প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাপানের প্রতি শৈশব থেকেই আমার মুগ্ধতা ছিল। আমি জাপানি চিত্রকলা, ক্যালেন্ডার, ডাকটিকিট, পুতুল প্রভৃতি সংগ্রহ করতাম। জাপান সব সময়ই আমার হূদয়ের কাছাকাছি ছিল। আমার পিতার কাছ থেকেই এই ভালো লাগা আমার মধ্যে এসেছে। বাংলাদেশ যেন আরেক জাপান হতে পারে- তার এই আকাঙ্ক্ষা আমি আমার দেশের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে চাই। জাপানের অন্যতম শীর্ষ ইংরেজি দৈনিক জাপান টাইমসে লেখা এক নিবন্ধে জাপানের প্রতি এমন অনুভূতির কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর লেখা নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী নিবন্ধের শুরুতে লিখেছেন, গত এক দশকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে বিশ্ব সম্প্রদায় অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত বলে আখ্যা দিয়েছে। বাংলাদেশ গত দশকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং চলতি বছরে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভিশন-২০২১ এর সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে উন্নীত করতে আমরা কাজ করছি। জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছি। আমরা ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনের পরিকল্পনা করছি। এর মধ্যে একটি জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য রয়েছে।
‘উন্নয়নের জন্য জাপান-বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব’ শিরোনামের নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও জাপানের সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে। যা পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছে। জাপানি ছাত্ররা খাবারের পয়সা বাঁচিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল জাপান। আমাদের দুই দেশের পতাকার মধ্যে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায়ই বলতেন যে, জাপানের পতাকা তাকে সূর্যোদয়ের দেশের কথা মনে করিয়ে দেয় আর বাংলাদেশের পতাকা মনে করিয়ে দেয় লাখ লাখ জীবনের আত্মত্যাগ ও সবুজ মাঠের কথা। তিনি জাপানের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে শিল্পায়নে রূপান্তরিত হওয়ার প্রেক্ষিত থেকে আমাদেরকে অনুপ্রেরণা নিতে বলতেন। ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের জাপান সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের শক্তিশালী সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়। ১৯৭৪ সালে তার অনুরোধে যমুনা সেতুর (বঙ্গবন্ধু সেতু) জন্য জাপান একটি সম্ভাব্যতা যাচাই করে। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ সবার আগে জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশে ব্যবসায় ও বিনিয়োগ সুবিধা নিয়ে জাপানি উদ্যোক্তাদের বাড়তি আগ্রহে আমরা খুবই উত্সাহিত। বর্তমানে ২৮০টি জাপানি ফার্ম বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে। জাপানি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দ্বারা সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে জাপান-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আস্থা দিন দিন বাড়ছে।
২০১৬ সালে ঢাকায় সন্ত্রাসী হামলার পর দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পরীক্ষার মুখে পড়ে। হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় সাত জাপানি নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনাকে হূদয়বিদারক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরপরও জাপানের জনগণ ও সরকার আমাদের পাশে থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নে সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। জাপান ও বাংলাদেশ জঙ্গি ও সন্ত্রাস নির্মূলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
প্রধানমন্ত্রী আরো লিখেছেন, ২০২২ সালে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করবো। আমি আশাবাদী যে, শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে আমাদের পারস্পরিক মূল্যবোধ ও অঙ্গীকারের মাধ্যমে জনগণের সমৃদ্ধি অর্জনে সমর্থ হব। আমাদের সাদৃশ্যপূর্ণ পতাকা আমাদের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
জাপান পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান, সৌদি আরব ও ফিনল্যান্ডে তাঁর ১২ দিনের ত্রিদেশীয় সফরের উদ্দেশ্যে মঙ্গলবার বিকালে জাপান পৌঁছেছেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইট প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে স্থানীয় সময় (জাপান সময়) সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় জাপানের হানিদা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করলে জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তোশিকো আবে এবং টোকিওতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান। এর আগে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তিনবাহিনী প্রধানগণ, ডিপ্লোমেটিক কোরের ডিন এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান।
