ম্যারাডোনা সবার প্রিয় খেলোয়াড়

আপডেট : ০১ জুলাই ২০১৪, ২০:০১
আর্জেন্টিনা দেশটির সব মানুষই ফুটবল পাগল। দেশটির সব শিশুরাই স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে ফুটবলার হবে। কিন্তু সব স্বপ্নই তো আর বাস্তবে পরিণত হয় না। অথচ এই দরিদ্র দেশটির এক বস্তি থেকেই একটি শিশু ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করেছেন। কেবল ফুটবলারই নন, বিশ্বের সেরা ফুটবলারদেরই একজন হয়েছেন তিনি। দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে যেভাবে তিনি বিশ্বের সেরা ফুটবলার হয়েছেন, তা রীতিমতো সিনেমার কাহিনীকেও হার মানায়। তিনি আর কেউ নন—দিয়েগো ম্যারাডোনা, আর্জেন্টিনার মানুষ যাকে ফুটবল ঈশ্বর বলতেই ভালোবাসেন। ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনায় এতই ভালোবাসা পেয়েছেন যে দেশটির ফুটবল সংস্থা তার ১০ নম্বর জার্সিকে চিরতরে তুলে রাখারই প্রস্তাব করেছিল। ফিফার নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই প্রস্তাব অবশ্য বাস্তবে রূপ লাভ করেননি। তবে ম্যারাডোনার সম্মানে ১০ নম্বর জার্সি তুলে রাখার প্রস্তাবনাই জানিয়ে দেয়, আর্জেন্টিনার মানুষ ম্যারাডোনাকে কতটা ভালোবাসেন। ফুটবলের ইতিহাসে তার মতো খেলোয়াড় আর কখনও আসবেন কি না, সেটি নিয়ে সন্দিহান ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। অথচ এত বড় একজন ফুটবলারের ছেলেবেলাটি খুব কঠিন ছিল। বস্তির দরিদ্র জীবনের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করে উঠে আসতে হয়েছে ম্যারাডোনাকে। দিয়েগো ম্যারাডোনার জন্ম ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর বুয়েন্স আয়ার্স প্রদেশের লানুস শহরের পলিক্লিনিকো এভিটা হাসপাতালে। তবে তিনি বেড়ে ওঠেন ভিয়া ফিওরিতোর একটি বস্তিতে। তার বাবার নাম দিয়েগো চিতোরো ম্যারাডোনা এবং মায়ের নাম দালমা সালভাদোরা ফ্র্যাংকো ডোনা টোটা। বাবা এবং মায়ের নামের সাথে মিলিয়ে ম্যারাডোনার নাম রাখা হয় দিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা ফ্র্যাংকো। তবে দিয়েগো ম্যারাডোনা নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। ম্যারাডোনার পরিবার ছিল বলতে গেলে হতদরিদ্র। তার বাবা ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রী। তিনি কারখানাতেও শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। ম্যারাডোনার মাকে অবশ্য সন্তানদের সামলাতেই ব্যস্ত থাকতে হতো। ভাই-বোন মিলিয়ে ম্যারাডোনারা ছিলেন আটজন। তার ছিল পাঁচ বোন আর দুই ভাই। প্রথম তিন বোনের পর জন্ম ম্যারাডোনার। এত বড় একটি পরিবার সামলাতে সবসময়ই হিমশিম খেয়ে উঠতেন ম্যারাডোনার বাবা। এমন একটি গরীব পরিবারে জন্ম নিয়েও আর্জেন্টিনার আর দশটা ছেলের মতো