প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিলাম

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৪, ২২:১৯
টাইব্রেকারে শেষ শটে গোল করলেন নেইমার। ৩-২ গোলে এগিয়ে গেল ব্রাজিল। চিলির গঞ্জালো জারা নিজেদের শেষ শটে গোল করতে পারলে ম্যাচটা এই যাত্রায় রক্ষা পেয়ে সাডেন ডেথে গড়াতো। সবাই তাকিয়ে ছিলেন জারার দিকে। জারা শট করলেন, বল সাইড পোস্টের গায়ে লেগে বেরিয়ে এলো। জিতে গেলো ব্রাজিল। সঙ্গে সঙ্গে মাঠে ঢুকে গেলেন ব্রাজিলের কোচ লুইস ফিলিপ স্কোলারি। জড়িয়ে ধরলেন তার ছেলেদের। ভিড় ঠেলে গিয়ে দেখেন কাঁদছেন নেইমার। তাকে সান্ত্বনা দিতে মাটি থেকে টেনে তুলে জড়িয়ে ধরলেন কোচ। শুধু নেইমার কেন, আলভেজ, থিয়েগো, অসকার, ডেভিড লুইসরাও কাঁদছিলেন। সবাইকে আদর করে মাথায় হাত দিয়ে কপালে চুমু দিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন কোচ। যে চিলিকে তিন-চার গোলে হারাবে মনে করেছিলেন ব্রাজিলিয়ানরা। সেই চিলিকে ১২০ মিনিট খেলেও হারাতে পারেনি ব্রাজিল। টাইব্রেকারের জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে হয়েছে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নকে। শনিবার ১২০ মিনিটের টান টান উত্তেজনার ম্যাচে ব্রাজিল যখন ম্যাচ উইনিং গোল পাচ্ছিল না, তখন অনেকের হার্টবিট নাকি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এ কথা বিশ্বাস করেন ব্রাজিলের কোচ লুইস ফিলিপ স্কোলারি এবং দলের গোলকিপার হুলিও সিজার। দু’জনেই স্বীকার করেছেন, ‘ম্যাচটা যে পরিস্থিতিতে গড়িয়েছিল তাতে হার্ট অ্যাটাক হওয়ারই কথা।’ স্কোলারি বলেছেন, ‘এটা ছিল নার্ভ ব্রেকিং ম্যাচ, হার্ট অ্যাটাক তো হওয়ারই কথা। আমাদের কারো যদি কার্ডিয়াক প্রবলেম থেকে থাকে তিনি হার্ট অ্যাটাক করতেই পারেন।’ নকআউট পর্বে চিলির বিরুদ্ধে ব্রাজিলের শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র হলো। ৩০ মিনিটে গোল হলো না। টাইব্রেকারে গিয়ে ৩-২ গোলে ব্রাজিল জিতল। টানা তৃতীয়বার প্রিকোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ব্রাজিলের হাতেই বিদায় নিতে হলো চিলিকে। বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে উত্তজনাকর ম্যাচ শেষে ব্রাজিল কোচ স্কোলারি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। জানালেন, তিনি তার খেলোয়াড়দেরকে ছুটি দিয়ে দিবেন। কোয়ার্টার ফাইনালের আগে ছেলেদের বাড়িতে পাঠাতে চান তারা যেন পরিবারের সাথে সময় কাটিয়ে আবার ক্যাম্পে ফেরত আসতে পারে। এমন একটা কঠিন ম্যাচ নেইমারদের মানসিক ক্লান্তি আনতে পারে। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচের পর চিলির বিরুদ্ধে ম্যাচে ব্রাজিলের ফুটবলারদের শক্তিটাই যেন ক্ষয় হয়ে গেছে। এটাকে পুষিয়ে নিতেই জ্বালানি প্রয়োজন। আর সেটা পরিবারের সাথে সময় কাটালে ভালো হবে। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ছিল উপচেপড়া সাংবাদিকদের ভিড়। প্রথা অনুসারে নিজের নাম, দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার নাম এবং বাংলাদেশ পরিচয় দিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যখন ব্রাজিল উইনিং গোল পাচ্ছিল না, কখনো মনে হয়েছিল কিনা ব্রাজিল ম্যাচটায় হেরেও যেতে পারে? স্কোলারি জবাব দিলেন, ‘আমরা তিন- চারটা সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারিনি। আমাদের গোলকিপার সিজার কয়েকটা দারুণ সেভ করেছেন। হেরে যেতে পারি, এটা না ভাবলেও আমরা কাছে মনে হয়েছে ঝুঁকির মধ্যে ছিলাম। তবে দিনটা আমাদের ছিল। তাই আমরা জিতেছি।’ ব্রাজিল ভালো খেলল অথচ গোল পেল না কেন? স্কোলারি জবাব দিলেন, ‘আমাদের অনেক পাস কমপ্লিট করতে পারেনি খেলোয়াড়রা। ভালো ভালো পাস নষ্ট করেছে। আমার মনে হয় আমাদের আরো উন্নতি করা প্রয়োজন।’ একটা যুদ্ধে হারতে হারতেও জয় এসেছে ব্রাজিলের। তারপরও এই জয়ে কোচের মুখে হাসি দেখা গেলো না। প্রশ্নবাণ ছুটে আসলেও জর্জরিত হচ্ছিলেন না। বিভিন্ন সমস্যা প্রশ্নের সাবলীল জবাব দিয়ে গেলেন ৬৫ বছর বয়সী ব্রাজিল ফুটবল দলের এই হেডমাস্টার। কোনো কৃপণতা না করে চিলির প্রশংসাও করলেন স্কোলারি। বললেন, ‘ওরা ভালো খেলেছে। আমরা এই মাঠে একটা ম্যাচে ড্র করেছিলাম। চিলির আছে ভালো মানের ফুটবলার। টেকনিক ভালো। বল পজেশনেও ছিল ভালো।’ নেইমার ছাড়া ব্রাজিল চলে না। নেইমারকে পুরোপুরি আটকে দিয়ে চিলি যেন একাই খেলে গেলো। সংবাদ সন্মেলনে নেইমারের পক্ষ নিলেন স্কোলারি। বললেন, ‘দেখুন ওর বয়স কতো? ২২ কি ২৩। নেইমার ভালো ফুটবলার। ওর যখন বয়স আরো বাড়বে তখন অভিজ্ঞতাটাও বাড়বে।’ চিলির বিরুদ্ধে ম্যাচে নেইমারকে প্রচুর ‘মারা’ হয়েছে। সে পরবর্তী ম্যাচ খেলতে পারবে কিনা জানতে চাইলে স্কোলারি বলেন, ‘হ্যাঁ ব্যথা পেয়েছে। ওকে অনেক বেশি আঘাত করা হয়েছিল। এখনও তো তিন-চারদিন সময় আছে হাতে, আশা করি এর মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। আমি যখন পর্তুগালের কোচ ছিলাম ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ম্যাচের ১৫ মিনিটের মধ্যে চোট পেয়েছিলেন, আমি কিন্তু সেই ম্যাচটা হেরে আসিনি।’ ব্রাজিলকে দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল দেশগুলোর বিরুদ্ধে খেলতে হচ্ছে, এটা কিভাবে দেখছেন? জবাবে স্কোলারি বলেন, ‘আমি জানি না কোয়ার্টার ফাইনালে কাকে মোকাবেলা করতে হবে। তবে ওরা ডিফরেন্ট স্টাইলে খেলে। আমি তো নিজের পছন্দানুযায়ী দল নিতে পারবো না।’ খেলা চলাকালীন সাইড লাইনে থাকা চিলির খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তারা নানাভাবে ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের উত্ত্যক্ত করার চেষ্টা করেছেন। এ প্রসঙ্গে স্কোলারি বলেন, ‘আমরা বিনয়ী। ড্রেসিং রুম বলেন, সাইড লাইন বলেন, সবখানেই আমরা যথেষ্ট বিনয়ী।’ চিলির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ওরা আমাদের প্রতিপক্ষ অথচ তারা বেঞ্চ ছেড়ে বার বার আমাদের দিকে চলে আসবে। সেটা তো হয় না। আমরা আগামীতে এটা মানবো না।’ ব্রাজিলিয়নদের উদ্দেশে স্কোলারির শেষ কথা, ব্রাজিলিয়ানরা ম্যাচ নিয়ে টেনশনে ছিলেন। এখনও টেনশনে আছেন। আমি তাদেরকে বলতে চাই, আমাদের চ্যাম্পিয়ন হতে হবে। আমরা চ্যাম্পিয়ন হবো। আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারবো।’