প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই দেশ আমাদের। আমরাই স্বাধীনতা এনেছি, স্বাধীনতা থাকবে। দেশ চলবে সংবিধান অনুযায়ী। আমরা চাই দেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক। মানুষের ভাগ্য নিয়ে অনেক খেলা হয়েছে, আর যেন না হয়। জনগণ আমাদের ওপর যে আস্থা রেখেছে, তা যেন রক্ষা করতে পারি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগই উন্নয়ন দিতে পেরেছে, ভবিষ্যতেও পারবে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে। আন্দোলনের নামে বোমা মেরে ও পুড়িয়ে মানুষ হত্যার ঘটনা আমরা আর দেখতে চাই না। গতকাল বৃহস্পতিবার দশম জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) সমাপনী বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর এরশাদ সবার আগে আমাকে গ্রেফতার করেছিলেন। বহুবার আমাকে গৃহবন্দী করা হয়। এমনকি তত্কালীন সময়ে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের একটি জনসভায় গুলি চালিয়ে আমাকে হত্যারও চেষ্টা করা হয়েছিল। সামনে বিরোধী দলের আসনে বসে থাকা সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, জিয়াউর রহমান যে কায়দায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন, এরশাদও তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন। জিয়া যেভাবে বিচারপতি সায়েমকে সরিয়ে নিজে ক্ষমতা দখল করেন, ঠিক একই প্রক্রিয়ায় এরশাদও সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা নিয়ে নেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ মার্শাল ল জারি করেন, আমিই তখন সর্বপ্রথম এর প্রতিবাদ করি। আজ দেশে যে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অস্ত্রের খেলা, মাদক ও কালো টাকার ছড়াছড়ি, ঋণ খেলাপি- এসবই সৃষ্টি করেছিল সামরিক শাসকরা। কারণ তারা যেহেতু নিজেরা অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসেছিল, সে কারণে নিজেদের দল গঠনের জন্য কিছু লোককে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিল। ছাত্রদের হাতেও অস্ত্র তুলে দেয় এই সামরিক শাসকরাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৭৫-এর পর মার্শাল ল জারির মাধ্যমে গণতন্ত্রকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাসহ এসব ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন খন্দকার মোশতাক। জিয়া ছিলেন তার দোসর। এজন্য জিয়াকে সেনাপ্রধান করেছিলেন মোশতাক। কর্নেল ফারুকসহ খুনিরা সাক্ষ্যে বলেছে, জিয়াউর রহমান সবসময়ই তাদের সঙ্গে ছিলেন। ’৭৫ থেকে ’৮১ সাল পর্যন্ত দেশে একটার পর একটা, অন্তত প্রায় ১৯ বার ক্যু হয়েছে। এসব ক্যু করার জন্য শত শত সামরিক অফিসারকে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের মানুষের ওপর এভাবে বারবার আঘাত এসেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ওপর আঘাত এসেছে বহুবার।
অতীত সামরিক শাসকদের ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিচারপতি সাত্তার ছিলেন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে। আমরা সবাই তাকে বললাম অবাধ নির্বাচন করার জন্য। তখন হঠাত্ করে সেনাপ্রধান এরশাদ তার সমর্থিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাত্তারের নাম ঘোষণা করেন। সেনাপ্রধান কীভাবে একজনকে তার প্রার্থী বলতে পারেন! ব্যালট ছিনতাই, ভোট ডাকাতি, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব- কী হয়নি সেই নির্বাচনে!
