বত্রিশ বছর পর আবার আর্জেন্টিনার সামনে বেলজিয়ামের সেই সুখ স্মৃতি। প্রায় সেই একই পরিস্থিতি। বিশ্বকাপ ফুটবলের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা বেলজিয়াম মুখোমুখি। গ্রুপ ম্যাচে প্রথম সাক্ষাতে ৮২ স্পেন বিশ্বকাপে বেলজিয়াম ১-০ গোলে হারিয়েছিল ব্রাজিলকে। দ্বিতীয় এবং বিশ্বকাপের শেষ সাক্ষাত্ হয় ৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপে, ব্রাজিল ২-০ গোলে হারায় বেলজিয়ামকে। আজ দুই দলের তৃতীয় সাক্ষাত্ কোয়ার্টার ফাইনালে, ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ায়।
৮৬’ বিশ্বকাপ ফুটবল সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল। ৭৮ বিশ্বকাপের পর ৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ছিল সেটি দ্বিতীয় ট্রফি। ফুটবল কিংবদন্তী দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। ৮৬ বিশ্বকাপের সময় পৃথিবীর আলোর মুখ দেখেননি আজকের লিওনেল মেসি। ২৪ জুন ১৯৮৭ সালে জন্ম আর্জেন্টিনার ফুটবল অধিনায়কের। ম্যারাডোনার সময় আর্জেন্টিনা কেমন দল ছিল সেটা টেলিভিশনে দেখেছেন। যখন ফুটবল বুঝতে শুরু করেন, তখন থেকেই জেনেছেন আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফুটবলের তৃতীয় শিরোপাটির জন্য চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে। ম্যারাডেনার পর এবং মেসির আগে অনেক ফুটবলারই আর্জেন্টাইন জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন। কিন্তু তৃতীয় শিরোপাটি এনে দিতে পারেননি। ৯৪ বিশ্বকাপ ফুটবলেই ম্যারাডোনার ফুটবল জীবনের মৃত্যু ঘটে। ষড়যন্ত্রের কারণে খেলা থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। তার মতো ফুটবল মাঠের পায়ের জাদুকর দ্বিতীয় জন ছিলেন না। আর্জেন্টিনার আর কোয়ার্টার ফাইনালের ব্যারিয়ার টপকে যাওয়া হয়নি। গত দুটি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়।
২০০৬ ২০১০, দুটি বিশ্বকাপেই খেলেছিলেন মেসি। কিন্তু সেভাবে দেখা যায়নি তাকে। ২০১০ বিশ্বকাপে মেসি খেললেও তার পারফরম্যান্স নিয়ে প্রচুর সামালোচনা হয়েছিল। মেসি তার আসল খেলাটা না খেলার কারণেই নাকি আর্জেন্টিনা মাঝ পথে বিদায় নেয়। মেসি তার সব খেলা লকারে আটকে রেখেছিলেন ক্লাব ফুটবলের জন্য। এবার সেই বদনাম ঘুচিয়ে মেসি যেন দেশের জন্য ফুটবল খেলছেন। আর্জেন্টাইনদের এই বিশ্বাস এখন ব্রাসিলিয়ার মানে গ্যারিঞ্চা স্টেডিয়ামে ঘুরপাক খাচ্ছে। বসনিয়া হার্জেগোভিনা, ইরানের বিরুদ্ধে গোল করে ম্যাচ জিতিয়েছেন মেসি। নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে ২ গোল করে (৩-২) ম্যাচ জিতিয়েছেন, বলা যায়। প্রিকোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে নিজে গোল না করলেও ডি মারিয়াকে দিয়ে গোল করিয়ে ১১৮ মিনিটে ম্যাচ জিতিয়েছেন মেসি। ৪ ম্যাচে তিনিই পেয়েছেন ৪টি ম্যান অফ দ্যা ম্যাচের পুরস্কার। বেলজিয়ামকে ধরাশায়ী করার জন্য মেসিকেই নামতে হবে। এমন আত্মবিশ্বাস আর্জেন্টিনা থেকে আসা দর্শকদের। তারা বলছেন, মেসি পারে আর্জেন্টিনাকে রিওতে ১৩ জুলাইয়ের ফাইনালে নিয়ে যেতে। ম্যাচের আগে ব্রাসিলিয়ায় এমন সব আলোচনা আর্জেন্টাইনদের মুখে মুখে। আর তাইতো ব্রাজিলের মানে গ্যারিঞ্চা স্টেডিয়ামের বাইরে দর্শনীয় স্থানে আর্জেন্টাইনরা মেসি মেসি বলে স্টেডিয়াম এলাকা গরম করে ফেলছেন। বেলে হরিজোন্তের মিনেরিওর চেয়ে খোলা ময়দানে বেশি উত্ফুল্ল আর্জেন্টাইনরা। এমন এক স্থান এখানে কয়েক লাখ লোকের সমাগম হতে পারে।
বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনা বেলজিয়াম দুইবার মুখোমুখি হয়। প্রথম বার ৮২ স্পেন বিশ্বকাপ ফুটবলে গ্রুপ পর্বে বেলজিয়াম ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারালেও পরের আসরে প্রতিশোধ নিয়েছেন ম্যারাডোনা। ৮৬ বিশ্বকাপে ১ লাখ সাড়ে ১৪ হাজার দর্শকের সামনে অধিনায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা নিজে দুই গোল করে (২-০) বেলজিয়ামকে হারিয়ে প্রতিশোধ নিয়ে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। এবার বেলজিয়াম দর্শকরা এসেছেন এখানে পুরনো স্মৃতি বুকে নিয়ে। রেড ডেভিলসরা আরেকবার হারাতে চায় আর্জেন্টিনাকে।
বেলজিয়ামের ইতিহাস বলে তারা বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নিতো। ৮২ বিশ্বকাপে প্রিকোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। ৮৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলাই ছিল বিশ্বকাপ ফুটবলে বেলজিয়ামের সর্বোচ্চ অর্জন। এরপর আবার প্রিকোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্তই তাদের দেখা মিলেছিল। ৮২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারানো এবং ৮৬ বিশ্বকাপ ফুটবলে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে বাংলাদেশের ফুটবল দর্শকরা তখনই বেলজিয়ামকে ভালো ভাবে চিনতে শুরু করেন। ৯০ এবং ৯৪ বিশ্বকাপের গ্রুপ থেকে বিদায়ের পর বাংলাদেশের ফুটবল দর্শকদের চোখের আড়াল হতে হতে একটা সময় বেলজিয়াম মনের আড়াল হয়ে যায়।
ব্রাজিল বিশ্বকাপ ফুটবলের পর্দ উঠার আগে বেলজিয়ামকে নিয়ে আলোচনা ছিল না। যারা ফুটবল নিয়েই গবেষণা করছিলেন তারা হয় তো জানতেন। তাছাড়া বেলজিয়াম ফুটবল আলোচনার টেবিলে জায়গা পায়নি। উপেক্ষিত বেলজিয়াম এখন সর্বত্র আলোচনায় ঠাঁই পাচ্ছে। বুয়েন্স আয়ার্স থেকে শুরু করে ব্রাজিলে আর্জেন্টিনার বেস ক্যাম্প পর্যন্ত সবাই বেলজিয়াম নিয়ে কথা বলছেন। ৮ নম্বর গ্রুপে বেলজিয়াম চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আলজেরিয়াকে (২-১), রাশিয়াকে (১-০) হারিয়ে, সবচেয়ে বড় চমকটি দেখিয়েছে গ্রুপের শেষ ম্যাচে ১-০ গোলে কোরিয়াকে হারিয়ে। ২০০২ বিশ্বকাপে নিজের ঘরের মাঠে কোরিয়া সেমিফাইনাল খেলেছিল। সেই কোরিয়াকে হারিয়ে বেলজিয়াম সবার কাছে আদরনীয় হয়ে উঠলো। কিভাবে এমনটি হলো? সংবাদ মাধ্যমের কাছে বলেছেন ৪৬ বছর বয়সী কোচ মার্ক উইলমটস, তারুণ্যই আমার শক্তি।’ এক দুজন ছাড়া আমার দলের সবাই তরুণ।’ কোচ বললেন, বেলজিয়াম ফুটবল ঐতিহ্যবাহী দল। সঠিক পরিচর্যা না থাকায় আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নিজের অবস্থানটা হারাতে যাচ্ছিল। ব্রাজিল বিশ্বকাপ ফুটবলকে আমরা নতুন ফুটবল জীবন পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে রোড ম্যাপ ধরে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করছি।’ বেলজিক কোচের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে তার দলের কৌশলটা কী হতে পারে। উনি উল্টো প্রশ্ন করলেন এটা কী আপনার জন্য জরুরি। আমি আর্জেন্টাইন কোচ সাবেলাকে সব জানাতে চাই না।’
প্রিকোয়ার্টার ফাইনালে দুর্দান্ত ফুটবল খেলে ১২০ মিনিটের ম্যাচে বেলজিয়াম ২-১ গোলে যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। বেলজিয়ামের প্রশংসা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া। বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গোলকিপার হাওয়ার্ড বেলজিয়ামের ১৫টি শট ঠেকিয়েছেন।
বেলজিয়ামের ফুটবলাররা ইংলিশ লিগ, স্প্যানিশ লিগের বড় বড় ক্লাবে খেলেন। অভিজ্ঞতাও কম নয়। প্রতিটা পজিশনের প্লেয়ার অনেক বেশি পরিশ্রমী। বেলজিয়ামের টেকনিক্যাল লাইনআপ বেশ শক্তিশালী। রক্ষণভাগে চার জন নিকোলাস লোমবায়েরেটিস, ড্যানিয়েল ভ্যান বুইটেন, অধিনায়ক জান ভার্টোসেন, অ্যান্থনি ভানডেন। মাঝমাঠে ষ্টিভেন ডিফোর, মোসা ড্যামবেলে, ফেলেইনা বলের যোগান দেবেন। দুই উইং মার্টিনেস, জানুজা এবং স্ট্রাইকার মিরালাস গোলের দায়িত্বে। আর্জেন্টিনা যদি তাদের ডিফেন্স শক্তিশালী না করতে পারে তাহলে বেলজিয়ামের আক্রমণ ভাগ ঠেকানো কঠিন হয়ে যাবে। আর্জেন্টিনার টেকনিক্যাল প্ল্যান অনেকটাই মিল আছে রেড ডেভিলসদের সাথে। যেমন রক্ষণে থাকবে ৪ ডিফেন্ডার গ্যারি, ফার্নান্ডোজ, রোজো, জাবেলতা। তাদের উপরে থাকবেন গ্যাগো, মাসচেরানো, ডি মারিয়া, তার সামনে মেসি, ডানে লাভেজ্জি এবং বায়ে হিগুয়েন। সাধারণত এমন প্ল্যান নিয়ে সাবেলা মাঠে নামেন। তবে কোয়ার্টার ফাইনালের আগে প্ল্যানটা চূড়ান্ত করবেন কোচ।
কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে বেলজিয়াম এখন পাহাড় সমান শক্তির আর্জেন্টিনার মুখোমুখি। নিচে দাঁড়িয়ে উপরের দিকে পাহাড়টা যেমন দেখা যায় বেলজিয়ামের কাছে আর্জেন্টিনা এখন এমনই একটা দল। তবে আর্জেন্টিনার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে বেলজিকরা, যে কোনো সময় কামড়ে দেয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী রেড ডেভিলসরা।
কোয়ার্টার ফাইনাল
আর্জেন্টিনা-বেলজিয়াম, রাত ১০:০০
নেদারল্যান্ডস- কোস্টারিকা, রাত ২:০০
