ঠাকুরগাঁও জেলার প্রায় ১৬ লাখ লোকের জন্য চিকিত্সা সেবার সকল ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় ডাক্তারের অভাবে রোগীরা চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ছোট-খাট চিকিত্সার জন্যও তারা ছুটছেন জেলা শহর কিংবা রাজধানীর হাসপাতালে। রোগীরা জানান, সরকারি হাসপাতালে গেলে ডাক্তার পাওয়া যায় না। ওষুধপত্র দেয় না। শুধু পরীক্ষার জন্য লম্বা তালিকা দিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। অথচ এসব পরীক্ষা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই সম্ভব। এছাড়া সার্জন ও অজ্ঞানকারী চিকিত্সকের অভাবে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে বড় কোন অপারেশন হয় না বললেই চলে। নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে যায় অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিক। সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্স, কর্মচারী ও রোগীদের সঙ্গে আলাপকালে চিকিত্সা সেবার এ চিত্র পাওয়া গেছে।
জেলায় সদর হাসপাতাল ছাড়াও ৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৫১টি ইউনিয়ন সাব সেন্টার ও ১৩৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। মোট ১৩২টি চিকিত্সকের পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ৪৮ জন। ৮৪টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। কর্মরত চিকিত্সকরাও বেশির ভাগ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। তারা জেলা ও থানা সদরে প্রাইভেট ক্লিনিকে ব্যস্ত থাকেন। হাসপাতালে নার্স ও টেকনিশিয়ানের সংকট প্রকট। সরকারিভাবে মাত্র ২/৩ ধরনের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ রোগীদের দেয়া হয়। বাকি ওষুধ নিয়মিত পাচার হয়ে যায়। রোগীদের খাবারের মান এতো নিম্নমানের যা খাওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে ৯৫ ভাগ রোগী বাইরে থেকে খাবার এনে খান বলে চিকিত্সকরা জানান।
বালিয়াডাঙ্গি হাসপাতালে ডাক্তারের অধিকাংশ পদই শূন্য:এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২২ জন ডাক্তারের মধ্যে মাত্র ৫ জন কর্মরত। ডাক্তার সংকটের কারণে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত অপারেশন বা জটিল রোগের চিকিত্সা দেয়া সম্ভব হয় না। ফলে অনেক রোগী জেলা শহরের প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। স্থানীয় কর্মকর্তা ডা. রিয়াজুল ইসলাম জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত মাসে ১৪টি অপারেশন হয়েছে। ডাক্তারের তীব্র সংকটের কারণে সব সময় অপারেশন করা যায় না।
ডাক্তার মেলে না রাণীশংকৈল হাসপাতালে: রাণীশংকৈল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ডাক্তারদের আবাসিক ব্যবস্থা থাকলেও তারা নিয়মিত সেখানে থাকেন না। বেশির ভাগ সময় তারা প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখেন বলে জানিয়েছেন এ হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে আসা একাধিক রোগী। বর্তমানে এখানে ৮ জন ডাক্তার কর্মরত আছেন। হাসপাতালের একটি চক্র বাইরে ওষুধ বিক্রি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া অপারেশনের সকল ব্যবস্থা থাকলেও অজ্ঞানকারী ডাক্তারের অভাবে প্রায় সময়ই অপারেশন করা সম্ভব হয় না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. নজরুল ইসলাম ডাক্তাররা কিছু সময় বাইরে রোগী দেখেন বলে স্বীকার করেন।
প্রাইভেট ডাক্তার এনে অপারেশন হয় পীরগঞ্জ হাসপাতালে: এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে মাত্র ৪ জন ডাক্তার দিয়ে চিকিত্সা সেবা দেয়ার চেষ্টা চলছে। এখানে অপারেশন থিয়েটার থাকলেও সার্জন ও অজ্ঞানকারী ডাক্তারের অভাবে অপারেশন করা সম্ভব হয় না। কোন জরুরি অপারেশন থাকলে প্রাইভেট ডাক্তার এনে অপারেশন করা হয়। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. আব্দুল মজিদ বিষয়টি স্বীকার করে জানান, সার্জারি ও গাইনী বিভাগে ডাক্তার না থাকায় অপারেশন করা যাচ্ছে না।
