খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে চট্টগ্রাম-হাতিয়া নৌ-রুট। ষাটের দশকের কেনা তিনটি জাহাজ অনেক আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। জোড়াতালি দিয়েই কোনভাবে সার্ভিস চালু রাখা হয়েছে। যাত্রাপথের মাঝখানে বিকল হয়ে পড়ছে জাহাজ। সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের।
আড়াই ঘন্টার যাত্রায় প্রয়োজন হচ্ছে ৪/৫ ঘন্টা। যাত্রী উঠা-নামার ঘাটগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় জাহাজ ঘাটে পৌঁছতে পারছে না। লাভজনক এই নৌপথটি আধুনিকায়নের জন্য গৃহীত সকল প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি’র কর্মকর্তারা জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় লাভজনক এই রুটের উন্নয়নের সবকিছু বাধাগ্রস্ত করছে। বর্তমানে জরাজীর্ণ জাহাজে সার্ভিস দিয়ে মাসে ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টাকা আয় হচ্ছে।
একসময় চট্টগ্রামের সদরঘাট থেকে বরিশাল পর্যন্ত নৌ-সার্ভিস চালু ছিল। এখন চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপ হয়ে হাতিয়া পর্যন্ত নৌ সার্ভিস চালু রয়েছে। জরাজীর্ণ জাহাজে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে দুর্ভোগের ফলে যাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। পণ্য পরিবহন অনেক কমে গেছে। এই রুটে বর্তমানে ৩টি জাহাজ চালু রয়েছে। জাহাজগুলো ৬০ দশকের সময়ে কেনা হয়েছে। জরাজীর্ণ জাহাজগুলো এখন বিআইডব্লিউটিসি’র বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেরামতের পেছনে প্রচুর টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে আবার বিকল হয়ে পড়ে। মেরামতের নামে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। জাহাজ তিনটি হচ্ছে ‘এমভি বার আউলিয়া’, ‘এমভি আবদুল মতিন’ ও ‘এমভি মনিরুল হক’।
উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নৌপথই ভরসা। যাত্রীরা পণ্য সামগ্রী নিয়ে সহজে বাড়িতে পৌঁছতে পারে। এতে খরচও কম হয়। চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপ যেতে জনপ্রতি ভাড়া ১৫০ টাকা। হাতিয়ার ভাড়া ৩৫০ ও ২৫০ টাকা। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর পছন্দের যাত্রাপথ এখন চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোগান্তির কারণে যাত্রীর পরিমাণ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। যারা একেবারে নিরুপায় তারাই যেতে বাধ্য হচ্ছে। আড়াই ঘন্টার যাত্রায় প্রায় ৪/৫ ঘন্টার সময় লাগছে।
পুরনো জাহাজগুলোতে লাগানো হয়েছে ভলভো ইঞ্জিন। এসব ইঞ্জিন চালানোর মতো প্রশিক্ষিত জনবল নেই। পরিচালনা সম্পূর্ণ কম্পিউটারাইজ্ড। কিন্তু এ ধরনের প্রশিক্ষিত চালক না থাকায় জাহাজ চালানোর ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ইঞ্জিনগুলো স্থাপনের সময় বিআইডব্লিউটিসির জনবলকে প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। জাহাজগুলোর সরঞ্জাম বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে জাহাজ মেরামতে সরঞ্জাম নিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আবার মেরামতের জন্য অর্থ বরাদ্দ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে সময়ক্ষেপণ ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে স্থানীয় কর্মকর্তাদের।
চট্টগ্রাম থেকে হাতিয়া রুটে সপ্তাহে চারদিন ও সন্দ্বীপ রুটে একদিন সার্ভিস চলাচল করে। জাহাজগুলোতে যাত্রীর ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ জন। পণ্য পরিবহনের ধারণক্ষমতা থাকলে প্রতিযাত্রায় ১৫/২০ টনের বেশি হয় না। সন্দ্বীপ ঘাট এলাকায় পলি জমে দীর্ঘ পথ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে ভাটার সময় যাত্রীদের ঘাট থেকে অনেক দূরে নেমে যেতে হয়। ফলে ছোট শিশু ও পণ্য নিয়ে যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। হাতিয়া ঘাটে পলি জমে একই সমস্যার সৃষ্টি করেছে। ঘাটগুলো খনন নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লেখালেখি হলেও তা আমলে নিচ্ছে না তারা।
জরাজীর্ণ সার্ভিস দিয়ে মাসে এই রুট থেকে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা আয় হচ্ছে। খরচ বাদ দিয়ে মাসে ২০/২৫ লাখ টাকা লাভ করা যায়। রুটে নতুন জাহাজ চালু ও খনন করে নিরাপদ ও দ্রুত যাত্রী সেবা প্রদান করা গেলে বছরের বিপুল পরিমাণ আয় হতো। এ প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিসি’র চীফ প্ল্যানিং ম্যানেজার জেসমিন আরা ইত্তেফাককে বলেন, ‘চট্টগ্রাম-হাতিয়া রুটে নতুন দু’টি জাহাজ কেনার জন্য প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে জাহাজ ক্রয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। রুটটিতে আধুনিক ফেরি সংযুক্ত নৌ যাত্রী সার্ভিস চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
