এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় তারকা কে? লিওনেল মেসি? তরুণ নেইমার? নাকি টমাস মুলার? এদের সবাইকে ভুলে যান। আসছেন আরেকজন তারকা — জেমস ডেভিড রড্রিগেজ রুবিও। লাতিনদের প্রিয় হামেস রড্রিগেজ!
কলম্বিয়ায় তার নাম কিডো ভালদেরামা বা নতুন ভালদেরামা। কিন্তু এই বিশ্বকাপেই যে অর্জন তা দিয়ে ছাড়িয়ে গেছেন ভালদেরামার তিন বিশ্বকাপের কীর্তিকে। ভালদেরামা নিজে অবশ্য আগেই আভাস দিয়ে রেখেছিলেন, ফুটবলেরই সর্বকালের সেরা হয়ে যাওয়ার প্রতিভা ও যোগ্যতা আছে রড্রিগেজের।
ভালদেরামার ভবিষ্যদ্বাণী যে একদম কথায় কথায় মিলে যাবে সেটা আর কে জানতো? চার ম্যাচ খেলেছেন, এর মধ্যে তৃতীয় ম্যাচে নেমেছিলেন দ্বিতীয়ার্ধে। এতেই পাঁচটি গোল ও সরাসরি তিনটি অ্যাসিস্ট। তিনটি ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়। তাতেও কি তার ব্যাপারে সবটা বোঝানো গেল? মোটেই না! তার গতি, দক্ষতা, ক্ষীপ্রতা বুদ্ধিমত্তা, পরিপূর্ণ ফিনিশিং তো আছেই, তার সাথে আবার লাতিন জাদুর ছোঁয়ায় ডিফেন্সভেদী সব পাস — এসব কি আর লিখে বর্ণনা করা যায়! অথচ তার বয়স মাত্র ২২! ইনজুরির কারণে বাদ পড়া রাদামেল ফ্যালকাওয়ের অনুপস্থিতিতে আক্রমণভাগের নেতৃত্বটাও তার কাঁধেই। এতো চাপ নিয়ে কি গোল করা তো আর সহজ নয়! রড্রিগেজের ভাষায়: ‘আমি যা করেছি সেটা অর্জন করাটা মোটেই সহজ কোন কাজ ছিল না। কিন্তু আমি একটু অন্য ভাবে ভাবি। আমি স্বপ্ন দেখি, আর মনে মনে স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটা চিত্র কল্পনা করে নেই। এরপরই সেই দৃশ্যটা বাস্তবে চলে আসে। কোন কিছুর জন্য অনেক পরিশ্রম করলে ফলাফল আসবেই।’
রড্রিগেজ সবচেয়ে বড় বিস্ময়টা উপহার দিলেন গত শনিবার রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে। দুটি গোল করেছেন। পাঁচটি গোল নিয়ে ছাড়িয়ে গেছেন চার গোল করা মেসি, নেইমার ও টমাস মুলারকে। ১৬ মিনিটে দলকে প্রথম এগিয়ে দেন রড্রিগেজ। বলা হচ্ছে গোলটি চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল। ডি বক্সের ভেতর বাঁ কাঁধ দিয়ে বল নামিয়ে বাঁ পায়ের জোরালো ভলিতে উরুগুয়ের জাল খুঁজে নেন মোনাকোর এই মিডফিল্ডার।
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা মাঠে গড়ানোর মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আবারও গোলের দেখা পায় কলম্বিয়া। আবারও জেমস রড্রিগেজ। পাবলো আরমেরোর ক্রস থেকে হুয়ান কাদরাদোর হেড বিপজ্জনক জায়গায় খুঁজে পেয়েছিল রড্রিগেজকে। ফিরতি হেডে ব্যবধান দ্বিগুণ করে দেন পোর্তো থেকে ৪৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে গত মৌসুমে মোনাকোতে পাড়ি জমানো এই তারকা।