হরিপুর হাসপাতালে মাত্র ২ জন ডাক্তার: জেলার সীমান্ত ঘেঁষা হরিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাত্র ২ জন ডাক্তার রয়েছেন। ফলে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। হাসপাতালে অপারেশনের সকল ব্যবস্থা থাকলেও অপারেশন হয় না। ডাক্তার না পেয়ে প্রায় ৬০ কি:মি দূরে গিয়ে জেলা সদরে চিকিত্সা নিতে হচ্ছে উপজেলাবাসীকে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলী জানান, সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় ডাক্তাররা এখানে থাকতে চান না।
দুপুরের আগেই বন্ধ কমিউনিটি ক্লিনিক:জেলার ৫১টি ইউনিয়নে ১৩৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। কিন্তু ক্লিনিকগুলো সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত খোলা থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্লিনিক বন্ধ হয়ে যায় দুপুরের আগেই। ফলে চিকিত্সার জন্য রোগীদের যেতে হয় অন্য কোন ক্লিনিক বা হাসপাতালে। আর ওষুধ সংকটের কারণে ক্লিনিকগুলোতে সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। এছাড়া জেলায় ৫১টি পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক রয়েছে। এখানেও নিয়মিত ডাক্তার আসেন না।
যক্ষ্মা হাসপাতালে যক্ষ্মা নির্ণয়ের ব্যবস্থা নেই! :ঠাকুরগাঁওয়ে রয়েছে ২০ শয্যা বিশিষ্ট বক্ষব্যাধি হাসপাতাল। যদিও নামে যক্ষ্মা হাসপাতাল, কিন্তু এ হাসপাতালে যক্ষ্মা নির্ণয়ের কোনো ব্যবস্থাই নেই! হাসপাতালের ডাক্তার আবু মোহাম্মদ খায়রুল কবির জানান, হাসপাতালে ডাক্তার, কর্মচারী ও কর্মকর্তা সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী চিকিত্সা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল: আশপাশের কয়েক জেলার মানুষের চিকিত্সার অন্যতম নির্ভরযোগ্য স্থান ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল। হাসপাতালটি ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হলেও এখানে ৫০ শয্যারও জনবল নেই। যেখানে ২২ জন চিকিত্সকের প্রয়োজন সেখানে রয়েছেন মাত্র ১৪ জন। এখানে সারাবছরই প্রায় ৫ শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন। সে কারণে এ হাসপাতালের রোগীদের সেবা দিতে চিকিত্সকদের হিমশিম খেতে হয়। নার্স ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর ১৮টি পদ শূন্য থাকায় রোগীর চাপে দিশেহারা হয়ে পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালে সরকারিভাবে অল্প খরচে আলট্রাসনোগ্রাম, এক্সরে, ইসিজি করার সুযোগ থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দালালের খপ্পরে পড়ে বাইরের সেন্টারগুলো থেকে এগুলো করানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিভিল সার্জন যা বলেন: জেলার স্বাস্থ্য সেবার এই চিত্র প্রসঙ্গে ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন আফজাল হোসেন তরফদার জানান, ডাক্তার সংকটের কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে অপারেশন কার্যক্রম বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকে। জেলার বেশি ভাগ উপজেলা সীমান্ত এলাকায় হওয়ায় সেখানে ডাক্তাররা থাকতে চান না। তবে ডাক্তার সংকটের মধ্যেও উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবার মান বেড়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ওষুধ না পাওয়াসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের কর্মচারীরা কোনোরকম অনিয়ম করলে, অভিযোগ পাওয়া মাত্র ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ ডাক্তাররা ঠিকমত দায়িত্ব পালন করেন না— এমন প্রশ্নের জবাবে সিভিল সার্জন বলেন, ‘ডাক্তাররাও মানুষ। রোগীর তুলনায় ডাক্তার কম হওয়ায় সেবা দিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। তাই কোন কোন সময় গাফিলতি হতেই পারে।’
