মাধব রায় সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা)
ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট
মেঘ-বৃষ্টি-ঝড়
পর্ব— ১৩
এ বছর বৃষ্টিপাত দেরিতে শুরু হয়েছে। আষাঢ় মাসে যে রকম মুষলধারে বৃষ্টি হবার কথা, এবারে সেরকমটি নেই। থেমে থেমে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। এখনো আকাশে মেঘ রয়েছে, তবে বৃষ্টি কখন আসবে এর কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। রাতে সবাই এসে জড়ো হয়েছে ছাদে। রেখা বললো— বাবা মেঘ কত উঁচুতে থাকে ?
নীলকান্তবাবু বললেন— মেঘ ভূপৃষ্ঠের দেড় কিলোমিটার থেকে এগারো কিলোমিটারের মধ্যে থাকে।
কিন্তু মেঘ সৃষ্টি হয় কীভাবে ? বললো অণু।
মেঘ হয় পৃথিবীর জল থেকে। পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগই তো জল। সেই জলাশয় থেকে প্রতিনিয়ত পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাচ্ছে আকাশে।
আকাশ বললো— তা তো জানি। কিন্তু যাচ্ছে, ভেসে থাকছে, আবার বৃষ্টি হচ্ছে, এটি কীভাবে ?
নীলকান্তবাবু বললেন— মন দিয়ে শোন। বায়ুমণ্ডলের কয়েকটা স্তর রয়েছে। ভূপৃষ্ঠ থেকে এগারো কিলোমিটার দূর পর্যন্ত যে স্তর, তার নাম ট্রপোস্ফিয়ার বা ট্রপোমণ্ডল। মেঘ, বৃষ্টি, ঝড়, কুয়াশা এই স্তরেই সৃষ্টি হয়। কিন্তু মেঘ বৃষ্টি কীভাবে হয়, তা তো বলছো না— বললো কণিকা।
বলছি, পানি প্রতিনিয়ত বাষ্পায়িত হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে যাচ্ছে। এগুলো অবশ্য ট্রপোস্ফিয়ারেই থাকছে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে বাষ্পের পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন হয়। সাগরের কাছাকাছি অঞ্চলে বাষ্পায়ন বেশি হয়। শীতপ্রধান দেশে এবং সমুদ্র থেকে দূরবর্তী স্থানে বায়ুতে বাষ্প কম থাকে।
তার মানে আমাদের ওখানে বায়ুতে জলীয়বাষ্প বেশি থাকে ? বললো চন্দ্রা।
হ্যাঁ, কক্সবাজার, চিটাগাং, পতেঙ্গার বায়ুতে বাষ্প বেশি থাকে।
কিন্তু বৃষ্টি কীভাবে হয়, সেটা বলো— বললো কণিকা।
জলীয়বাষ্প বায়ুমণ্ডলের উপরের দিকে উঠে ঠাণ্ডা হয়ে ক্ষুদ্র পানিকণায় পরিণত হয়। পানিকণা একত্রিত হয়ে আকাশে মেঘ হিসেবে ঘুরে বেড়ায়। এক পর্যায়ে কণাগুলো আকারে বড় হয়ে বৃষ্টিরূপে মাটিতে পড়ে।
আর শিলাবৃষ্টি কীভাবে হয় ? বললো কণিকা।
অনেক সময় তীব্র বায়ুপ্রবাহের ফলে নিম্নমুখী পানির কণা আরো উপরে উঠে যায় এবং শীতলস্তরে প্রবেশ করে। 00C তাপমাত্রার নিচে নেমে গেলে কণাগুলো জমে গিয়ে দ্রুত আয়তনে বেড়ে যায়। এতে ঘনিভূত পিণ্ডটি কিছু বায়ু আবদ্ধ করে ফেলে এবং গোলকের আকার ধারণ করে। আর অভিকর্ষের প্রভাবে নিচে নেমে আসে। এভাবেই শিলাবৃষ্টি হয়।
ঝড় কীভাবে হয় ? বললো বিন্দু।
কোনো স্থানের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সেখানকার বাতাস হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। ফলে ওই অঞ্চলে বায়ুচাপ কমে যায়। একেই বলে নিম্নচাপ। তখন আশেপাশের অঞ্চল থেকে দ্রুতবেগে বাতাস এই নিম্নচাপ অঞ্চলে ছুটে আসে। ফলে ঝড়ের সৃষ্টি হয়। একে বলে সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড় উত্তর গোলার্ধে মানে আমাদের অঞ্চলে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে আর দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরে। যেখানে সাগরের পানির তাপমাত্রা 260 সেলসিয়াসের বেশি থাকে সেখানে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়।
দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো, আমাদের বঙ্গোপসাগরে প্রায় সবসময় এরকম তাপমাত্রা থাকে। বিষুবঅঞ্চলেও অপেক্ষাকৃত বেশি গরম, ফলে সেখানে লঘুচাপ থাকে। আর উত্তর ও দক্ষিণগোলার্ধ থেকে দুই ধরনের মৌসুমীবায়ু প্রবাহিত হয়ে বিষুবঅঞ্চলে একে অপরের মুখোমুখি হয়। ফলে এর সংযোগস্থলে ছোট ছোট ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়। ঘূর্ণি এলাকার বায়ুচাপের শূন্যতা পূরণের জন্য পার্শ্ববর্তী এলাকার ঠাণ্ডা ও ভারি বাতাস সজোরে ঘুরতে থাকে। বাতাসের বেগ ঘণ্টায় 63 কিলোমিটারের বেশি হলে তাকে সাইক্লোন বলি।
ঘূর্ণিঝড় কত বড় হতে পারে ? বললো রেখা।
অনেক। বললেন নীলকান্তবাবু। ধর পাঁচশ থেকে ছয়শ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ হতে পারে ঘূর্ণিঝড়ের।
ওরে বাবা, এতো বড়, চন্দ্রা অবাক হলো। তার মানে আমাদের ওখানে যখন নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়, তখন সেটি তোমাদেরকেও পেতে পারে ?
হ্যাঁ। চিটাগাং থেকে সিলেট পর্যন্ত দূরত্বের সমান হতে পারে।
কমলা বললেন— কিন্তু আমরা ঘূর্ণিঝড়কে সাইক্লোন বলি কেন ?
নীলকান্তবাবু বললেন— সাইক্লোন শব্দটি গ্রিক শব্দ Kyklos থেকে এসেছে, এর অর্থ হলো Coil of snakes বা সাপের কুণ্ডলি। বাতাস কুণ্ডলি পাকিয়ে উপরে উঠে যায়, এর জন্য এর এরকম নাম।
তাহলে কালবৈশাখী কোনটা ? বললো কণিকা।
বৈশাখ মাসে যে ঝড় হয়, তাকে বলি কালবৈশাখী। অণু জবাব দিলো।
নীলকান্তবাবু বললেন— আসলে কালবৈশাখী আমাদের স্থানীয় নাম। এটিও একটি ঝড়, যাকে বলি টর্নেডো। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়াতেও টর্নেডো হয়। তারা তো একে কালবৈশাখী বলে না। আমেরিকাতে বলে হারিকেন (Hurricane), দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে টাইফুন (Typhoon), আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বলে সাইক্লোন।
তাহলে টর্নেডো আর সাইক্লোনের কী পার্থক্য ? বিন্দু বললো।
টর্নেডোর গতিবেগ সাইক্লোনের চেয়ে বেশি,ঘণ্টায় 480—800 কিলোমিটার। আর বিস্তার মাত্র কয়েক মিটার। দৈর্ঘ্য 5 থেকে 30 কিলোমিটার হতে পারে।
একে টর্নেডো বলি কেন ? কমলা বললেন।
টর্নেডো শব্দটি এসেছে স্প্যানিশ Tornado মানে Thunder Storm বা বজ্রঝড় থেকে। কালবৈশাখী ঝড়ের সময় দেখো খুব বজ্রপাত হয়।
হ্যাঁ, আমাদের দেশে প্রতিবছর বজ্রপাতে বেশ কয়েকজন লোক মারা যায়, বললো রেখা।
তবে ঝড় সম্পর্কে নজরুলের খুব সুন্দর কবিতা আছে— আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস, আমি মহা প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
গানও আছে নজরুলের, বললেন কমলা। নাচে ওই কাল বোশেখী, দেরে দেখি...
হ্যাঁ, নজরুল-রবীন্দ্রনাথ সবাই ঝড়ের শক্তিকে সাহিত্যের প্রেরণায় কাজে লাগিয়েছেন।
কিন্তু তুমি তো আবার বলবে এটি ফিজিক্স, কমলা হাসলেন। হ্যাঁ, এটি ফিজিক্সেরও অংশ। ফিজিক্সের যে শাখায় এগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয় এর নাম মেটিওরোলোজি (Meteorology) বা আবহাওয়াবিদ্যা। রেখা একটা গান গা তো মা।
রেখা গান ধরলো— ওরে ঝড় নেমে আয়, আয়রে আমার শুকনো পাতার ডালে।
