মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ড ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস) হলো প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার সেবার একটি অংশ হিসেবে গড়ে তোলা কোর্স। ১৯৭৬ সালে সরকার প্রথম মধ্যমমানের চিকিত্সক তৈরির উদ্দেশ্যে ৩ বছর মেয়াদি এই ডিপ্লোমা কোর্স চালু করে। স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি থেকে ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত চিকিত্সকগণ বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল কর্তৃক রেজিস্ট্রেশন/লাইসেন্সপ্রাপ্ত মধ্যমমানের চিকিত্সক। দেশের গ্রাম পর্যায়ের মানুষের কাছে উন্নত স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার জন্যই মূলত এই চিকিত্সা শ্রেণী তৈরি হয়। ১৯৭৬ সালে কোর্স চালুর পর ১৯৭৯ সাল থেকে গ্রাম/ইউনিয়ন এবং উপজেলা পর্যায়ে নিয়োগপ্রাপ্ত মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টরা স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করে আসছে।
যেকোনো স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যার কারণে বহু উচ্চ ডিগ্রিপ্রাপ্ত ডাক্তার রয়েছেন যারা বেশিরভাগই শহরে থাকেন। ফলে গ্রামের মানুষ তাদের স্বাস্থ্য সমস্যায় প্রাথমিক যে ডাক্তারদের সহযোগিতা পায় তারা হলেন এই বিশেষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত ডিপ্লোমা ডাক্তার।
মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং কোর্স সম্পন্নকারীদের সরকার ডিপ্লোমা অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (ডিএমএফ) ডিগ্রি প্রদান করে থাকে। সরকারি পর্যায়ে ম্যাটস কোর্স করার জন্য প্রথমে ৮টি প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়। পরবর্তী কালে এই সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয় ১৮টি। বর্তমানে অবশ্য ৮টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে। তবে সরকারি পর্যায়ে এত অল্প প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয়সংখ্যক মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট তৈরি করা সম্ভব নয় বিবেচনা করেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও এই কোর্স চালুর সুযোগ করে দিয়েছে সরকার।
ম্যাটস-এর কর্মক্ষেত্র
২০০৯ সালে শুধুমাত্র সরকারি পদ খালি ছিল ৯ হাজারের বেশি। ম্যাটস কোর্স সম্পন্নকারীকে ডিএমএফ সার্টিফিকেট প্রদান করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিত্সা অনুষদ। এই ডিগ্রিপ্রাপ্তদের বলা হয়ে থাকে সহকারী ডাক্তার। ডিএমএফ ডিগ্রিপ্রাপ্তরা বহুভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপ-কেন্দ্রে, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে, স্কুল হেলথ ক্লিনিক, বিভিন্ন আধাসরকারী/কর্পোরেশন যেমন—তিতাস গ্যাস, বিআইডব্লিউটিসি, বিজি প্রেস, বাংলাদেশ বিমান ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠানে যেমন—ব্র্যাক, গণস্বাস্থ্য, কেয়ার, গণসাহায্য সংস্থা, আইসিডিডিআরবি, সেভ দ্য চিলড্রেন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানেও কাজ করার সুযোগ রয়েছে এসব ডিগ্রিধারীদের। এ ছাড়াও দেশি-বিদেশি নানা প্রতিষ্ঠানে এদের কাজের সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে। ২০০৯ সালে বিপুলসংখ্যক পদ খালি থাকলেও বারবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও তা পূরণ করা যায়নি। এ কারণেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই কোর্স করে আরও বেশি জনবল তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করে সরকার। আবার চাকরি না করলেও একজন ডিএমএফ ডাক্তার প্রাইভেট প্র্যাকটিশনার হিসেবে যেকোনো স্থানে প্র্যাকটিস করে উপার্জন করতে পারে। সরকারি চাকরিতে ডিএমএফদের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ড কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার বা উপ-সহকারী চিকিত্সা কর্মকর্তা অথবা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে এবং বেসরকারি ক্ষেত্রে নানাবিধ পদে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। অর্থাত্ এই কোর্স করলে চাকরির সাথে সাথে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগও রয়েছে।ত্
ম্যাটস/ডিএমএফদের পরিসংখ্যান
২০০৯ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৫ হাজার সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল। সরকারি প্রতিষ্ঠানে ২০১২-১৩ সেশনে ৭১৬ জন পাশ করে বের হওয়ার কথা। অথচ এর চেয়ে অনেক বেশি সহকারী ডাক্তারের প্রয়োজন রয়েছে দেশে। কাজেই ম্যাটস বা ডিএমএফ ডিগ্রি অর্জন করলে চাকরির সুযোগ অনেকটাই অবারিত—এ কথা বলাই যায়। আবার যারা ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন কিন্তু মেডিকেল কলেজগুলোতে এমবিবিএস কোর্সে চান্স পাননি, তারাও সহকারী ডাক্তার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন ম্যাটস বা ডিএমএফ ডিগ্রি নিয়ে।
সার্টিফিকেট প্রদান ও স্বীকৃতি
ম্যাটস চার (৪) বছর মেয়াদি একটি শিক্ষাক্রম। চূড়ান্তভাবে কোর্স সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিত্সা অনুষদ সার্টিফিকেট প্রদান করে থাকে। সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থীকেই সমমানের ডিএমএফ ডিগ্রি প্রদান করা হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) রেজিস্ট্রেশন
চিকিত্সা শিক্ষা ক্ষেত্রে এমবিবিএস ডিগ্রি সবচেয়ে বেশি পরিচিত। কোনো মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি গ্রহণ করা থাকলেও সরাসরি ডাক্তার হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু করা যায় না। ডাক্তার হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু করতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) থেকে নিবন্ধন নিতে হয়। এই নিবন্ধন পেলে তবেই ডাক্তার হিসেবে কাজ শুরু করা যায়। ম্যাটস কোর্স শেষ করলেও বিএমডিসি থেকে রেজিস্ট্রেশন প্রদান করা হয়। ফলে ম্যাটস থেকে কোর্স শেষ করেও বিএমডিসি নিবন্ধন নিয়ে সহকারী ডাক্তার হিসেবে কাজ শুরু করা যায়।
ইন্টার্নশিপের সুযোগ
চিকিত্সা পেশায় তত্ত্বীয় শিক্ষার গুরুত্ব যতটা বেশি, তার চেয়ে হাতে-কলমে শিক্ষার গুরুত্ব অনেক বেশি। এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের অংশ হিসেবেও তাই বিভিন্ন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হয়। এটি ম্যাটসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ম্যাটসের চতুর্থ বর্ষে বিভিন্ন হাসপাতালে হাতে-কলমে রোগী পর্যবেক্ষণ, রোগ নির্ণয়, চিকিত্সা প্রদানসহ রোগীর অন্যান্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ের উপর সরাসরি শিক্ষা দেওয়ার ব্যাবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতাল এবং থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে এই ইন্টার্নি করার সুযোগ রয়েছে।