বিশ্বকাপের প্রথম চার ম্যাচে গোল। আগে এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন কেবল দুই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তী — রোনালদো ও রিভালদো। তালিকায় তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে যুক্ত হয়ে গেলেন জেমস রড্রিগেজ। অভিজ্ঞ কোচ হোসে পেকারম্যানও জানেন তার দলের তুরুপের তাস রড্রিগেজ। প্রিয় শিষ্যের জন্য তাই তার মুখেও প্রশস্তির বাণী ঝরলো, ‘আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমি অনেক অবিশ্বাস্য ফুটবলার দেখেছি। একেক দিক থেকে একেকজন এগিয়েছিলেন। কিন্তু রড্রিগেজের মধ্যে আমি একই সাথে সবকিছু পেয়েছি। ওর বিস্ময়কর প্রতিভার কথা গোটা বিশ্ব এরই মধ্যে জেনে গেছে। আর এই বয়সে ওর মধ্যে দায়িত্ববোধটাও অনেক বেশি। এতো কিছু নিজের মধ্যে নিয়ে আসতে কিংবদন্তীয় ফুটবলারদেরও অনেক বছর লাগে। ও খুব অল্প বয়সেই সেটা করে দেখিয়েছে। আমি কোন প্রকার সন্দেহ ছাড়াই বলে দিতে পারি এটা ওর বিশ্বকাপ, জেমস রড্রিগেজের বিশ্বকাপ!’
কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যাওয়াটাই কলম্বিয়ানদের জন্য বড় এক পাওয়া। জেমস রড্রিগেজও ইতিহাস গড়তে পেরে গর্বিত। কিন্তু এতো জলদি ইতিহাসের ইতি টানতে চান না তিনি। আরও বড় দলের বিপক্ষে জয় চাই তার, ‘আমরা এরই মধ্যে ইতিহাস গড়ে ফেলেছি। কিন্তু এখানেই আমরা থেমে যেতে চাই না। আমাদের আরও বহুদূর যাওয়ার স্বপ্ন। আমাদের সামনে এবার ব্রাজিল। ওরা শক্তিশালী, গ্রেট কিছু খেলোয়াড় আছেন। কিন্তু আমরাও মন্দ নই। আশাকরি ওদেরও হারাতে পারবো।’
কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার লড়াইটা আগামী শুক্রবার। সেখানেও কি দেখা যাবে রড্রিগেজের আরেকটি বিস্ময়। যুবরাজের রাজ্যাভিষেক তো হয়ে গেল। এবার কি বিশ্বজয়ের পথে এগিয়ে যাবেন তিনি?
বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা
৫ গোল
জেমস রড্রিগেজ
(কলম্বিয়া)
৪ গোল
টমাস মুলার (জার্মানি)
লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা)
নেইমার (ব্রাজিল)
৩ গোল
করিম বেনজেমা (ফ্রান্স)
আরিয়েন রোবেন (নেদারল্যান্ডস)
রবিন ফন পার্সি (নেদারল্যান্ডস)
জারদেন শাকিরি (সুইজারল্যান্ড)
এনার ভ্যালেন্সিয়া (ইকুয়েডর)
২ গোল
মেমফিস ডিপে (নেদারল্যান্ডস)
ইসলাম সিলমানি (আলজেরিয়া)
ইভান পেরিসিচ (ক্রয়েশিয়া)
জার্ভিনহো (আইভোরি কোস্ট)
আসামোয়াহ জিয়ান (ঘানা)
অ্যালেক্সিস সানচেজ (চিলি)
টিম কাহিল (অস্ট্রেলিয়া)
উইলফ্রাইড বনি (আইভোরি কোস্ট)
লুইস সুয়ারেজ (উরুগুয়ে)
মারিও মানজুকিচ (ক্রয়েশিয়া)
জ্যাকসন মার্টিনেজ (কলম্বিয়া)
আহমেদ মুসা (নাইজেরিয়া)
আন্দ্রে আইউ (ঘানা)
ক্লিন্ট ডেম্পসি (যুক্তরাষ্ট্র)
