স্ট্যামিনায় এগিয়ে আফ্রিকা, দক্ষতায় ইউরোপ

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৪, ২২:২৯
ইউরোপ নাকি আফ্রিকা? শেষ ষোলোয় আজ রাতের দুটি লড়াইকে সরলীকরণ করলে ব্যাপারটাকে এভাবেই দেখা যায়। দুই ইউরোপিয়ান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এবং জার্মানি খেলবে আফ্রিকান পরাশক্তি নাইজেরিয়া এবং আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় ম্যাচে জার্মানিকে এগিয়ে রাখলেও প্রথম ম্যাচে ফ্রান্স-নাইজেরিয়া সমানে সমানে লড়াই হবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে দুটি ম্যাচেই মূল পরীক্ষাটা হবে ইউরোপিয়ানদের দক্ষতা বনাম আফ্রিকানদের স্ট্যামিনার মধ্যে। বিশ্বকাপ যখন নক আউট পর্বে এসে যায় তখন আসলে ফেভারিট বলে কেউ থাকে না। কাজে আসে না কাগজে কলমের হিসাব। অতীত পরিসংখ্যানকে নিতান্ত বাসি কিছু তথ্য বলে মনে হয়। নির্দিষ্ট ঐ সময়ে কোন্ দল ভাল খেলে তার উপরেই আসলে নির্ধারিত হয়ে যায় সবকিছু। ব্রাজিল-চিলি ম্যাচটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আয়তনের মতোই বিশাল ব্যবধান ব্রাজিল-চিলির ফুটবল ঐতিহ্যেও। ব্রাজিল যেখানে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, সেখানে চিলির সর্বোচ্চ সাফল্য মাত্র একবার সেমিফাইনাল খেলা। সেই সাফল্যের পরও পেরিয়ে গেছে অর্ধশতাব্দী। অথচ গত শনিবার রাতের খেলা দেখে কিন্তু সেরকম কিছু বোঝাই গেল না। চিলির একের পর এক আক্রমণে রীতিমতো পর্যুদস্ত ব্রাজিল শিবির; ম্যাচের প্রথম আধাঘণ্টা বাদ দিলে নির্ধারিত সময়ের প্রায় পুরোটা এমন দৃশ্যই দেখেছি আমরা। অতিরিক্ত সময়ের ৩০তম মিনিটে জারার শট বারে লেগে না ফিরলে, খেলার ফল অন্যরকমও হতে পারতো। ব্রাজিল সৌভাগ্যবান যে তারা শেষ পর্যন্ত জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে পেরেছে। যদিও এই ম্যাচে তাদের খেলা কোনভাবেই মন ভরাতে পারেনি। পুরো খেলায় নেইমার নির্ভরতার চিহ্ন ছিল স্পষ্ট। নেইমারকে কড়া প্রহরায় রেখে চিলি ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে অনেকটাই অকার্যকর করে দিয়েছে। টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো হাল্ক ভালো খেললেও গোল আদায় করে নেয়ার জন্য সেটা যথেষ্ট ছিল না। তবে বরাবরের মতোই ব্রাজিলকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে স্ট্রাইকার সমস্যা। ফ্রেড এই দলটির সেরা স্ট্রাইকার হলেও মান বিচারে তাকে কোনভাবেই ব্রাজিলের প্রথাগত স্ট্রাইকারদের সমমানের বলা চলে না। ব্রাজিলে বছরের পর বছর ধরে আমরা এমন সব স্ট্রাইকারকে দেখে আসছি যারা কিনা একাই প্রতিপক্ষের রক্ষণ ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। যেকোন হাফ চান্সকে তো বটেই ন্যূনতম কোন সুযোগকে গোলে পরিণত করার ক্ষমতা আছে ছিল তাদের। রোনালদো কিংবা তার আগে রোমারিওদের মানের না হোক অন্তত সহজ সুযোগকে কাজে লাগানোর মতো স্ট্রাইকার আপনার থাকতেই হবে। আপনি যত শক্তিশালীই হোন না কেন নক আউট রাউন্ডে আপনি কখনোই খুব বেশি সুযোগ পাবেন না। যে দল সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে তারাই জিতবে, টুর্নামেন্টের বাকি সবগুলো ম্যাচের ক্ষেত্রেই এটা সত্যি। একই কথা প্রযোজ্য নাইজেরিয়া-ফ্রান্স ম্যাচেও। ফ্রান্সকে গ্রুপ পর্বে কঠিন কোন দলের বাধা পেরোতে হয়নি। অপেক্ষাকৃত সহজেই শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে তারা। তবে আজকের ম্যাচটা নিশ্চিতভাবেই সেরকম হচ্ছে না। এর মূল কারণ দুটি, ম্যাচের সময় এবং নাইজেরিয়ার আত্মবিশ্বাস। তাপমাত্রা অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসে বলে, রাতের খেলাগুলোয় আবহাওয়া তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলে। কিন্তু দিনের খেলায় তেমনটা হবে না। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি লড়াই চলবে দুইদলের শারীরিক সক্ষমতারও। এদিক থেকে ফ্রান্সের চাইতে কিছুটা এগিয়ে থাকবে নাইজেরিয়া। আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তারা দেখিয়ে দিয়েছে পাল্টা আক্রমণেও যথেষ্ট ভয়ঙ্কর এক দল তারা। এই ম্যাচটা তাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে বলে আমার মনে হয়। আজকের ম্যাচেও তাদের খেলার কৌশলটা হবে এমনই। একক নৈপুণ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে সক্ষম এমন খেলোয়াড় দলে খুব বেশী না থাকলেও, তাদের দলীয় সমঝোতা দুর্দান্ত। অন্যদিকে করিম বেনজামার নেতৃত্বে ফরাসি আক্রমণভাগ টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই প্রতিপক্ষ শিবিরে ত্রাস ছড়িয়ে আসছে। বেনজামা নিজে আছেন দুর্দান্ত ফর্মে, পল পোগবা, বেকারি সানইয়া, অলিভার জিরুদরাও তাকে উপযুক্ত সঙ্গ দিতে প্রস্তুত। ফ্রান্সের এই দলটা বড় কিছু করতে সক্ষম কিনা তার একটা প্রমাণ আজকেই পাওয়া যাবে। অন্যদিকে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে আমি খানিকটা এগিয়ে রাখবো জার্মানিকেই। এই একটি ইউরোপিয়ান দল বরাবরের মতো এবারও আমাকে মুগ্ধ করে চলেছে। হয়তো গ্রুপ পর্ব থেকে পূর্ণ পয়েন্ট নিয়ে তারা নক আউট রাউন্ড নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে তাতে তাদের শক্তিমত্তা কমছে না। বাস্তিয়ান শোয়েনস্টেইগার, ফিলিপ লাম, মেসুত ওজিলের মতো তারকা খেলোয়াড় আছেন দলে। তবে কোন খেলোয়াড় নন, জার্মানিকে এগিয়ে রাখছে তাদের দলীয় সমঝোতা। এই একটি কারনেই তারা যেকোন টুর্নামেন্টে, যেকোন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জয়ের ক্ষমতা রাখে। এই কারণেই তারা খুব বড় কোন তারকা দলে না থাকলেও যেকোন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নির্দিষ্ট একটা মান ধরে রাখতে পেরেছে। খেলা হিসাব করলে দেখবেন নব্বই’র পর থেকে তারা প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছে। বড় কোন অঘটন না ঘটলে এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না।