আবার অশান্ত হয়ে উঠেছে খুলনার শিল্প অঞ্চল। বাংলাদেশ জুটমিল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে হোল্ডিং কোম্পানিতে হস্তান্তরের উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিবাদে এবং বন্ধ বেসরকারি পাটকলগুলো পুরোপুরি চালুর দাবিতে প্রতিদিন খুলনা-যশোর অঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক, কর্মচারী-কর্মকর্তা সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিনই রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশসহ কর্মসূচি পালন করছেন। একদিকে চলছে রাজপথে বিক্ষোভ, অন্যদিকে তাদের পরিবার-পরিজনের মাঝে দেখা দিয়েছে শংকা ও অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশ জুটমিল কর্পোরেশনকে (বিজেএমসি) সম্প্রতি কোম্পানিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রতি বছর সরকারের কয়েকশ’ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে— এমন যুক্তিতে খুব শিগগিরই এ কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে। বর্তমানে জুটমিলগুলোকে চলছে কোম্পানি করার প্রাক-কার্যক্রম। খুব শিগগিরই মন্ত্রিপরিষদের মিটিং-এ বিষয়টি উত্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে। এটি করা হলে রাষ্ট্রায়ত্ত মিলগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে শ্রমিকরা আশংকা করছে। এজন্য এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে গত এক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন শুরু করেছে শ্রমিক-কর্মচারীরা।
২০০২ সালে খুলনার মিল-কল-কারখানার দুর্গতি শুরু হয়। ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর তত্কালীন চারদলীয় জোট সরকার আমলে প্রথম খুলনার এবং দেশের একমাত্র নিউজপ্রিন্ট মিলটি বন্ধ করার মধ্য দিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের দুরবস্থার শুরু হয়। এর কিছুদিন পর ২০০২ সালের ১৫ ডিসেম্বর বন্ধ ঘোষণা করা হয় খুলনার একমাত্র হার্ডবোর্ড মিল। এরপর ২০০৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মিলটি আবার চালু করা হয়। কিন্তু আগের শ্রমিকরা তখন কাজ করার সুযোগ পায়নি। সামান্য কিছু নতুন শ্রমিক দিয়ে মিলটি চালু রাখা হয়। এরপর থেকে মিলটি কিছুদিন চালু থাকে, আবার কিছুদিন পরে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে মিলটি বন্ধ রয়েছে।
শিরোমণি শিল্পাঞ্চলের ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি জুট মিলটি দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ রয়েছে। লে-অফ ঘোষণার মেয়াদ শেষ হলেই তা দফায় দফায় বর্ধিত করা হচ্ছে। ফুলবাড়ী গেট শিল্পাঞ্চলের বেসরকারি অন্য একটি জুটমিলেও শ্রমিকরা প্রবেশ করতে পারছে না। মালিকপক্ষ গেটে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। লে-অফ ঘোষণা না করেই কৌশলে মিলটিকে বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ মিলগুলোর শ্রমিকদের মাঝে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন পাটকলের শ্রমিকরা বৈষম্য দূরীকরণসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। বন্ধ দুইটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাট কল চালু করেছে বর্তমান সরকার। এর মধ্যে তত্কালীন পিপলস জুটমিলের নাম পরিবর্তন করে খালিশপুর জুটমিল এবং কোনো জটিলতা না থাকায় দৌলতপুর জুটমিলটিকে ওই নামেই চালু করে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক অঞ্চলে অস্থিরতার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত জুটমিলগুলো নতুন এক ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রত্যাশিত পাট রপ্তানি করতে না পারায় গত মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী খুলনার পাটকলগুলোতে প্রায় ৪শ’ কোটি টাকার পাটজাত পণ্য অবিক্রিত থাকে। স্বাভাবিকভাবেই পণ্য বিক্রি করতে না পারলে কাঁচামাল ক্রয় ও শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে অনেক জুটমিলের ‘সি’ শিফট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে শ্রমিকদের মধ্যে দারুণ অসন্তোষ বিরাজ করছে।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে হোল্ডিং কোম্পানিতে হস্তান্তরের উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিবাদে এবং বন্ধ বেসরকারি পাটকলগুলো পুরোপুরি চালুর দাবিতে আন্দোলনরত পাটকল শ্রমিক-কর্মচারী সংগ্রাম সমন্বয় পরিষদ শনিবার নতুন করে আরো ১০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
