উত্পাদন থেকে সংরক্ষণ পর্যায়ে ধান নষ্ট হয় ৯%

আপডেট : ২৮ মে ২০১৯, ২২:৫১

গেলো বছর দেশে ২ কোটি মেট্রিক টন বোরো ধান উত্পাদিত হয়। কিন্তু ফসল তোলা থেকে বিক্রয় পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে হারভেস্টিং লস বা সংগ্রহোত্তর ক্ষতি হয় ১৪ লাখ ৬৫ হাজার ৫০৬ মেট্রিক টন। অর্থাত্ উত্পাদনের সাড়ে ৭ ভাগই ক্ষতি হয়েছে। মূলত ধান কাটা থেকে মাড়াই পর্যায়ে এবং যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে কৃষকের এই ক্ষতি হচ্ছে। আউশ ধানের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ ৮ দশমিক ৯৩ ভাগ, আমন ধানে ক্ষতির পরিমাণ ৭ দশমিক ৭০ ভাগ, গমে প্রায় ৬ ভাগ, ভুট্টা ৫ দশমিক ৮ ভাগ, আলু ৭ দশমিক ১৩ ভাগ। এর পাশাপাশি পাট উত্পাদনে ক্ষতি সাড়ে ৫ ভাগ। ফসলের এই ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ উত্পাদন পর্যায়ের চেয়ে উত্পাদন পরবর্তী পর্যায়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘রিপোর্ট অন এগ্রিকালচার এন্ড রুরাল স্ট্যাস্টিক্স-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত বাজার সুবিধা থাকলে কৃষক তুলনামূলক বেশি দাম পায়। তাছাড়া কৃষি কাজে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্যও রয়েছে।

প্রতিবেদন বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক আকতার হোসেন খান ইত্তেফাককে বলেন, জরিপের তথ্যানুযায়ী ফসল কাটার পর্যায় থেকে মজুদ পর্যায়ে কৃষকের তুলনামূলক বেশি ক্ষতি হচ্ছে। ইঁদুরের কারণ ছাড়াও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ফসল সংরক্ষণ না করায় তাদের উত্পাদনের একটি বড় অংশ এই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তিনি জানান, প্রতিবেদনের খসড়া প্রস্তুত করা    হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী ফসল তোলার পরপরই বিক্রি করায় কৃষকরা তুলনামূলক কম দাম পাচ্ছে। হাট-বাজারে যারা বিক্রি করতে পারছে তারাই তুলনামূক বেশি দাম পাচ্ছেন। হিসাবে বলা হয়েছে, বোরো ধানখেত হতে কেজি প্রতি বিক্রয় হয়েছে গড়ে ১৮ টাকা ৯২ পয়সায়। অন্যদিকে এই ধান হাট-বাজারে বিক্রয় করে দাম পেয়েছেন ২৪ টাকা ৪৯ পয়সা। শুধু ধানের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রেও বাজার সুবিধায় বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে। উত্পাদন পর্যায়ে যেখানে আলু প্রতি কেজি ১৩ টাকা ২৫ পয়সা বিক্রয় হয়েছে, সেখানে হাট-বাজারে ১৮ টাকা ৭৯ পয়সায় বিক্রয় হয়েছে। মসুর ডাল ৫৩ টাকা ৭১ পয়সা থেকে ৬৪ টাকা ৪৭ পয়সা, হলুদ ৪৮ টাকা থেকে ৭১ টাকা ৫৭ পয়সা, আউশ ধান ১৮ টাকা ৪৭ পয়সা থেকে ২৩ টাকা ৬১ পয়সায় গড়ে বিক্রয় হয়েছে। অর্থাত্ যারা বাজার সুবিধা বেশি পেয়েছে, তারাই ফসলের বেশি মূল্য পেয়েছে।

এদিকে দেশে কৃষি কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের মাঝে মজুরি বৈষম্য বিদ্যমান। বিবিএস এর জরিপ অনুযায়ী দেশে গড়ে একজন কৃষি শ্রমিকের মজুরি ৩৮৬ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মজুরি পায় চট্টগ্রামে ৪৫৪ টাকা এবং সবচেয়ে কম খুলনা ও রাজশাহীতে ৩৪৭ টাকা। বরিশালে ৪৩০ টাকা, ঢাকা বিভাগে ৩৮৯ টাকা, ময়মনসিংহ বিভাগে ৪০৫ টাকা। শ্রমিকরা গড়ে প্রায় ৮ ঘণ্টার শ্রমের বিনিময়ে এই মজুরি পায়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারীরা পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পাচ্ছে। পুরুষরা গড়ে ৩৮৮ টাকা দৈনিক মজুরি পেলেও নারীরা পায় ৩৪৬ টাকা। দেশে কৃষিকাজে নিয়োজিত রয়েছে ২ কোটি ৪৩ লাখ ৯২ হাজার শ্রমশক্তি। পারিবারিক কৃষি কাজ ছাড়াও মজুরির বিনিময়ে কাজ করছেন প্রায় ৭৩ লাখ শ্রমিক। এর মধ্যে পুরুষ ৬৮ লাখ ৪৪ হাজার ও নারী ৪ লাখ ৪৭ হাজার।

জরিপের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে কৃষি ঋণের ৬৩ ভাগ আসছে বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা হতে আসছে মাত্র ২৬ ভাগ ঋণ। এর বাইরে মহাজন থেকে সাড়ে তিন দশমিক ৬৭ ভাগ, আত্মীয়-স্বজন থেকে ৩ দশমিক ৭৫ ভাগ ঋণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরিবারপ্রতি গড়ে ৪২ হাজার ৬শ টাকা ঋণ গ্রহণ করে। ব্যাংক হতে নেওয়া হয়েছে গড়ে ৫৩ হাজার টাকা, এনজিও থেকে প্রায় ৩৯ হাজার টাকা নিয়েছে পরিবার প্রতি।

কৃষক পরিবার প্রতি বার্ষিক আয় ২ লাখ টাকা। এর মধ্যে কৃষি কাজ হতে ৩৮ শতাংশ এবং অকৃষি খাতে ৬২ শতাংশ আয় আসছে।

বিবিএস সংশ্লিষ্টরা জানান, জরিপকালে দেশের ৬৪টি জেলা হতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। শিল্পের প্রসার হলেও দেশের ৪৩ ভাগ কর্মসংস্থান ও মোট জিডিপির ১৫ ভাগ আসছে কৃষিখাত থেকে। মূলত দেশের কৃষি পরিবারগুলোর আর্থ-সামাজিক অবস্থান, শিক্ষা ও সামাজিক বিভিন্ন সূচকে তাদের অবস্থান জানতে এই জরিপটি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ১২ কোটি গ্রামীণ মানুষের মধ্যে প্রায় ৬৬ ভাগ বসবাস করছে কাঁচাবাড়িতে, ৮৫ ভাগ নলকূপের পানি পান করছে। স্যানিটারি টয়লেট ব্যবহার করছে মাত্র ৩২ ভাগ। ৮২ ভাগ মানুষ বিদ্যুত্ সুবিধার আওতায় আসলেও প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ রান্নার জন্য কাঠ-খড়ি ব্যবহার করছে।