যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা আবারো জটিলতায়

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৪, ২২:৩১
যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের অগ্রাধিকার বাণিজ্য সুবিধা বা জিএসপি ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশকিছু অগ্রগতি করলেও বিশেষ মহলের বক্তব্যে তা আবারো জটিলতায় পড়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতির একটি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মার্কিন প্রশাসন এক্ষেত্রে আরো কড়া অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তর ইউএসটিআর গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জিএসপি ফিরে পেতে বাংলাদেশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সংস্থাটির মতে, কারখানায় শ্রমিক হয়রানি এবং সহিংসতা রোধে এখনো তেমন অগ্রগতি হয়নি। এর বাইরে দেশটির ছয়জন কংগ্রেসম্যান শ্রমিক নেতাদের হয়রানি বন্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করে একটি চিঠি লিখেছেন। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের একটি অংশ মনে করেন, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে সমপ্রতি একটি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্র সফর করে জিএসপি ফিরে পাবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সেখানে তাদেরকে ইন্ডাস্ট্রি অল নামক একটি সংগঠনের চিঠি দেখিয়ে বলা হয়, ওই চিঠিতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানার শ্রমমানের বিষয়টি উল্লেখ আছে। দেশে ফিরে এক অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম ইন্ডাস্ট্রি অলকে দেশদ্রোহী বলে আখ্যা দেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র সরকার নড়েচড়ে বসে। পরদিন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিং-এ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র মারি হার্ফ জানান, বিজিএমইএ সভাপতির বক্তব্য জঘন্য এবং অগ্রহণযোগ্য। ইন্ডাস্ট্রি অল বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিক নির্যাতনের বিষয়টি উল্লেখ করে মার্কিন কংগ্রেসের কাছে চিঠি দিয়েছিলো। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সভাপতি বলেছিলেন, যারা এ ধরনের চিঠি দিয়েছে তারা রাষ্ট্রদ্রোহী, তাদের বিচার করা উচিত। তৈরি পোশাক রপ্তানির সাথে সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিজিএমইএ সভাপতির বক্তব্যে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এ ধরনের শ্রমিক সংগঠনগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে থাকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বড় রপ্তানিকারক ইত্তেফাককে বলেছেন, জিএসপি প্রত্যাহারের বিষয়টি অনেক স্পর্শকাতর। এ বিষয়ে বক্তব্য দেয়ার আগে অনেক আগপাশ চিন্তা করার প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু মুখে যা আসে তা বলে দেয়া একেবারেই ঠিক নয়। এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতির কাছে তার বক্তব্য জানতে চাইলেও তাকে টেলিফোনে পাওয়া যায়নি। গতকাল ইউএসটিআর যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে বলা হয়, জিএসপি ফিরে পেতে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া শর্তগুলো পূরণে বেশকিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার জিএসপি ফিরে পেতে তার কর্মপরিকল্পনা উল্লেখযোগ্য হারে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। শ্রমিকদের নিরাপত্তায় আরো বেশি কাজ করতে হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, জিএসপির জন্য সরকার তার কর্মপরিকল্পনা উল্লেখযোগ্য হারে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। সরকার এখনো অনেক সংকটপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণে পিছিয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি মাইকেল ফরম্যান বলেছেন, শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা প্রশ্নে গতবছর জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে ওবামা প্রশাসন। এটি ফিরে পেতে বেধে দেয়া শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গূরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। এরপরও বেশিরভাগ কারখানা এখনো পর্যবেক্ষণে রয়েছে। এসব কারখানায় প্রয়োজনীয় শ্রম আইনের সংস্কারে অগ্রগতির অভাব, শ্রমিকদের হয়রানি ও নিজেদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার শ্রমকিদের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করলেও দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের রপ্তানি দেশটিতে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এর আগেও জিএসপি সুবিধা পেতো না। প্রতিযোগিতামূলক মূল্যেই বাংলাদেশের পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে যেতো। বাংলাদেশের যেসব পণ্য জিএসপি সুবিধা পেতো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সেসব পণ্যের রপ্তানির পরিমাণ এক শতাংশেরও নিচে। ছয় কংগ্রেসম্যানের চিঠি বাংলাদেশ যখন মার্কিন বাজারে জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে চেষ্টা চালাচ্ছে তখন শ্রমিক নেতাদের হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ছয় কংগ্রেসম্যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। কংগ্রেসম্যান জর্জ মিলার, স্যান্ডার এম লেভিন, গ্রেস মেং, এলিয়ট এল এনগেল, জোসেফ ক্রাউলি এবং জেনিস ডি সচোকাওস্কি গত ৩০ জুন উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে এই চিঠিটি লেখেন। সম্প্রতি শ্রমিকদের অধিকার ও ইউনিয়ন করার স্বাধীনতার বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতির করা মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ছয় কংগ্রেসম্যান এই উদ্বেগ জানিয়েছে। চিঠিতে তারা বলেন, জিএসপি কর্ম পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সরকার প্রাথমিকভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করায় আমরা খুশি। শ্রমিকদের কাজের পরিবেশের পাশাপাশি ইউনিয়নের নিবন্ধন সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য আমরা অভিনন্দন জানাই। তবে এখনো আরো কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তারা বলেন, শ্রমিক ইউনিনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নেতাদের ভীতি ও হয়রানির ঘটনা বেড়েছে। এটা মার্কিন কংগ্রেসসহ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, এ ধরনের সহিংসতা ও ভীতি প্রদর্শন সহ্য করা হবে না। চিঠিতে তারা শ্রমবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আহবান জানিয়ে বলেন, এর বিপরীতে সরকার ও শিল্পের কর্মকর্তাদের বক্তব্য যথোপযুক্ত নয়। এ ধরনের বক্তব্যে আমাদের অভিন্ন লক্ষ্যের জন্য অসহযোগিতামূলক বার্তা দেয়। শ্রমিক নেতাদের হুমকি ও হামলার ঘটনায় তদন্তের আহ্বান জানান কংগ্রেসম্যানরা। গত বছর শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের ব্যর্থতার জন্য জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশকে এক নম্বর ব্যান্ড দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে বিশ্বের এক নম্বর ব্রান্ড হিসাবে দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এরই অংশ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি পর্যালোচনা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা। গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে সাক্ষাত্ শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।