দালালদের দৌরাত্ম্যে পাসপোর্ট অফিস

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৪, ২২:৩২
গত রবিবার সকাল সোয়া ১০টা। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনে এদিক-ওদিক ছুটছেন রাবেয়া আক্তার। মিনিট দশেক পর তার দিকে এগিয়ে গেলেন এক ব্যক্তি। জিজ্ঞেস করলেন, পাসপোর্ট অফিসে আসার কারণ। বিস্তারিত শুনে ঐ ব্যক্তি রাবেয়াকে বললেন, এক সপ্তাহের মধ্যে পাসপোর্ট পাওয়া যাবে। তবে এজন্য খরচ করতে হবে ১৫ হাজার টাকা। পরে ১০ হাজার টাকায় রফা হয় তাদের মধ্যে। একই দিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পাসপোর্ট আবেদনকারীদের লম্বা সারিতে অপেক্ষমাণদের কাছে ঘুরতে দেখা যায় এক কিশোরকে। সে জিজ্ঞেস করছে, কারো কাগজপত্রে ‘এটেস্টেড’ দরকার কিনা। এজন্য ৫০ থেকে ১৫০ টাকা দাবি করছে সে। এভাবেই পাসপোর্ট অফিসে আগতরা দালাল ও ‘ফইড়া’দের (ছোট দালাল) খপ্পরে পড়ছেন। ফলে একদিকে যেমন পাসপোর্ট আবেদনকারীদের অতিরিক্ত অর্থ খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা। আবার প্রয়োজনের সময় হাতে পাসপোর্ট না পেয়ে বিপাকে পড়ছেন অনেকেই। সরেজমিন ঘুরে ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আগারগাঁওয়ে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য, ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়মসহ নানা অপরাধের শিকার হচ্ছেন পাসপোর্ট আবেদনকারীরা। ভাসমান দালাল, কর্তব্যরত আনসার সদস্য এবং পাসপোর্ট অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে গড়ে তুলেছেন সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। আর এ সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন আবেদনকারীরা। বিঘ্নিত হচ্ছে নাগরিক সেবা। এখানে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে এসে ভোগান্তি সহ্য করা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণের জন্য পাসপোর্ট ও ভিসা প্রাপ্তি সহজ করতে ২০১০ সাল থেকে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট ও ভিসা বিতরণ শুরু করে সরকার। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথমে জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট ১৫ দিনে এবং সাধারণ পাসপোর্ট ৩০ দিনে সরবরাহ করার নিয়ম ছিল। বর্তমানে ৭ দিনে জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট পেতে ছয় হাজার টাকা ফি এবং ১৫ দিনে পাসপোর্ট পেতে তিন হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। পাসপোর্ট অফিসে সেনা সদস্যদের উপস্থিতির কারণে দালালদের উত্পাত অনেকটা কমে আসলেও তা পুরোপুরি দূর হয়নি। আবেদনকারীদের অজ্ঞতা এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দালালরা হয়রানি করছেন আবেদনকারীদের। এ প্রসঙ্গে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের একজন কর্মকর্তা জানান, আমাদের প্রতিদিন দুই হাজার ২০০টি আবেদন গ্রহণ ও সম্পূর্ণ করার ক্ষমতা রয়েছে; কিন্তু প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার আবেদন পড়ে। ফলে নির্ধারিত সময়ে কিছু আবেদনকারী পাসপোর্ট পান না। ব্যবস্থাপনার এই ঘাটতির সুযোগ নেয় দালালরা। তারা প্রচারণা চালায়, ‘নির্ধারিত ফি দিয়েও সময়মত পাসপোর্ট পাওয়া যায় না। তাদেরকে টাকা দিলে দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়া যাবে।’ ঐ কর্মকর্তা আরো জানান, দেশে বর্তমানে আগারগাঁও ও চট্টগ্রাম অফিসে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি চলছে। এ বছরেই প্রকল্পটি শেষ হয়ে যাবে। ফলে দালালদের উত্পাত আরো বাড়বে। দালাল আছে হরেক রকম পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে কয়েক ধরনের দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। এদের কেউ শুধু প্রাথমিক আবেদনপত্র পূরণ করেই দৈনিক হাজার টাকার বেশি আয় করে। কেউ শুধু ‘সত্যায়িত’ করে। কিছু দালাল আছে যারা চুক্তির মাধ্যমে পাসপোর্ট নবায়ন করার কাজ করে থাকে। আবার যারা নতুন পাসপোর্ট করে তাদের জন্য আছে আলাদা দালাল। তবে এদের সবাই একে অন্যের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করে। একজন আরেকজনের কাজে কোন বাধা সৃষ্টি করে না। দালালদের মধ্যে আরেকটি শ্রেণি আছে যাদের রয়েছে দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক। স্থানীয় পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট করার জন্য আগত লোকের অনেক ভিড় থাকায় অনেক আবেদনকারী প্রত্যাশিত সময়ে পাসপোর্ট পায় না। দালালদের মধ্যে যাদের দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক তারা জরুরি পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের ঢাকা পাসপোর্ট অফিস থেকে পাসপোর্ট বের করে দেয়ার চুক্তি করে। এভাবেই চলছে ঢাকার আগারগাঁওয়ে পাসপোর্ট অফিসে দালাল দৌরাত্ম্য। আর ঢাকার এসব দালালের খদ্দের সরবরাহ করে তাদের পরিচিত স্থানীয় দালালরা। জানা যায়, ৯০ দশক থেকে পাসপোর্ট অফিস ঘিরে দালালদের শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তোলে ফারুক, কাশেম মাস্টার ও আবুল হোসেন নামের তিন দালাল। তিন জনই মারা গেছেন। তবে তাদের সাগরেদরা রয়ে গেছেন। এ অফিস ঘিরে কয়েকশ’ দালাল কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। এদেরই কয়েকজন হলেন- বাবুল, আকরাম, হান্নান, টুটুল, নাজমা, সানোয়ার, সুমন, করিম শেখ। দালাল সুমন জানান, পাসপোর্ট সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কাজই তারা করেন। খদ্দের বুঝে টাকা দাবি করেন। কিভাবে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার ফর্ম সত্যায়ন করেন, জানতে চাইলে তিনি পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন সরকারি অফিস দেখিয়ে বলেন, ‘ওইখানে স্যারেগো লগে চুক্তি আছে। তাগো কাছে নিয়া গেলে সই কইরা দেয়’। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দালালরা নিজেরাই সরকারি গেজেটেড কয়েকজন অফিসারের নামে জাল সই তৈরি করে কাজ সম্পন্ন করে। নিত্য হয় বচসা গত মঙ্গলবার দুপুর দেড়টা। পাসপোর্ট অফিসের সামনে বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত দুই ব্যক্তি। তাদেরকে ঘিরে রয়েছেন আরো কয়েকজন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওয়াসিম নামের লালবাগের এক ব্যবসায়ী তার মেয়ের নামে দ্রুত পাসপোর্ট তৈরি করে দেয়ার জন্য শিপন নামের এক দালালকে দেড় মাস আগে নয় হাজার টাকা দেন। কিন্তু নামের বানানে ভুল করায় এটি সংশোধন করে নতুন পাসপোর্ট পেতে গত সপ্তাহে তিনি আবারো শিপনের কাছে যান। এবার শিপন ৫ হাজার টাকা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার পাসপোর্ট সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার ও গত রবি, সোম এবং মঙ্গলবার পরপর চার দিন এসে পাসপোর্ট না পেয়ে গতকাল শিপনের সাথে তর্কে লিপ্ত হন ওয়াসিম। পাসপোর্ট অফিসের সামনে দালাল-খদ্দের বচসা নিয়মিত চিত্র হয়ে পড়েছে। এরকম বচসা থেকে এবং বিশেষ অভিযান চালিয়ে পুলিশ বিভিন্ন সময় দালালদের গ্রেফতার করলেও পরে তারা জামিনে মুক্ত হয়ে আবারো পাসপোর্ট অফিসেই ভিড় করেন। জড়িত অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাসপোর্ট অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা, কর্মচারী ও আনসার সদস্যদের সাথে যোগাযোগ রয়েছে দালালদের। এদের মাধ্যমেই তারা নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে। টাকা লেনদেনের চিত্রও স্পষ্ট। অফিসের পুরনো ও নতুন ভবনে গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়। তবে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে সটকে পড়েন ঐ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালরা। আর পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারা এদের ‘ফইড়া দালাল’ নামে ডাকেন। নাগরিক অজ্ঞতার সুযোগ নেয় দালালরা পাসপোর্ট আবেদন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাসপোর্ট করার নিয়মকানুন এবং প্রক্রিয়া না জানার কারণেই আবেদনকারীরা ভোগান্তিতে এবং দালালদের খপ্পরে পড়েন। সরকার এমনিতেই ৭ দিনে জরুরি এবং ১৫ দিনে সাধারণ পাসপোর্ট সরবরাহ করার নিয়ম তৈরি করছে। তবে পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াশেষে জরুরি পাসপোর্ট ১০-১২ দিনে এবং সাধারণ পাসপোর্ট ২০ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে পাওয়া যায়। কিন্তু এ ব্যবস্থার প্রতি আস্থা গড়ে উঠেনি অনেক আবেদনকারীর। আর দালালরাও তাদের ভুল বোঝান। বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রাম থেকে আসা ব্যক্তিরা এবং বিদেশগামী অশিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিতরা এ হয়রানির বেশি শিকার হন। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক মুন্্সী মুয়ীদ ইকরাম বলেন, পাসপোর্ট অফিসে এখন আর আগের মত দালালদের উত্পাত নেই। কিছু আছে ‘ফইড়া’ দালাল। পুলিশ-র্যাব এদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালায়। তিনি জানান, দালালরা যতই বলুক সরকারিভাবে নির্ধারিত সময়ের আগে কেউই পাসপোর্ট পেতে পারে না। তাই জনগণ সচেতন হলে এবং পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হলে দালালদের অস্তিত্ব থাকবে না।