পরিবারের সদস্যরাই বিষযুক্ত খাবারকে বিষমুক্ত করতে পারেন, শুধু একটু সচেতনতার অভাব। যে বিষয়টি নিয়ে আজ আমরা বলব তা’হল ‘ফরমালিন’। এই নামটির সাথে ছোট-বড় মোটামুটি সবাই পরিচিত। আর এই ফরমালিন নিয়ে আতংক সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। এরই কারণে কোটি কোটি মানুষ আজ নানা ধরনের কঠিন রোগের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। অসংখ্য মানুষ প্রতিবছর এই কারণে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, যার কোন জরিপ নেই। জরিপ হলে মানুষের মধ্যে আতংক আরো বেড়ে যেত। সবাই খাবার কিভাবে বিষমুক্ত করে খাবেন তা নিয়ে লিখেছেন—
আখতার জাহান মালিক
এ বিষয়ে প্রথমে আমাদের যেসকল বিষয় জানা অতি জরুরী তা’হল, আমরা প্রতিদিন যে সকল খাদ্যদ্রব্য কিনছি সে খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন মেশানো হলে দেখতে কেমন হয়। দেখতে হবে মাছের গায়ে মাছি পড়ছে কিনা? মনে রাখবেন ফরমালিনবিহীন মাছের গায়ে মাছি পড়বে, ফুলকা হবে উজ্জ্বল লালবর্ণ, চোখ ও আঁইশ উজ্জ্বল হবে,আঁশটে গন্ধ থাকবে, মাছের গা নরম থাকবে।অপর দিকে ফরমালিনযুক্ত মাছের ফুলকা ধূসর হয়, চোখ ঘোলাটে ও ফরমালিনের গন্ধ পাওয়া যায়। মাছের শরীরের আঁশটে গন্ধ কম পাওয়া যায়, মাছের গা শক্ত হয়। এবিষয়গুলো মনে রেখে পরিবারের অভিভাবক বা অন্য সদস্যরা যদি মাছ কিনেন তা’হলে তারা ফরমালিন মুক্ত মাছ কিনে ঝুঁকিমুক্ত হতে পারবেন।
এখন ফলের মৌসুম। অনেক মুখরোচক ফল বাজারে বিক্রি হচ্ছে, যাতে রয়েছে ফরমালিন ও নানাধরনের রাসায়নিক দ্রব্য, যা মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব বিষযুক্ত ফল খেয়ে কোটি কোটি মানুষ আজ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অসংখ্য মানুষ আজ স্বাভাবিকভাবে বিষমুক্ত ফলমুল খেতে পারছে না। আবার অনেকেই কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে অবলীলায় বিষাক্ত ফল খেয়ে চলেছে।
আম চিনব কি করে? আম গাছে থাকা অবস্থায় এক ধরনের সাদাটেভাব থাকে অথচ ফরমালিন বা অন্য রাসায়নিকে চুবানো আম ঝকঝকে সুন্দর হয়, আমের শরীর দাগহীন ও মোলায়েম হয়। গাছপাকা আমের ত্বকে দাগ পড়বেই। গাছপাকা আমের ত্বকের রঙে ভিন্নতা থাকবে। গোড়ার দিকে গাঢ় রং হয়, কারবাইড দেয়া আমে আগা গোড়া হলদেটে হয়ে যায়, কখন কখন বেশি রাসায়নিক দ্রব্য দেয়া হলে সাদাটেও হয়ে যায়। হিমসাগর ছাড়াও আরো নানান জাতের আম আছে যা পাকলও সবুজ থাকে,গাছপাকা হলে এইসব আমের ত্বকে বিচ্ছিরি দাগ পড়ে আম নাকের কাছে ঘ্রাণ নিয়ে কিনতে হবে,ফরমালিন ছাড়া গাছপাকা আম হলে বোঁটার কাছে ঘ্রাণ থাকবে।ওষুধ দেয়া আম হলে কোন গন্ধ থাকবে না বিচ্ছিরি বাজে গন্ধ থাকবে।আম মুখে দেয়ার পর যদি কোন স্বাদ ও ঘ্রাণ না পাওয়া যায় তাহলে বুঝতে হবে এ আম ফরমালিনযুক্ত। লিচু কাঁচা অবস্থায় হয় সবুজ,পাকার পর হয় ইটা লাল, রাসায়নিক স্প্রে করার পর লিচু মেজেন্ডা রং ধারণ করে। মেজেন্ডা রংয়ের লিচু কিনবেন না।
ফরমালিন সব বয়সি মানুষের জন্য ঝুঁকির, তবে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির। ফরমালিনযুক্ত দুধ, মাছ ফলমুল ও বিষাক্ত খাবার শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রেও বিষাক্ত খাবারে মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। বাজারের যে কোনো ধরনের মাছ, সবজি কিভাবে বিষমুক্ত করব— সবজি রান্না করার আগে ১০-১৫ মিনিট গরম পানির মাঝে বেশ খানিক লবণ মিশিয়ে তাতে ডুবিয়ে রাখবেন এবার পানি ফেলে দিয়ে আবার পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। এক ঘন্টার বেশি সময় মাছ, মাংস পানিতে ডুবিয়ে রাখলে শতকরা ৬১ ভাগ ফরমালিন নষ্ট হয়ে যায়। একলিটার পানিতে এককাপ ভিনেগার ও পানি একসাথে মিশিয়ে ১৫ মিনিট মাছ মাংস ডুবিয়ে রাখলে শতভাগ ফরমালিন নষ্ট হয়ে যায়।
অনেকেরই শুঁটকি মাছ প্রিয় মাছ। সেই শুঁটকি মাছে প্রচুর পরিমাণে ফরমালিন দেয়া মাছকে ফরমালিন মুক্ত করতে হলে শুঁটকি মাছকে প্রথমে একঘণ্টা গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে, তারপর স্বাভাবিক পানিতে আরো একঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। এতে ফরমালিন দূর হবে আর স্বাদও বাড়বে। যে ধরনের রাসায়নিক দেয়া হোক না কেন যদি আমরা সচেতন হই তা হলে ফল খাওয়া সম্ভব, আমাদের যা করতে হবে তা হল ফল খাওয়ার আগে একঘণ্টা ও তারচেয়ে বেশি সময় ফল ভিনেগার বা লবণ দিয়ে পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হবে। ভাল করে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে তারপর ফল খেতে হবে। আপেলের মত ফল সবসময় খোসা ছিলে তারপর খাবেন।
বিষাক্ত খাবার ভিজিয়ে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে আমরা বিষের হাত থেকে রক্ষা পাব। একবার অভ্যাস হলেই দেখবেন আর তেমন কষ্ট পেতে হবে না।
কৃতজ্ঞতা: শ্যামা শারমীন রহমান