ম্যারাডোনাও বড় হয়ে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু শুধু স্বপ্ন দেখে কী আর হয়! তার যে ফুটবল কেনার টাকাই ছিল না। তার বাবা তাকে কখনই ফুটবল কিনে দিতে পারেননি। তবে ম্যারাডোনার বয়স যখন তিন বছর, তখন তার এক দুঃসম্পর্কের ভাই ম্যারাডোনার জন্মদিনে ফুটবল উপহার দেন। ফুটবলটি পেয়ে ম্যারাডোনা এতই উচ্ছ্বসিত ছিলেন যে রাতে ফুটবলটিকে সাথে নিয়েই ঘুমাতে যেতেন তিনি। ওই একটি ফুটবলই যেন বদলে দেয় ম্যারাডোনার জীবন। সারাক্ষণই ফুটবলটি নিয়ে সময় কাটাতেন তিনি। ফুটবল খেলার শুরুটাও তখন থেকেই। বস্তিতে সমবয়সী সবার সাথে খেলতে খেলতেই ফুটবলে হাতেখড়ি তার। তার বয়স নয় বছর হতে না হতেই ফুটবল নিয়ে তার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ করেছেন আশেপাশের মানুষকে। কিন্তু দেশটি আর্জেন্টিনা বলে কথা। যে দেশে অনেক বড় বড় ফুটবলার রয়েছেন, সেখানে বস্তির ছোট্ট একটি ছেলের পায়ে ফুটবলের এমন কারুকাজ আর নতুন কী! কিন্তু না, ম্যারাডোনা জন্মেছেনই ইতিহাস গড়ার জন্য। আর তাই তিনি ফুটবলকেই ধ্যান-জ্ঞান করেছেন। যতক্ষণ সময় তিনি পেয়েছেন, ততটা সময়ই তিনি ফুটবল নিয়েই পড়ে থেকেছেন। ফুটবলের প্রতি তার এই অদম্য নেশা ফুটবলের প্রতি তার নিয়ন্ত্রণকে আক্ষরিক অর্থেই অতিপ্রাকৃতিক করে তোলে। জাদুকরী ড্রিবলিং, বল পায়ে রেখে দীর্ঘ সময় পার করে দেওয়া, বলের দখল না ছাড়া—এসব বিষয় ধীরে ধীরে রপ্ত হতে থাকে তার। এগুলোই এক সময় তাকে বিশ্বের সেরা একজন ফুটবলার হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। নয় বছর বয়সের সময়েই ম্যারাডোনা স্থানীয় একটি ক্লাবে খেলা শুরু করেন। এস্ত্রেয়া রোজার নামের এই ক্লাবে খেলেই বেশ পরিচিতি পান আশেপাশের মানুষের কাছে। এসময় একজন স্কাউটের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হন ম্যারাডোনা। তার মাধ্যমেই ম্যারাডোনার সন্ধান পান লস সেবোইতাস ক্লাবের কোচ ফ্রান্সিস কর্নেহো। আর্জেন্টিনার তখন অন্যতম বড় একটি ক্লাব ছিল আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স। সেই ক্লাবেরই যুবদলের নাম ছিল লস সেবোইতাস, যা লিটল ওনিয়ন নামেও পরিচিত ছিল। সে যাই হোক, ম্যারাডোনাকে ফ্রান্সিস কর্নেহো নিয়ে আসেন লিটল ওনিয়ন ক্লাবে। তখন ম্যারাডোনার বয়স ১০ বছর। ক্লাবে এসে অবশ্য শুরুর দিকে খেলার সুযোগ তেমন একটা পাননি ম্যারাডোনা। বরং ফুটবল নিয়ে তার পায়ের যে কারিকুরি, তাই বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। ম্যারাডোনাও সেই সুযোগটি নিতে ভুলেননি। বল বয় হিসেবেই মূলত তখন তাকে কাজ করতে হতো। খেলার বিরতির সময় তিনি দর্শকদের সামনে ফুটবলের প্রতি তার অসামান্য নিয়ন্ত্রণ দেখিয়ে মুগ্ধ করতেন। এরপর দলে সুযোগ পেয়ে খেলা দিয়েই মুগ্ধ করেছেন সবাইকে। ম্যারাডোনা