উত্তরায় গুলি করে কলেজ ছাত্রীকে অপহরণের ছয় ঘন্টা পর উদ্ধার করেছে পুলিশ ও র্যাব। বৃহস্পতিবার রাত ১১ টার দিকে অপহরণের পর শুক্রবার ভোর পাঁচটার দিকে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের একটি সড়ক থেকে আলোচিত কলেজ ছাত্রীকে অসুস্থ অবস্থায় পুলিশ উদ্ধার করেছে। র্যাব ও পুলিশের উদ্ধার তত্পরতা দেখে অপহরণকারীরা ঐ কলেজ ছাত্রীকে ছেড়ে দেয়। অপহরণকারীরা তাকে ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পুলিশ ঐ কলেজ ছাত্রীকে পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের পাঠায়। গতকাল শুক্রবার ঐ কলেজ ছাত্রীর শারীরিক পরীক্ষা না হওয়ায় তাকে পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখা হয়েছে।
এ ঘটনায় কলেজ ছাত্রীর মা নূরুননাহার বাদি হয়ে অজ্ঞাত ৪ জনকে আসামি করে উত্তরা থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ অপহরণের ঘটনায় কলেজ ছাত্রীর সাবেক প্রেমিক উত্তরার জসীমউদ্দীন রোডের উত্তরা টাওয়ারে ‘এশিয়ান স্কাই শপে’র মালিক রুম্মন, তার দুইভাই ও বাবাকে কাফরুলের ‘মিতালী হাউজিংয়ে’র বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, কলেজ ছাত্রীকে অপহরণের পর উত্তরার একটি বাসায় নিয়ে শ্লীলতাহানি করে। এ দৃশ্য ভিডিও করা হয়েছে। পুলিশ ও র্যাব এই ভিডিও ফুটেজ উদ্ধারের চেষ্টা করছে।
পুলিশ, পারিবারিক সুত্র ও প্রত্যক্ষদর্শী সুত্র জানায়, ক্যামব্রেইন স্কুল এন্ড কলেজ উত্তরা শাখার ব্যবসা শিক্ষা বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণীর ঐ ছাত্রীর বিয়ে ঠিক হয় ইঞ্জিনিয়ার মাহফুজুল হকের সাথে। মাহফুজ অ্যারোলিটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। দুই বছর আগে থেকে ঐ কলেজ ছাত্রী ও তার মা উত্তরার ‘এশিয়ান স্কাই শপ’ থেকে কেনাকাটার সূত্র ধরে ঐ দোকানের মালিক রুম্মনের সাথে পরিচয় হয়। পরিচয়ের সূত্র ধরে কলেজ ছাত্রীর সাথে রুম্মনের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কলেজ ছাত্রী ও তার মা ঐ দোকান থেকে সৌন্দর্য চর্চার বিভিন্ন সামগ্রী বিনামূল্যে নিতেন। এক পর্যায়ে কলেজ ছাত্রীর মা তাদের মধ্যে বিয়ের উদ্যোগ নেন। কিন্তু পারিবারিকভাবে কলেজ ছাত্রীর বাবা এ ব্যাপারে অমত করায় তাদের সম্পর্কের টানাপড়ন চলে। গত সপ্তাহে মাহফুজুল হকের সাথে কলেজ ছাত্রীর বিয়ের বাগদান সম্পন্ন হয়। মাহফুজুল হক উত্তরা ৫ নং সেক্টরের ৪/এ নং রোডের ১৯ নম্বর বাড়ির ফজলুল হকের ছেলে।
বৃহস্পতিবার রাতে কলেজ ছাত্রী, তার মা ও হবু স্বামী মাহফুজুল উত্তরার বিভিন্ন শপিংমল থেকে কেনা-কাটা করেন। এরপর তারা একটি ফাস্ট ফুডের দোকানে খাবার খান। রাত সাড়ে ১০ টার দিকে তারা হেঁটে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর সড়ক দিয়ে যান। ৯ নম্বর বাড়ির সামনে পৌঁছলে একটি সাদা রঙের টয়োটা এলিয়ন প্রাইভেট কার তাদের গতিরোধ করে। কার থেকে ৩ জন অস্ত্রধারী যুবক বের হয়। তারা টেনে-হিঁচড়ে কলেজ ছাত্রীকে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করে। এসময় মাহফুজুল বাধা দিলে তার হাতে চাপাতি দিয়ে কোপ দেয় ওই যুবকরা। এই দৃশ্য দেখে পার্শ্ববর্তী ৬ নম্বর ভবনের সিকিউরিটি গার্ড লিয়াকত হোসেন লিটন (৩৮) দেখে এগিয়ে যান। লিটন যুবকদের কাছ থেকে কলেজ ছাত্রীকে উদ্ধারের চেষ্টা করলে গাড়ির স্টিয়ারিং সিটে বসে থাকা এক যুবক লিটনকে লক্ষ্য করে এক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। তারা কলেজ ছাত্রীকে উঠিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।
