খাদ্যে ফরমালিন:দায় কার

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৪, ২০:৫০
সম্প্রতি দৈনিক পত্রিকার খবরের শিরোনাম:‘৭টি সরকারি পরীক্ষার ফলাফল: খাদ্যে ক্ষতিকর ফরমালিন মেলেনি’। তাহলে ডিএমপি কর্মকর্তারা কেন এত ফলমূল নষ্ট করলেন? আধুনিক বিজ্ঞান খাদ্যমান বিচারে ফলকে প্রকৃতির সবচেয়ে বড় উপহার হিসেবে বিবেচনা করে। এই ফল সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন দেশ পোস্টহারভেস্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আমাদের দেশে কোনো পোস্টহারভেস্ট ব্যবস্থা চালু নেই এবং ফল বাজারজাতকরণের জন্য পোস্টহারভেস্ট ফাঞ্জিসাইড বাজারে নেই। আম বাজারজাত করতে গেলে আমাদের আম ব্যবসায়ীরা দুটি মারাত্মক পচন রোগের কারণে ব্যবসায় ক্ষতির মুখে পড়েন। আমের এই প্রধান দুটি পোস্টহারভেস্ট রোগ হচ্ছে: অ্যান্থ্রাকনোজ এবং স্টেম অ্যান্ড রট। অ্যান্থ্রাকনোজের প্রকোপে আমে প্রথমে সামান্য দাগ বা স্পট দেখা যায় যা কোনো ট্রিটমেন্ট না করলে পরিবহনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমকে খাবার অযোগ্য করে ফেলে এবং এর অতি সূক্ষ্ম স্পোর খুব দ্রুত অন্য আমকে সংক্রমিত করে। স্টেম অ্যান্ড রটের ক্ষেত্রে আম বোঁটা থেকে পচতে শুরু করে। এই পচন প্রক্রিয়া অতি দ্রুত ঘটে। আমের এই দুটি রোগের প্রকোপই এমন যে আম বিপণনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং ভোক্তার বাসায় নেওয়ার পরেও এর পচন চলমান থাকে । প্রতিবেশী ভারত গবেষণা করে দেখেছে আম উত্পাদনের পর ভোক্তার ব্যবহারের মধ্যবর্তী সময়ে ৫০% আম নষ্ট হয়। এজন্য বিশ্বের আম উত্পাদনকারী দেশসমূহে আম উত্পাদনের জন্য যেমন কৃষিপ্রযুক্তি রয়েছে তার চেয়ে আরো বেশি আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে এর পোস্টহারভেস্ট ব্যবস্থাপনায়। বাগানে উত্পাদনের সময় কৃষকরা বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করলেও বাজারজাতের জন্য নিয়ম হচ্ছে ফল ছেঁড়ার দু-সপ্তাহ আগে তারা ঐসব পেস্টিসাইড-ফাঞ্জিসাইড ব্যবহার বন্ধ করবে। ধরুন আমাদের চাহিদার প্রয়োজনে এই চর্চাটিতে ফলচাষিগণ অভ্যস্ত। তাহলে কী হতে পারে দেখুন—আমাদের চাষিগণ ফল বাজারে বিক্রি করছেন। আড়তদাররা ফল ট্রাকে তুলে দিলে পরদিন ঢাকার বাজারে দেখা গেলো ১০-২০% ফলে দাগ ধরে গেছে। ঐ ফলের সঙ্গে মিশ্রিত থাকায় এবং নাড়াচাড়ার সময় অন্যান্য ফলও আক্রান্ত হবে। আপনি বেছে-বেছে পছন্দমতো আম কিনে বাসায় যাবেন, পরদিন দেখবেন কয়েকটা পচতে শুরু করেছে। আপনি অপেক্ষাকৃত পচাগুলোই আগে খেয়ে নিচ্ছেন। আবার পরদিন নতুন পচন শুরু হওয়া আমগুলো খাচ্ছেন। এই যে পচা আম খাওয়ার গল্পটি বললাম এটি হচ্ছে শতভাগ অর্গানিক আম খাওয়ার গল্প। কিন্তু আমাদের বাজারজাতকারীরা ব্যবসায় ক্ষতি মেনে নেবে না আর আমাদের অর্গানিক আমও খেতে দেবে না। কিন্তু ক্ষতিকর ফরমালিন তো খাবারে দেওয়া যাবে না। তাহলে কী দেওয়া যাবে? তেতাল্লিশ বছর হয়ে গেছে আমরা স্বাধীন হয়েছি, আমাদের দেশের বাজারে এখনো পোস্টহারভেস্ট পেষ্টিসাইড-ফাঞ্জিসাইড-ব্যাক্টেরিসাইড নেই। আমাদের কৃষি বিভাগ চাষিদের আম চাষ কতটা শিখিয়েছে বলতে পারবো না তবে বাজারজাতকারীদের বাজারজাত করা শেখায়নি। ফলচাষিরা ফল উত্পাদন করে আর বাজারে গিয়ে নগদ মূল্যে বিক্রি করে। পরবর্তী সময়ে সেই ফল পচে গেলো না কী হলো তা তাদের দেখার বিষয় নয়। কিন্তু বিষয়টি তেমন হওয়া উচিত নয়। উদ্ভিদরোগতত্ত্বের একজন ছাত্র হিসেবে আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি ফল উত্পাদন করার সঙ্গে সঙ্গেই চাষির দায়িত্ব শেষ হয়ে গেলেও উদ্ভিদরোগতত্ত্ববিদের কাজ শেষ হয়ে যায় না। একজন উদ্ভিদরোগতত্ত্ববিদের কাজের পরিসীমা হচ্ছে ভোক্তার হাতে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় কাজ করছে কি? করছে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি ফল গবেষণা কেন্দ্র আছে। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমচাষি ও আমের বাজারজাতকারীদের কোনো যোগ নেই। তাজা ফলমূল বাজারজাতকরণে এখন পর্যন্ত সরকারের কোনো নীতিমালা নেই। আছে জিরো টলারেন্স! মৌসুম এলেই ফল ব্যবসায়ীদের পথ জানা নাই কর্মকাণ্ডে আমাদের পুলিশ প্রশাসন অতি মাত্রায় তত্পরতা দেখায়। বাজারে যেহেতু পোস্টহারভেস্ট ফাঞ্জিসাইড নেই সেক্ষেত্রে তারা ঝুঁকিতে চলে যাচ্ছে। মানুষজন বুঝে গেছে জীবাণু খাবার নষ্ট করে এবং ফরমালিন সকল জীবাণুকে মেরে ফেলে। তবে আমি এইভাবে মূল্যবান ফলমূল নষ্ট করার পক্ষে নই। ফলগুলো খাওয়া যেতো। ফরমালিন পানিতে দ্রাব্য রাসায়নিক, সুতরাং ফরমালিনযুক্ত ফলগুলো এক ঘণ্টা পানিতে চুবিয়ে রাখলে তার ফরমালিন দূর হয়ে যায়। অথবা জনসাধারণের হাতে না দিয়ে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য যেমন জুস তৈরি করে এমন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া যেতো। ফরমালিনের স্ফুটনাঙ্ক ৭৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। প্রক্রিয়াজাতকারীরা এসব ফলকে প্রথমে ধুয়ে এবং পরে ফলের পাল্পকে উচ্চতাপে স্টেরিলাইজ করার সঙ্গে সঙ্গে এই সামান্য মাত্রার ফরমালিন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যেতো। উল্লেখ্য, মাছ মাংস পানিতে এক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলে তা ফরমালিনমুক্ত হয়। লবণ-পানি কিংবা ভিনেগার মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখলে আরো দ্রুত ফরমালিনমুক্ত হয়। রান্না করা খাবারে কোনো ফরমালিন থাকে না। পুলিশের ফরমালিনবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমের পাইকারি বাজারের আড়তদারদের ফরমালিন পরীক্ষার নামে রাজপথে পুলিশি হয়রানির বিরুদ্ধে মিছিল করতে দেখি। মিডিয়ার লোকজনের কাছে তারা অনেকেই ফরমালিন মেশানোর কথা অস্বীকার করেছে। আমরা কি সকল ব্যবসায়ীকে দোষারোপ করবো? প্রায় সকল ফলেই ফরমালিন পাওয়া যাচ্ছে এমন খবর শুনছি, তাহলে কে ফরমালিন মেশাচ্ছে ? প্রায় সকল উদ্ভিদ ও প্রাণিজাত খাদ্যেই প্রাকৃতিকভাবে ফরমালিন তৈরি হয়। হংকং-এর বিশ্বসেরা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ফুড সেফটি তাদের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ফরমালিন শনাক্ত করে বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছে। বোম্বে-ডাক নামক একটি সামুদ্রিক মাছের হিমায়িত প্যাকেট পরীক্ষা করে ৪০০ পিপিএম ফরমালিন পাওয়া গেছে। প্রাকৃতিকভাবে এসব খাদ্যে ফরমালিনের উত্স হচ্ছে জীবদেহের ট্রাইমিথাইল অ্যামাইন অক্সাইড। এই ট্রাইমিথাইল অ্যামাইন অক্সাইড ভেঙে সমপরিমাণ ফরমালিন ও ডাই মিথাইল অ্যামাইন তৈরি হয় যা প্যাকেটজাত খাদ্যে পাওয়া যায়। বিভিন্ন ফলমূল এবং শাকসবজিতে প্রাকৃতিক ফরমালিনের অন্যান্য উত্সও রয়েছে। হংকং-এর এই জাতীয় প্রতিষ্ঠান আপেল, কলা, নাসপাতি, ফুলকপি, শুকনো মাশরুম এবং মাছ-মাংসে প্রাকৃতিকভাবে যথেষ্ট ফরমালিনের অস্তিত্ব খুঁজে পান। কাকে দোষ দিয়েছে হংকং-এর বিশ্ববিখ্যাত জাতীয় প্রতিষ্ঠান! আমাদেরকেও এর বাস্তবতা এবং বিজ্ঞান জেনে এগুতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীর সঙ্গে সাধু যেন কষ্ট না পায়। সরকারের কৃষি বিভাগকে বাজারজাতকরণের জন্য অতি শীঘ্রই বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জানামতে, প্রতিবেশী প্রত্যেকটি দেশেই উত্পাদনের পরপরই এর লাগসই পোস্টহারভেস্ট ব্যবস্থা চালু আছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে স্বীকার করি, তবে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে এতোটা পিছিয়ে থাকলে হবে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়