‘জিয়াউর রহমানকে হত্যার খবর শোনার পর তিনি (শেখ হাসিনা) কেন বোরখা পরে পালিয়েছিলেন’- সম্প্রতি এক সমাবেশে বলা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফেরার পর আমি সিলেটে মাজার জিয়ারত করতে যাই। ফেরার পথে শুনলাম ঢাকায় ক্যু হয়েছে এবং জিয়া খুন হয়েছেন। প্রবল বৃষ্টির কারণে আমাদের গাড়ি আটকে যায়, ঢাকার পথে ট্রেন চলাচলও বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন সেখানেই এক বাড়িতে অবস্থান করে আমি হাতে লিখে বিবৃতি দিই। আওয়ামী লীগের তখনকার নেতা মোস্তফা মহসীন মণ্টুর (বর্তমানে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক) হাতে দেয়া ওই বিবৃতিতে আমি বলেছিলাম, আমরা দেশে শাসনতন্ত্রের ধারাবাহিকতা চাই। এর ব্যত্যয় ঘটুক, চাই না। তখন যেখানে কেউ বিবৃতি দেয়ারও সাহস করেনি, আমি সেখানে দিয়েছিলাম।
এরশাদকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার (এরশাদের) সময়ে জনসভায় যে কর্মকর্তা গুলি করে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন, পরবর্তীতে খালেদা জিয়া তাকে পদোন্নতি দেন। তাদের দু’জনের (খালেদা জিয়া ও এরশাদ) কোথায় যে কী যেন একটা বিষয় আছে, বুঝি না; কখনও রাগ, কখনও অভিমান-এই রহস্যই আজ পর্যন্ত বুঝলাম না। এসময় এরশাদসহ অনেকের মুখেই হাসি ফুটে ওঠে। শেখ হাসিনা বলেন, ’৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সবচেয়ে বেশি অত্যাচার হয় এরশাদ, তার স্ত্রী-পরিবার ও জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীদের ওপর। যেই ভাবি সাহেবানকে উনি এত বাড়ি, গাড়ি, সম্পদ দিলেন, সেই ভাবি সাহেবানই এত অত্যাচার করল! উনি (এরশাদ) এত কবিতা লেখেন, কিন্তু কোনো কবিতা দিয়ে ভাবি সাহেবানের মন রক্ষা করতে পারলেন না। অথচ ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে জাতীয় পার্টির বন্দি নেতাদের আমরাই মুক্তি দিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত মানুষ মেরেছে। ১৬ জন পুলিশ, ২ জন বিজিবি সদস্য, ২ জন আনসার সদস্য, এমনকি ১ জন সেনা সদস্যকেও হত্যা করা হয়েছিল। এসময় তিনি বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলন ও মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের সময় হতাহতের, কোরআন পোড়ানোর অনেকগুলো ছবি দেখান। তিনি বলেন, ছবি কথা বলবে।
বিএনপির পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আন্দোলনের নামে এভাবে মানুষ খুন করে তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই- দেশে যেন আর কখনও নির্বাচন না হয়। দেশ ও গণতন্ত্র যেন ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু তারা সেটি করতে পারেনি। তিনি বলেন, এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মোকাবেলা করে আমরা গণতন্ত্র অব্যাহত রাখতে পেরেছি। ওই অবস্থার মধ্যেও ভোটাররা কেন্দ্রে গেছে, ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। তারা নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। এখন প্রতি মুহূর্তে আন্দোলন করে সরকার হটানোর হুমকি দিচ্ছে। তাদের আন্দোলন মানে তো মানুষ মারা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়া ২৬ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তখন দেশের কোনো উন্নয়ন হয়নি, বরং দেশ পিছিয়েছে, প্রবৃদ্ধি কমেছে। নারায়ণগঞ্জ, ফেনী ও মিরপুরসহ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। সঙ্গে সঙ্গেই আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। কে কোন দলের তা দেখছি না, অপরাধী আমার চোখে অপরাধীই। ভারতীয় পত্রিকা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত খালেদা জিয়ার সাক্ষাত্কারের বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সবকিছুর জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করছে। সত্য কোনটা, সেটা তো দেশের মানুষ জানে। তিনি বিদেশের পত্রিকায় সাক্ষাত্কার দেন, কিন্তু নিজের চেহারা দেখেন না। তার সব অপকর্মের রেকর্ড আছে। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল ও ভুটানসহ সবার সঙ্গে আমরা সুসম্পর্ক চাই। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যই এই সুসম্পর্ক প্রয়োজন।