অপহরণকারীরা চলে গেলে আশপাশের ভবনের সিকিউরিটি গার্ড ও প্রতিবেশীরা গুরুতর আহত লিটনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার পর রাত সাড়ে ১২ টার দিকে চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত লিটনের বাবার নাম নাজমুল হুদা। রংপুরের পীরগাছার সুতিপাড়ায় তার বাড়ি। দুই ছেলের জনক লিটন উত্তরার হারিস সিকিউরিটি সার্ভিসের সদস্য ছিলেন।
ঘটনার পর কলেজ ছাত্রীর মা নূরুননাহার ছুটে যান উত্তরা মডেল থানায়। সেখানে পুলিশের কাছে তার মেয়েকে উদ্ধারের আকুতি জানান। নূরুননাহার অভিযোগ করেন, পুলিশ প্রথমে বিষয়টি আমলে নেয়নি। থানা থেকে জানানো হয় যে, আগে মামলা করতে হবে-এরপর অপহূতকে উদ্ধার অভিযান চলবে। পুলিশের কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্যে তিনি নিরাশ হয়ে চলে যান উত্তরা র্যাব-১ কার্যালয়ে। রাত ১২টার দিকে র্যাব-১ কার্যালয়ের প্রবেশ গেটে একজন সৈনিকের কাছে তার মেয়েকে উদ্ধারের দাবি জানিয়ে চীত্কার করে কাঁদতে থাকেন। এসময় র্যাব-১ কার্যালয় থেকে র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বের হচ্ছিলেন। তিনি বিষয়টি জানার পর র্যাব-১ এর পরিচালক ও উপ-পরিচালকের সমন্বয়ে তাত্ক্ষণিক শক্তিশালী টিম গঠন করা হয়। ঐ সময় নূরুননাহারকে র্যাবের গাড়িতে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে র্যাবের টিম।
পাশাপাশি বিষয়টি পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার নিসারুল আরিফ জানতে পেরে তাত্ক্ষণিক পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে দেন। তিনি নিজেও ছুটে যান ঘটনাস্থলে। এরপর পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রুম্মনের অবস্থান নিশ্চিত হয়। ভোর ৫টার দিকে পুলিশ ও র্যাবের একটি টিম কাফরুলের মিতালী হাউজিংয়ের একটি বাড়ি ঘিরে ফেলে। ঐ বাড়ি থেকে রুম্মনসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। এসময় রুম্মন পুলিশের কাছে তথ্য দেয় যে, অপহূত কলেজ ছাত্রীকে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের একটি রাস্তায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। পরে পুলিশের একটি টিম সেখান থেকে উদ্ধার করে উত্তরা মডেল থানায় নিয়ে যায়।
পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার নিসারুল আরিফ বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ঐ কলেজ ছাত্রীর বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার খবরে তার পুরনো কোনো বন্ধু ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের দিয়ে এ অপহরণ ঘটিয়েছিল। সে এখন পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। কলেজ ছাত্রীর মা নূরুননাহার সাইফুল জানান, ফাতেমা ক্যাম্ব্রিয়ান স্কুল এন্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী। কিছুদিন আগে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের ৪/এ নম্বর রোডের ১৯ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা মাহফুজের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে ঠিক করা হয়। তাদের দু’জনের আংটি বদল হয়ে গেছে। দুই পরিবারের সম্মতিতেই এই বিয়ে ঠিক করা হয়েছে। কলেজের পড়ার সুবাদে তার মেয়ের অনেক বন্ধু ছিলো।
পুলিশের উত্তরা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার সাহেদ ফেরদৌস রানা জানান, বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে গ্রেফতারকৃতদের নাম বা বিস্তারিত তথ্য দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
