ফরমালিনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা হলেও বন্ধ হচ্ছে না এর ব্যবহার। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে খাদ্য পরীক্ষার পর বলছে ফরমালিন নেই। কিন্তু পরে সেখানেও পাওয়া যাচ্ছে ক্ষতিকর মাত্রায় ফরমালিন। এদিকে সমপ্রতি এক গবেষণায় জানা গেছে, যারা খাদ্যে ফরমালিন ব্যবহার করছে, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে। অতি লোভের কারণে তাদের দেহে বাসা বাঁধছে মরণব্যাধি।
এই প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নিলুফার নাহার বলেন, পরীক্ষার পর কোন কোন সংস্থা দাবি করেছে সেখানে ফরমালিন পাওয়া যায়নি। মোবাইল কোর্টও যে প্রক্রিয়ায় ফরমালিন পরীক্ষা করছে তাতে ফরমালিন ধরা পড়ার কথা নয়। অথচ আমরা জানি এ দেশে খাদ্যে কি ভয়ংকর মাত্রায় ফরমালিনের ব্যবহার হচ্ছে। যেই প্রক্রিয়ায় তারা পরীক্ষা করেছেন, সেই প্রক্রিয়া ফরমালিন ধরা পড়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ ফরমালিন পরীক্ষা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তিন থেকে পাঁচ দিন লাগে। এর পরই বোঝা যায় খাদ্যে ফরমালিন আছে কি নেই। তাত্ক্ষণিক পরীক্ষার ফলে যা পাওয়া যায় না। তবে পুরোপুরি নিশ্চিত পরীক্ষার যন্ত্রপাতি খুব দামী।
নিরাপদ খাদ্য অধ্যাদেশ প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও আন্তর্জাতিক রসায়নবিদ ড. নিলুফার বলেন, দুধে ফরমালিন তাত্ক্ষণিক পরীক্ষায় শনাক্ত করা কঠিন। কারণ দুধে প্রোটিন রয়েছে। দুধে ফরমালিন মেশানের পর পানি, ছানা ও এসিড এই তিনভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। তিন থেকে পাঁচ দিনের পরীক্ষায় দুধে ফরমালিন শনাক্তসম্ভব।
দুধে ফরমালিন মেশানো হলে সেই দুধে মাছি বা অন্যান্য পোকামাকড় আসবে না। তিনি বলেন, যারা ফলমূল, খাদ্যে ফরমালিন মেশায় শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে তাদের দেহে ঢুকে যায় ফরমালিন। কমতে থাকে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে বিকল হয়ে পড়ে।
তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও) ও আমেরিকার ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) গাইডলাইনে উল্লেখ আছে খাদ্যে ফরমালিন রয়েছে। ফল, মাছ, দুধ ও তরিতরকারিসহ খাদ্য সামগ্রীতে ফরমালিন মেশানের সময় উড়ে যায়। সামান্য পরিমাণে ওই সব খাদ্য সামগ্রীতে তা থাকে। এ সামান্য পরিমাণ ফরমালিন জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি। দ্রুত মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। আর মাত্রাতিরিক্ত দেহে প্রবেশ করলে কী হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না বলে তিনি জানান। তার মতে, পরীক্ষা পদ্ধতি সকল পরীক্ষাগারে একই নিয়মে হওয়া উচিত। তাহলে ফরমালিন পরীক্ষা নিয়ে কোন ধরনের প্রশ্ন বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকবে না বলে তিনি জানান।
বিগত ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে সাড়ে ৭শ’ টন ফরমালিন আমদানি করা হয় বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সূত্রে জানা যায়। সদ্য সমাপ্ত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ফরমালিন আমদানির পরিমাণ অনেক বেশি। যার বেশিরভাগ ব্যবহার হয়েছে ফল, দুধ, মাছ তরিতরকারিসহ উত্পাদিত খাদ্য সামগ্রীতে। উক্ত প্রশাসনের তদন্তে তা জানা গেছে। নিরাপদ খাদ্য অধ্যাদেশ প্রণয়ন কমিটির কয়েকজন সদস্য বলেন, বাজারজাতকৃত ফরমালিন দ্রুত জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার্থে জব্দ করা উচিত। এ সকল ফরামালিন ছদ্ম নামে আমদানি করা হয়েছে, যা বেআইনি। ইতিমধ্যে ছদ্মনামে আমদানিকৃত ১৪টি কেমিক্যাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। এর মধ্যে ১৩টিই ছিল ফরমালিন। এতে সহজে প্রমাণিত হয় যে, ছদ্মনামে ব্যাপকহারে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা ফরমালিন আমদানি করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ সতর্ক করে বলেছে, ফরমালিন যেমন জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তেমনি পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য বড় ধরনের হুমকি। জব্দকৃত ফরমালিন অতিরিক্ত পানি মিশিয়ে পাতলা করে এর কার্যকারিতা নষ্ট করতে হবে। তাহলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য হুমকি থেকে রক্ষা পাবে।
