মাঠের বাইরের নানা বিশ্বকাপ বিরোধী বিক্ষোভ ব্রাজিল বিশ্বকাপে বড় প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। তবে এখন দেখা যাচ্ছে বিক্ষোভ নয়, ব্রাজিলের আবহাওয়া টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় প্রভাবক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিঃসন্দেহে প্রভাবটা বেশি পড়ছে ইউরোপীয় দেশগুলোর উপর। ফলে তুলনামূলক বিচারে দুর্বল লাতিন বা আফ্রিকান দেশগুলো তাদের বড় পরীক্ষার মুখে ফেলছে। গত রবিবার রাতটিও তার ব্যতিক্রম ছিল না এবং আজও তার অন্যথা হবে বলে মনে হয় না। শক্তিমত্তা কিংবা অতীত সাফল্যের বিচারে তো বটেই, কন্ডিশন বিবেচনা করলেও আজ আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে সুইজারল্যান্ডের সুযোগ খুব কম। একই কথা প্রযোজ্য বেলজিয়াম-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রাতের দ্বিতীয় খেলায়।
বেলজিয়াম হয়তো তারকাখ্যাতিতে এগিয়ে আছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আবহাওয়ার কারণে কিছু বাড়তি সুবিধা পাবেই।
আর্জেন্টিনা যদিও এখন পর্যন্ত নিজেদের সামর্থ্যের পুরোপরি মাঠে অনুবাদ করতে পারেনি, তবে আজকের ম্যাচে আমি এগিয়ে রাখবো তাদেরই। কোন সন্দেহ নেই এর সবচেয়ে বড় কারণ লিওনেল মেসি। দিয়েগো ম্যারাডোনা-জিনেদিন জিদানের পর কোন খেলোয়াড় তার দলে এতটা প্রভাব ফেলতে পারেনি যতটা মেসি ফেলছে আর্জেন্টিনা দলে।
এই দলটার প্রতিটি ক্ষেত্রে মেসির প্রভাব স্পষ্ট। মেসি যদি ভাল খেলেন আর্জেন্টিনা ভাল খেলছে, মেসি হতাশ করলে হতাশ করছে দলও। আমি আগেও বলেছি আর্জেন্টিনার জন্য ভয়ের কারণ এটাই।
আপনি যখন একজন খেলোয়াড়কে কেন্দ্র করে খেলবেন তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রতিপক্ষ তাকে আটকে দিতে চাইবে। যদিও কখনও কখনও সেটা দলের অন্য খেলোয়াড়দের বাড়তি কিছু সুবিধা দেয়, তবে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার অন্য কোন খেলোয়াড় সেই সুযোগটা নিতে পারেননি।
সার্জিও অ্যাগুয়েরো, গঞ্জালো হিগুইনরা নিজেদের হারিয়ে খুঁজছেন। তাদের তুলনায় বরং ইজাকুয়েল লাভেজ্জির পারফরম্যান্স আমার কিছুটা ভাল মনে হয়েছে। মেসির বাইরে দলের অন্য কোন খেলোয়াড় যদি আমার নজর কেড়ে থাকেন, তাহলে সেটা অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া। বাম প্রান্ত থেকে ক্লান্তিহীনভাবে একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া, প্রতিপক্ষের ডি বক্সে নিয়মিত ত্রাস চালিয়ে যাওয়া, হঠাত্ করে তীব্র গতির দৌড়ে বিপক্ষের রক্ষণে হামলা চালানো; সবকিছুই ঠিকভাবে করতে পারছেন ডি মারিয়া। যদিও এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা এখন পর্যন্ত গোলের দেখা পাননি, তবে নিজের আসল কাজটা ঠিকভাবেই করছেন তিনি।
আমি নিশ্চিত মেসির পাশাপাশি ডি মারিয়ার জন্যও বিশেষ কোন কৌশল সাজিয়ে রেখেছেন সুইজারল্যান্ড কোচ ওটমার হিজফেল্ড। ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের এই কিংবদন্তি কোচ আজ কিভাবে আর্জেন্টিনা আক্রমণভাগের মোকাবিলা করেন সেটা দেখার জন্য আমি উন্মুখ হয়ে আছি।
আমরা সব সময়ই বলি ফুটবল মাঠের খেলা। বল একবার মাঠে গড়িয়ে গেলে কোচের করার খুব বেশি কিছু থাকে না। তবে, সেই কোচ যদি সেরামানের হন তাহলে কিন্তু ব্যাপারটা ভিন্ন। প্রথম ম্যাচে ইকুয়েডরের বিরুদ্ধেই সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন হিজফেল্ড। বায়ার্ন মিউনিখ এবং বরুশিয়া ডর্টমুন্ডকে বুন্দেসলিগা এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতানো এই কোচ এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন বিশ্বকাপ শেষেই অবসরে যাচ্ছেন তিনি। আমি নিশ্চিত নিজের বিদায়টা স্মরণীয় করে রাখতে বড় কোন পরিকল্পনা করে ফেলেছেন তিনি।
মেসি-মারিয়াদের আক্রমণের জবাব দিতে হিজফেল্ড তাকিয়ে থাকবেন জাদরেন শাকিরির উপর। হন্ডুরাসের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ ভালভাবেই দিয়েছেন এই বায়ার্ন মিউনিখ তারকা। আর্জেন্টিনার ভঙ্গুর রক্ষণ বাড়তি কিছু সুবিধা দিতে পারে শাকিরিকে।
তবে আবারও বলছি, ব্রাজিলের আবহাওয়ায় একটি লাতিন দেশের সাথে পাল্লা দেয়া সুইসদের জন্য দারুণ কঠিন হবে।
রাতের অন্য খেলায় ডার্ক হর্স বেলজিয়াম খেলবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। বেলজিয়ামের তারকাদ্যুতি নিয়ে এরই মধ্যে আমরা অনেক আলোচনা শুনে ফেলেছি। সেই তারকারা যে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারছেন না সেটাও আমরা দেখেছি। আমি শঙ্কিত, বেলজিয়াম যদি গত তিন ম্যাচের চেয়ে আজ ভাল খেলতে না পারে সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভুগতে হবে তাদের। মার্কিন দলটি গত দশ-বার বছর ধরে ক্রমেই নিজেদের খেলাটির সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলে আনছে। গত আসরে তারা দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলেছে, এই আসরেও গ্রুপপর্বে তাদের পারফরম্যান্স সমীহ জাগানিয়া। আর কোচ হিসাবে জার্গেন ক্লিন্সম্যানের অভিজ্ঞতার পাল্লা বেশ ভারী। খেলোয়াড় হিসাবেও বেলজিয়ামের খেলা কাছ থেকে দেখায় ক্লিন্সম্যান আজ প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা কিংবা দুর্বলতা সম্পর্কে বেশ ভালো জানেন। তাছাড়া আমি আগেই বলেছি, ব্রাজিলের আবহাওয়ার সাথে কিছুটা পরিচিত হওয়ায় বেলজিয়ামের চাইতে বাড়তি কিছু সুবিধা পাবে যুক্তরাষ্ট্র। আর ম্যাচ যদি অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়, আমি বলবো তাহলে জয়ী দলটির নাম হবে আমেরিকা। কারণ, এই আবহাওয়ায় অতিরিক্ত সময়ে লড়াই করা কোন ইউরোপীয় দলের জন্যই সহজ নয়।
