‘নাটরের কাঁচাগোল্লা, গৌরনদীর দই, একবার খাইলে আর একবার কই।’ অতি প্রাচীনকাল থেকে সারাদেশের ভোজন বিলাসীদের কাছে এ কথাটির যথার্থ সত্যতা রয়েছে। বরিশালের গৌরনদীর দই ছাড়া ভোজন রসনা পুরোটাই যেন অসমাপ্ত থেকে যায়। ঐতিহ্যগত কারণে ক্রেতা সাধারণের কাছে বিশেষ করে গৌরনদীর দধি লোভনীয় সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে বহু আগেই। কোনো ভোজ-অনুষ্ঠানের শেষে গৌরনদীর দইয়ের আশায় বসে থাকেন অতিথিরা। সুস্বাদু দইয়ের স্বাদ নিয়ে ঢেঁকুর তোলেন সবাই। আর এ ঐতিহ্য এখন শুধু দেশেই নয়। গৌরনদীর দইয়ের সুনাম বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। সুদূর আমেরিকায় গৌরনদীর রনা দেবনাথ নামের এক যুবক তৈরি করেছেন গৌরনদী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে পুরো আমেরিকায় নিউইয়র্কের গৌরনদী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারটি বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। তিনি একসময় গৌরনদীর একটি মিষ্টির দোকানের কর্মচারী ছিলেন। ৯০ দশকের দিকে আমেরিকার ডিভি লটারি পেয়ে তিনি আমেরিকা গমন করেন।
এ অঞ্চলের নতুন জামাইয়ের হাতে গৌরনদীর মিষ্টির হাঁড়ি না থাকলে শ্বশুর বাড়ি গমন যেমন বেমানান তেমনি অফিসের বসেক খুশিসহ যেকোনো কাজের তদবিরের জন্য গৌরনদীর দধি, মিষ্টি ও ঘি’র কোনো বিকল্প নেই। সারাদেশে গৌরনদীর দধি, মিষ্টি, ঘির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। বিবাহ, বৌ-ভাত, জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন তদ্বিরের জন্য গৌরনদীর দই-মিষ্টির জন্য দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসেন গৌরনদীতে। প্রতিদিন শত শত মন দধি, মিষ্টি এখান থেকে ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, দিনাজপুর, সিলেটসহ বিভিন্নস্থানে চালান দেওয়া হয়। দেশের বাইরেও ব্যাপকভাবে গৌরনদীর দধি, মিষ্টি, ঘির সুনাম রয়েছে। মাটির হাঁড়িতে পাতা গৌরনদীর দইয়ের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। ১০-১৫ দিনেও স্বাভাবিক আবহাওয়ায় গৌরনদীর দই নষ্ট হয় না। যেকোনো যানবাহনে সহজে বহন করা যায়। শুকনো মিষ্টি এক মাসে ও ঘি এক বছরেরও নষ্ট হয় না। চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে অধিক মুনাফার কথা না ভেবে গুণগত মান ও সুনামকে ধরে রাখতে গৌরনদী বন্দরে দধি-মিষ্টি ও ঘি তৈরি করে আসছেন বলরাম ঘোষ, শচীন ঘোষ, বলাই ঘোষ, জগদীশ ঘোষ, স্বপন ঘোষ। গৌরনদী বন্দরে ৬টি, টরকী বন্দরে ৫টি, গৌরনদী বাসস্ট্যান্ডে ৪টি, বাটাজোরে ৩টি সহ বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রায় ২৫টি ঘোষের দোকানে দই-মিষ্টি তৈরি হচ্ছে। এছাড়া আগৈলঝাড়ার গৈলা বাজারে ৩টি দোকানে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু দই-মিষ্টি। খবর নিয়ে জানাগেছে, দই-মিষ্টি তৈরির কাজে গৌরনদীর প্রায় হাজার খানের শ্রমিক নিযুক্ত রয়েছেন। এ ছাড়া দুধ বিক্রি ও সরবরাহের কাজে নিযুক্ত রয়েছেন গৌরনদী ও আশপাশ এলাকার কয়েক হাজার লোক। গৌরনদীর বিভিন্ন হাট-বাজারে দই-মিষ্টি তৈরি হলেও ভালো মানের দই-মিষ্টি তৈরি হচ্ছে গৌরনদী বন্দর ও গৈলা বাজারে। গৌরনদী বন্দরে দীর্ঘদিন যাবত সুনামের সহিত দই-মিষ্টির ব্যবসা পরিচালনা করছেন সচীন ঘোষ ও বলারাম ঘোষ। ইতোমধ্যে তারা দু’জনই বরিশাল জেলার সেরা করদাতা হিসেবে পদকপ্রাপ্ত হয়েছেন।
সচীন ঘোষ (৮০) জানান, ‘আমি সুদীর্ঘ ৬০ বছর যাবত দই-মিষ্টি তৈরি করছি। আমার বাবাও এই কাজটি করেছিলেন। তিনি এই বৃদ্ধ বয়সেও প্রতিদিন নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য গোয়ালাদের কাছ থেকে দু্ধ কেনার কাজটি করছেন। তার ২ পুত্র তার বাবার প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন। মেশিন দিয়ে নয়, সচীন ঘোষ এখনও হাতে নিয়ে দুধের ঘনত্ব নির্ণয় করতে পারেন।’ সচীন ঘোষ আরো জানান, ভালো দই-মিষ্টি তৈরি করতে হলে খাঁটি দুধের প্রয়োজন, কিন্তু খাঁটি দুধ পাওয়া মুশকিল। বলরাম ঘোষ বলেন, ‘বাবার (সুশীল ঘোষের) পাশাপাশি গত ২০ বছর ধরে আমি এ পেশার সঙ্গে জড়িত আছি। সম্প্রতি বাবার মৃত্যুর পর আমিই বাবার পেশাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছি। আমার বাবা সুশীল ঘোষ বংশ পরম্পরায় দীর্ঘ ৫০ বছর সুনামের সহিত এ ব্যবসা করে গেছেন। তার মৃত্যুর পর তারই প্রতিষ্ঠিত গৌরনদী বন্দরের শ্রী গুরু মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সুনাম ধরে রেখেছেন সুশীল ঘোষের পুত্র বলরাম ঘোষ। বর্তমানে তাদের বরিশাল শহরে ৩টি মিষ্টির দোকান রয়েছে গৌরনদীতে তৈরিকৃত মিষ্টি হচ্ছে, দধি, চমচম, কালোজাম, শুকনো মিষ্টি, লাদেন মিষ্টি, বড় রসগোল¬া, রসমালাই, রশমঞ্জরি, ছানার সন্দেশ, ক্ষীরপুরী, মাওয়া, ছানার জিলাপি ইত্যাদি। জানা গেছে, প্রায় আড়াই শ বছর পূর্বে ডাওরী ঘোষ নামের এক ঘোষ গৌরনদীতে তৈরি করেন এ লোভনীয় মিষ্টি। পরবর্তীতে বংশপরস্পরায় গৌরনদীর ঐতিহ্যবাহী ভোজ্যপণ্যের ধারা ধরে রেখেছেন অত্র এলাকার কয়েকজন খ্যাতিমান ঘোষ। তাদের তৈরি দধি, মিষ্টি, ঘি সারাদেশে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে।
