যতই সময় গড়াচ্ছে নতুন নতুন রূপে যেন বিকশিত হচ্ছে বিশ্বকাপ। বরাবরের মতোই কিছু দলকে কাদাচ্ছে, কেউ বা আবার প্রাপ্তির আনন্দে আত্মহারা হচ্ছে। তবে প্রথাগত এসব কিছুর বাইরে যে জিনিসটা সবার নজর কাড়ছে, সেটা হচ্ছে পরাশক্তিদের তুলনামূলক দুর্বল দলগুলোর কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়া। এটা কিছুটা অবাক করার মতো হলেও আমার কাছে এ ব্যাপারটা মোটেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। যদি শেষ আটের লড়াইয়েও কলম্বিয়া, কোস্টারিকা কিংবা বেলজিয়াম-আমেরিকার মতো দলগুলো তাদের প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলে মোটেই চমকাবো না আমি।
লিওনেল মেসি, নেইমার, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো তারকাদের খেলা দেখে আমরা অনেক সময়ই ভুলে যাই ফুটবল একটা দলীয় খেলা। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে তারা কখনো কখনো পুরো দলকে এতটাই ছাপিয়ে যান, দর্শক ভুলেই যায় দলের বাকি সবার কথা; কিন্তু, বিশ্বকাপের চলতি আসরটা প্রমাণ করেছে- টিম গেম বা দলীয় সমঝোতার কোন বিকল্প নেই। কলম্বিয়া-কোস্টারিকার মতো দলের এতটা দাপট দেখানোর কারণ কিন্তু সেই দলীয় ঐক্যই।
ফলে, নেইমার-মেসিদের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য যতটা আলোচনায় আসছে, সমান আলোচনা হচ্ছে তুলনামূলক ছোট দলগুলোর পারফরম্যান্স নিয়েও। ফলে তারা আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল-জার্মানি-নেদারল্যান্ডসের মতো দলগুলোকে বাড়তি ঘাম ঝরাতে বাধ্য করছে। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, এই দলগুলোর এমন সাফল্যের কারণ কি? এর উত্তরে আমি কয়েকটি বিষয় বলবো। প্রথমত, প্রস্তুতির সময়। আপনি যদি ইউরোপীয় কিংবা লাতিন পরাশক্তিগুলোর দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন তাদের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ক্লাবগুলোয় খেলেন। ফলে লম্বা একটা ঘরোয়া মৌসুম কাটানোর পর, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা ইউরোপা লিগের মতো মহাদেশীয় ক্লাব টুর্নামেন্টেও খেলতে হয় তাদের। খুব বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ায়, এই টুর্নামেন্টগুলো হয় খুব বেশি শক্তিক্ষয়ী।
এই ক্লান্তিকর মৌসুম শেষে জাতীয় দলের ফরম্যাটের সাথে মানিয়ে নিতে খুব কম সময়ই পেয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো-জাভি হার্নান্দেজরা।
২৪ মে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল খেলা রোনালদো জাতীয় দলে যোগ দিয়েছেন ঠিক দুইদিন পরে। তাহলে পর্তুগাল কোচ পাওলো বেন্তোর কৌশলের সাথে মানিয়ে নিতে সময়টা কোথায় পেলেন রোনালদো? একই কথা প্রযোজ্য ইকার ক্যাসিয়াস, সার্জিও রামোস, ডেভিড ভিয়াদের ক্ষেত্রেও। সে তুলনায় কোস্টারিকা, কলম্বিয়ার, আলজেরিয়ার মতো দলগুলো নিজেদের গুছিয়ে নেয়ার অনেক সময় পেয়েছে। তার প্রমাণও পাওয়া গেছে হাতেনাতেই।
এরপরে আসছে ব্রাজিলের আবহাওয়ার বিষয়টি। আফ্রিকান-লাতিন আর ইউরোপীয় দেশগুলোর শক্তির পার্থক্য আরো ঘুচিয়ে দিয়েছে ব্রাজিলের আবহাওয়া। আমরা বরাবরই জার্মানির মতো ইউরোপীয় দেশুগুলোকে তাদের ফিটনেসের জন্য অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে রাখি; কিন্তু লাতিন কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে নিতে সেই জার্মানদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে জার্মান-ফ্রান্সদের সাথে সমানে সমানে লড়াই উপহার দিয়েছে আফ্রিকান প্রতিপক্ষরা।
গত সোমবার রাতের জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখিতা নিশ্চিত হয়ে গেছে জার্মানি ও ফ্রান্সের। চার জুন প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে এই দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। নক আউট লড়াই বলে কোন দলই সেই ম্যাচে খুব বেশি ঝুঁকি নিতে চাইবে বলে আমার মনে হয় না। পাল্টা আক্রমণ নির্ভর খেলা খেলবে তারা। দুই দলের প্রথাগত খেলার ধরনটাও অবশ্য সেরকম।
ইতিহাস, ঐতিহ্য বিচারে হয়তো জার্মানি কিছুটা এগিয়ে থাকবে, তবে করিম বেনজামা যদি নিজের সেরা ফর্মে থাকেন তাহলে ফলাফল পাল্টে যাওয়া মোটেই অসম্ভব নয়। আমি নির্দিষ্ট করে বেনজামার নামোল্লেখ করলাম, কারণ এই টুর্নামেন্টে তার খেলা মোহাচ্ছন্ন করে ফেলেছে আমাকে। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে বেনজামার পারফরম্যান্স কখনোই এমন মনে হয়নি আমার। দলের সেরা তারকা ফ্রাঙ্ক রিবেরির অনুপস্থিতিতে প্রকৃত নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে সে। যদি, গোল না পায় দলের প্রতিটি আক্রমণ রচনায় ভূমিকা রাখছে সে। মাঠের খেলাতেই বোঝা যাচ্ছে ফ্রান্স দলটি খেলছে তাকে কেন্দ্র করেই।
এদিকে, ঐ রাতের দ্বিতীয় কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ব্রাজিলের মুখোমুখি হচ্ছে জেমস রড্রিগুয়েজের দল কলম্বিয়া। যদিও ব্রাজিল সেই ম্যাচে ফেভারিট থাকবে, তবে কলম্বিয়ারও সমান সুযোগ থাকবে। কারণ, অন্যকোন দলের বিরুদ্ধে চেনা আবহাওয়ার যে সুযোগটা ব্রাজিল নিত, কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সেটা খাটবে না। তাছাড়া, দুই দল বহু বছর ধরে পরস্পরের সঙ্গে খেলে আসছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে রড্রিগুয়েজের ফর্ম। মাঠের যে কোন জায়গা থেকে গোল করার ক্ষমতা আছে এই মোনাকো স্ট্রাইকারের। সুতরাং, ব্রাজিলকে হারানোর বড় সুযোগ এখন কলম্বিয়ার সামনে।
