কুরআন-হাদীসে রোজার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৪, ২০:০৭
মহান আল্লাহর রহস্যময় সৃষ্টি মানুষ একদিকে সে যেমন পাশবিকতার কঠিন নিগড়ে আবদ্ধ,অন্য দিকে সে আল্ল¬াহর গুণাবলীর নিখুঁত প্রতিবিম্ব। তবে মানবসত্তা দেহ ও আত্মার সমন্বিত রূপ। তার আত্মা বা রুহের সম্পর্ক আন্তহীন উর্ধ্বলোকের সাথে তাই সে তাকে সে দিকে ধাবিত করে। তাকে সতর্ক করে তার সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার স্কন্ধে আরপিত খেলাফতে দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে। সে তাকে উদ্বুদ্ধ করে আন্তহীন উর্ধ্বলোকের ব্যপ্তি ও ব্যাপকতার বিচরণ করতে। এ কারণে মানুষের রূহ বা আত্মা তাকে পানাহার ও ভোগ সম্ভোগ করা যাবতীয় জৈবিক চাহিদার বন্ধনমুক্ত হয়ে আর্থিক খোরাক সংগ্রহের জন্য ব্যাকুল ও উনু্মখ করে তলে, পক্ষান্তরে যখন তার ওপর রূহের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যায় এবং দেহ তার কর্তৃত্বের অধিকারী হয় তখন সে রিপুর তাড়নায় ভোগ সম্ভোগ, অবাধ উচ্ছৃঙ্খলতা ও পাশবিক সর্বনাশা স্রোতে তৃণখন্ডের ন্যায় ভেসে যায়। সকল নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে সে তখন নিমজ্জিত হয় পার্শ্ব পঙ্কিলতার অতলান্তে, ভোগ-সম্ভোগের নেশায় সে তখন ছুটে চলে লাগামহীনভাবে। অপমৃত্যু ঘটে তার মনুষ্যত্বের। তার সকল সুকুমার বৃত্তির। তখন তার এক মাত্র লক্ষ্য হয় সকল পাশবিক ও জৈবিক চাহিদা চরিতার্থ করা। সে তখন পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের সূরা মুহাম্মাদ এর ১২ ং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, “আর যারা অবিশ্বাসী (কাফের) তারা ভোগ - সভোগে নিমগ্ন থাকে । এবং জন্তু- জানোয়ারের ন্যায় উদর পুর্তি করে তাদের নিবাস জাহান্নাম” বস্তু মানুষকে পাশবিক পষ্কিল থেকে উদ্ধার করে তার দেহ-আত্মা, মন-মস্তিষ্ক,অনুভব অনুভূতি ভাব ও ভাবনাকে পার্শ্ব আবিলতা ও পষ্কিলতামুক্ত করার জন্যই ইসলামে সিয়ামের বিধান। মানুষের রিপু ও কুপ্রবৃত্তির তাড়নাকে সংযত ও নিয়ন্ত্রিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ফলপ্রসূ বিধান। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সে লাভ করে আধ্যাত্মিক সজীবতা-আত্মিক দৃঢ়তা তার মাঝে সৃষ্টি হয় কল্যাণকর্মের স্পৃহা ও সম্পর্ক সখ্যতা। সিয়াম প্রতিবছর ঘুরে আসে দেহ মনের পঙ্কিলতা থেকে ধুয়ে মুছে পরিস্কার করতে। শুধু বর্তমান মুসলিম মিল্লাতের জন্য রোজার নিয়ম নয় পূর্বের নবীদের যুগেও ছিল। রোজার, ইতিহাস সম্পর্কে কোরআন হাদিসের বর্ণনায় পরিস্কার / স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। মূলত রোজা শব্দটি ফার্সী। এর আরবী শব্দ হলো ‘সাওম’ । সাওম শব্দের আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। শরীয়তের পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ত সহকারে পানাহার এবং স্ত্রী সহবাস হতে বিরত থাকাকে সাওম বা রোজা বলা হয় (ফাতওয়ায়ে আলমগীরি)। বস্তুত রোজা রাখার বিধান সর্বযুগে ছিল। হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (স.) পর্যন্ত সকল নবী ও রসূলের যুগে রোজার বিধান ছিল। এই দিকে ইংগিত করেই আল-কোরআনে সূরা বাকারা ১৮৩ নং আয়াতে বলেন, হে মুমিনগন ! তোমাদের জন্য সিয়াম বিধান দেওয়া হল যেমন:বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকেও দেওয়া হয়েছিল। যাতে তোমরা তাকওয়া হাসিল করতে পার। এ আয়াতের ব্যাখ্যা আল্লামা আলূমী (রহ.) স্বীয় তাকসীর গ্রন্থ ‘রুহুল মাআনীতে উলে¬খ করেছেন,যে এখানে “মিন কাবলিকুম ” শব্দ দ্বারা হযরত আদম (আ.) হতে শুরু করে হযরত ঈসা (আ.) এর যুগ পর্যন্ত সকল যুগের মানুষকে বুঝানে হয়েছে। এতে একথা প্রতিয়মান হচ্ছে যে , রোজা কেবল আমাদের উপর ফরজ করা হয়নি বরং আদম (আ.) এর যুগ হতে চলে আসছে। তবে শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহ.) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন ঃ রোজার হুকুম হযরত আদম (আ.) এর যুগ হতে বর্তমানকাল পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে চলে এসেছে ” (ফাওয়াইদে উসমানী)। হযরত আদম (আ.) এর যুগে রোজার ধরণ কেমন ছিল তার কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায়না। তবে আল্ল¬ামা ইমামুদ্দীন ইবনে কামর (রহ.) বলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখার বিধান ছিল। হযরত মুয়াজ মাসউদ ইবনে আব্বাস আতা,কাতাদা এবং যাহহাক (রহ.) এরমতে মাসে তিনদিন রোজা রাখার বিধান হযরত নূহ (আ.) এর যুগ হতে শুরু করে শেষ নবী মুহাম্মাদ (স.) এর যামানা পর্যন্ত বলবত্ ছিল। তবে আল্লাহ তায়ালা রমজানের রোজা ফরজ হলে ঐ বিধান রহিত হয়ে যায়। তাফসীরে রুহুল মা আনীতে উলে¬খ আছে যে “কামা কুতিবা আলাল্লাাজিনা মিন কাবলিকুম”অর্থঃ যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদের দেওয়া হয়েছিল। তাই বলা হয় যে, কিতাবীদের পূর্ববর্তীদেরকে রোজা ফরজ ছিল। তা তারা বর্জন করে তবে তারা ঐ একদিন উপবাস ব্রত পালন করত যে দিন ফিরাউন নিলনদে নিমজ্জিত হয়ে ছিল। এবং পরবর্তীতে তারা এর আগে পিছে আরো একদিন করে সংযোজন করে তিনদিন করে এভাবে এভাবে বাড়াতে থাকায় ৫০ দিন পর্যন্ত রোজা রাখত। গরমের দিনে রোজা রাখা কষ্ট সাধ্য হওয়ায় তারা সময় পরিবর্তন করে থাকত। তবে রসূলুল্ল¬াহ (স.) এরশাদ করেনঃ খৃষ্টান সমপ্রদায়ের ওপর রোজা রাখা ফরজ করা হয়েছিল। (সংক্ষেপিত)