বাড়ির উঠানে গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা মোহাম্মদ আলীর মত আর এক তরুণীর সন্ধান পাওয়া গেছে গাইবান্ধায়। নাম মিনতি রাণী (১৮)। জেলার সাঘাটা উপজেলার শিমুলতাইড় গ্রামের সিনধিয়া রামের মেয়ে। দীর্ঘ ৮ বছর ধরে পায়ে লোহার শিকল দিয়ে তাকে বাড়িতে বেঁধে রাখা হয়েছে। পায়ের গোড়ালীতে লোহার ঘর্ষণে কড়া পড়েছে। যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা চরাঞ্চলের মানুষকে কুসংস্কারে নিকৃষ্ট জীবন-যাপন করতে হচ্ছে।
গত ৪২ বছরে চরাঞ্চলের জনবসতিতে জীবন-যাত্রার মান বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি, দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান যে অর্থ খরচ করেছে, তা এদের জীবনে একটুও আলোর সন্ধান দেয়নি। এ বিষয়ে আজ প্রশ্ন ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে মোহাম্মদ আলী ও মিনতি রাণী। মিনতির মা জয়ন্তি রানী জানান, অন্যদের মতোই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন ছিল মিনতির। সবার মতো খেলাধুলা, হাসিখুশি, পড়াশোনা সবই করতো সে। কিন্তু সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় হঠাত্ কিছুটা মানসিক সমস্যা মিনতির মধ্যে দেখা দেয়।
মেয়েটির উপর অশুভ আত্মার কুদৃষ্টি পড়েছে ধরে নিয়ে তাকে সারিয়ে তুলতে স্থানীয় কবিরাজের শরণাপন্ন হন তার পরিবার। কবিরাজ মন্ত্র, তাবিজ-কবচ, পানিপড়া আর ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে তাকে ভালো করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সঠিক চিকিত্সার অভাবে মেয়েটি দিন দিন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে উন্মাদের মত আচরণ শুরু করে। এক পর্যায়ে মিনতি আশপাশের মানুষ বা পাড়া-প্রতিবেশীদের দেখলে ক্ষেপে উঠতে শুরু করে। যখন তখন দৌড়ে বাড়ি থেকে বাইরে চলে যায়। পরিবারের সদস্যরা সারাদিন হয়রান হয়ে এলাকায় খোঁজ করে বাড়ি নিয়ে আসেন। বাবা সিনধিয়া রাম বললেন, মেয়ে মানুষ, উঠতি বয়স, যখন তখন বাড়ির বাইরে চলে গিয়ে যদি কোন বখাটের খপ্পরে পড়ে সম্ভ্রমহানি হয় এসব চিন্তা, ঝামেলা আর পরিবারের সম্ভ্রম নষ্ট না হওয়ার জন্যই পাড়া-প্রতিবেশীর পরামর্শে তার পায়ে শিকল বেঁধে দেয়া হয়। দিনরাত ২৪ ঘন্টা শিকল পরেই থাকতে হয় তাকে। এভাবে একে একে কেটে যায় আটটি বছর।
স্থানীয় বোনারপাড়া বাজারের ফুটপাতে হলুদ বিক্রি করেন সিনধিয়া রাম। সামান্য আয় দিয়ে সংসারে নিত্যখরচের জোগান হয় না। তার উপর মেয়ের চিকিত্সা, মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাতে যা ছিল সব দিয়ে মিনতির চিকিত্সা করতে গিয়ে এখন দেনায় জর্জরিত হয়ে পথে বসেছেন।
সাংবাদিকদের কাছে এমন খবর শোনার পর টনক নড়ে উপজেলা প্রশাসনের। সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল আউয়ালের নির্দেশে থানা পুলিশ অবশেষে দীর্ঘ আট বছর পর রবিবার বিকালে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার শিমুলতাইড় গ্রাম থেকে তাকে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে ভর্তি করান। (ইউএনও) আব্দুল আউয়াল বলেন, ঘটনাটি সাংবাদিকদের কাছ থেকে জানার পর পরই সাঘাটা থানার ওসির সাথে কথা বলে মিনতির যাবতীয় চিকিত্সার ব্যবস্থা করা হয়। চিকিত্সার জন্য তাকে গাইবান্ধা আধুনিক সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
সিভিল সার্জন ডা. আহাদ আলী জানান, মিনতি রাণী এখন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন তার পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মিনতি রাণী। তবে দীর্ঘমেয়াদি চিকিত্সার মাধ্যমে তাকে সুস্থ করা সম্ভব।
গাইবান্ধা জেলা কমিউনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মিহির ঘোষ ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রিক্তু প্রসাদ জানান, শুধু মোহাম্মদ আলী কিংবা মিনতি রাণী নয়, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা চরাঞ্চলে ভূত-প্রেত-মাসাম-কালীর আছরের নামে সামান্য রোগে আক্রান্ত অসুস্থ মানুষগুলোর সম্ভাবনাময় জীবনগুলো দমকা বাতাসে নিভে যাচ্ছে।
