গে যে ব্যবহার করছে তাতে আমরা হতাশ। তরুণরা আরো বেশি হতাশ। এই হতাশা দূর করতেই আমরা সামাজিক ব্যবসার উদ্যোগ গ্রহণ করি।
তিনি বলেন, আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই ভুল। আমরা চাকরিপ্রার্থী হিসেবে শিক্ষার্থীদের তৈরি করছি। আমাদের শিক্ষা শিক্ষিত শ্রমিক তৈরি করছে। মানবিক গুণাবলীর মানুষের জন্য এটি লজ্জার। নতুন ব্যবসা ও পরিকল্পনা নিয়ে তরুণদের এগিয়ে আসার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, চাকরিপ্রার্থী নয়, চাকরিদাতা হতে হবে। পরিকল্পনা নিয়ে এলে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তহবিলের সংকট হবে না। তরুণরা যখন ব্যবসার উদ্যোগ নিয়ে আসেন, তখন আমরা খুব অনুপ্রাণিত হই। সামাজিক ব্যবসা দিয়ে সামাজিক সমস্যা দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তরুণদের স্বপ্ন ও উদ্যোগ নিয়ে বেকারত্ব দূর করতে হবে।
অনুষ্ঠানের এক বিরতিতে সাংবাদিকদের গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনূস বলেন, গরিব মানুষের জন্যই গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আর সরকার এই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা দরিদ্র মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। যে লক্ষ্য নিয়ে এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সেই উদ্দেশ্য ভেস্তে যেতে দিতে পারি না। এ ব্যাংকের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ বৈশিষ্ট্যগুণেই দারিদ্র্য নিরসনে ও নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পেরেছে। এ বৈশিষ্ট্য নষ্ট করা যাবে না। গ্রামীণ ব্যাংকের অধিকার আদায়ের চেষ্টা-লড়াই চলছে, চলবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সামাজিক ব্যবসা দিবসের মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের রবার্ট এফ কেনেডি সেন্টার ফর জাস্টিস এন্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি কেরি কেনেডি। তিনি বলেন, বিশ্বে লাখ লাখ দরিদ্র মা-বাবা দারিদ্র্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন। তাদের সহায়তা করা জরুরি। শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সামাজিক ব্যবসা কীভাবে অবদান রাখতে পারে, তা বিবেচনা করা উচিত। ড. ইউনূস ও তাঁর সামাজিক ব্যবসা যে অন্যদের চেয়ে আলাদা, সেটি সর্বস্তরে আলোচিত ও স্বীকৃত।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির পরিবারের এ সদস্য বলেন, বাংলাদেশ সন্দেহাতীতভাবেই জেন্ডার সাম্য, প্রাথমিক শিক্ষা, খাদ্য উত্পাদন, স্বাস্থ্য এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গৌরবময় সাফল্য দেখিয়েছে। এ দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী। এমনকি রপ্তানির শীর্ষে থাকা পোশাকশিল্পের অধিকাংশই নারী। আয়তনে ক্ষুদ্র বাংলাদেশ এক্ষেত্রে চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করছে এবং বিশ্বের মোট পোশাকের ৫ ভাগ এদেশেই উত্পাদিত হচ্ছে।
কেরি কেনেডি বলেন, উন্নয়নের পথে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে দেবদূতরা মুক্ত মন ও স্বাধীনতার পাশেই থাকে। একটি উদার সমাজ নির্মাণের পথে চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে- সেন্সরশিপ, দমনমূলক এনজিও আইন, সাংবাদিকদের কারাবন্দি করা, সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা, টিভি চ্যানেল বন্ধ করা, সংবিধানে বিতর্কিত সংশোধনী আনা। সুবিচারের পথে চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে- নিরাপত্তা বাহিনীর আইনে অব্যাহতির সুযোগ, বিচারবহির্ভূত হত্যার সমাধান না হওয়া। সমস্যা নিরসনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হবে। তিনি বলেন, যখন নির্বাচন অবাধ ও সুন্দর হয় না, নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন দলের সহায়ক হয়ে উঠে, পোলিং অফিসারদের ভোটকেন্দে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়, যেখানে অনেক বেশী মানুষ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর আস্থা হারিয়ে ভোট প্রদান করে না সেখানে গণতন্ত্রের সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়।
রানা প্লাজার মত দুর্ঘটনা রোধে এবং বাংলাদেশের পোশাক খাতের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য বিশ্বের নামী ব্রান্ডগুলোকে অর্থায়ন ও অবদান রাখার জন্য তিনি অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, প্যারিসের আছে আইফেল টাওয়ার, নিউ ইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি, কায়রোর আছে পিরামিড। এজন্য তারা গর্ব করতে পারে। আর বাংলাদেশীদের ইটের তৈরি কোন কিছু নয়, তাদের আছে এমন একজন মানুষ যিনি পৃথিবীর সকল দেশেই সম্মানিত। এমন মানুষ- ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে বাংলাদেশীরা নিশ্চয়ই গর্বিত।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের দর্শনকে আমি ভালোবাসি। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে গ্রামীণ ব্যাংকে গিয়েছি। যেখানেই গিয়েছি গ্রামীণ ব্যাংকের জাদু দেখেছি। অশিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত মানুষদের ড. মুহাম্মদ ইউনূস দক্ষ কর্মশক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। সামাজিক ব্যবসা বিশ্বে শান্তি ও উন্নয়নের নতুন দ্বার খুলে দিচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্ক, জাপান মিশরসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা উপস্থিত ছিলেন। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের প্রথম কর্ম অধিবেশনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন গ্রামীণ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আন্দে য়া জাং, জার্মানি ইউনূস সোশ্যাল বিজনেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সোফি আইজানম্যান, নেপালের চৌধুরী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নির্ভানা চৌধুরী, কম্বোডিয়ার ফ্রি পারফর্মিং সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজের প্রধান নির্বাহী হাউট ডারা, চায়না সোশ্যাল বিজনেস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক গোয়া জান, ভারতের নাভার্ড গ্রুপের প্রধান মহাব্যবস্থাপক বি এস সুরান।
‘আমাদের মালিকানা নিয়ে যাচ্ছে সরকার’
গতকাল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য তাহছিনা খাতুন বলেন, আমাদের মালিকানার ব্যাংক আমাদের বাদ দিয়ে সরকার নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই। অথচ অধিকাংশ ব্যাংকেই এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সরকার যেভাবে আমাদের ব্যাংক নিয়ে যাচ্ছে এতে হানাহানি বাড়বে।
ব্যাংকের নারীদের অধিকার রক্ষায় সকলকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মূলত নারীদের জন্যই ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু আজ সরকার যেভাবে ব্যাংকটি নিয়ে যাচ্ছে তাতে তাদের কোনো অধিকার রক্ষা হবে না।
ড. ইউনূসকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা
খালেদা জিয়ার
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ড. ইউনূসকে ৭৪তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মোহাম্মদ ইউনূসকে খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে জন্মদিনের এ শুভেচ্ছা শনিবার পৌঁছে দেন বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল।
প্রতিনিধি দলে ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দীন আহমেদ, বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান খান শিমুল বিশ্বাস ও প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান। হোটেল রেডিসনে ‘সোস্যাল বিজনেস ডে’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ড. ইউনূসকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দেন তারা। এ সময় খালেদা জিয়াকে জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান ড. ইউনূস।