যতদিন লিটল ওনিয়ন ক্লাবে খেলেছেন, তার মধ্যে ক্লাবটি টানা ১৪০ ম্যাচ জেতার এক দুর্লভ রেকর্ড করে ফেলেছে। বলাই বাহুল্য, ক্লাবের এই টানা সাফল্যের মূলে ছিল ম্যারাডোনার কৃতিত্ব। ১৯৭২ সালে তার নেতৃত্বেই ক্লাবটি জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নেয়। টানা ভালো খেলার সাফল্যের স্বীকৃতিও মিলতে থাকে ম্যারাডোনার। ওই বছরে দলকে চ্যাম্পিয়ন করে তোলার সুবাদে ক্লাব তার গায়ে তুলে দেয় একজন ফুটবলারের চির আরাধ্য ১০ নম্বর জার্সিটি। প্রতিটি দলের সেরা খেলোয়াড়টিই ১০ নম্বর জার্সি গায়ে চড়ানোর সুযোগ পেয়ে থাকে। ওই বছরেই প্রথম ১০ নম্বর জার্সি গায়ে ওঠে ম্যারাডোনার। তারপর তো কেবল সামনেই এগিয়ে যাওয়ার পালা। ম্যারাডোনার বয়স যখন মাত্র ১৬, তখনই তিনি সুযোগ পেয়ে যান আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স ক্লাবের মূল দলে খেলার। ১৯৭৬ সালের ২০ অক্টোবর, ম্যারাডোনার ষষ্ঠদশ জন্মদিনের মাত্র ১০ দিন আগে আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স ক্লাবের মূল দলে অভিষেক হয় তার। দলের প্রথম সিজন শেষ হওয়ার আগেই তখন আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠতে থাকে ম্যারাডোনার দল নামে। একের পর এক ম্যাচ জেতাতে থাকেন ম্যারাডোনা। আর তার খেলা দেখার জন্যই দর্শকদের সমাগম ক্রমেই বাড়তে থাকে। আর্জেন্টিনার ফুটবলের ভবিষ্যত্ ভরসা হিসেবেও তার নাম উচ্চারিত হতে থাকে সকলের মুখে মুখে। তবে এমন দারুণ খেলেও ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ দলে জায়গা হয়নি ম্যারাডোনার। কম বয়সের কারণ দেখিয়ে তত্কালীন কোট সিজর মেনত্তি তাকে অন্তর্ভুক্ত করেননি। পরের বিশ্বকাপে (১৯৮২) দলে ঠাঁই পেলেও সকলের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি তিনি। বয়স মাত্র ২২ হলেও তিনি মাঠে থাকলেই যে তাকে ঘিরে প্রতিপক্ষের আতংক তৈরি হয়, সেটা ওই বিশ্বকাপেই প্রমাণ পেয়েছে বিশ্ব। আর এর পরের বিশ্বকাপ (১৯৮৬) তো আর্জেন্টিনার স্মরণীয় ইতিহাসের অংশ। ম্যারাডোনার ফুটবল জীবনে হাজারও প্রাপ্তির মধ্যেই এই বিশ্বকাপ জিতে নেওয়াটাই মুকুটে পালকের মতো। বিশেষ করে এই বিশ্বকাপেই তার ‘হ্যান্ড অব গড’ নামক গোলের কথা স্মরণ রাখবে ফুটবল ভক্তরা। আর ইংল্যান্ড দলের পাঁচ-পাঁচজন রক্ষণভাগের খেলোয়াড় ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে একক প্রচেষ্টায় তার দেওয়া গোলটি তো বিশ্বের ইতিহাসেরই সেরা গোল বলে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে। তার অর্জনের পাল্লা এতটাই ভারি যে, আর্জেন্টিনার মানুষ তাকে বিনা দ্বিধাতেই ফুটবল ঈশ্বর বলে মনে করে আসছে। জীবন্ত এই কিংবদন্তী এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ফুটবলারদের অসামান্য অনুপ্রেরণা।