এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফাইনালের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এমন সম্ভাবনা সামনে রেখে ব্রাসিলিয়ার মানে গ্যারিঞ্চা স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হয়েছিল আলেসান্দ্রো সাবেলার দল। শেষ আটের এই লড়াই উপলক্ষে আর্জেন্টিনা সমর্থকে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়া।
ফুটবলে উন্মাদনার সঙ্গে মানিয়ে আর্জেন্টিনার ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ স্বাগতিক ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়া কর্তৃপক্ষ পার্কগুলোতে নানা ব্যবস্থা নিয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ শাওয়ার, নিরাপদ পায়খানা নির্মাণ, খাবার পানি সরবরাহ এবং জায়ান্ট স্ক্রিন বসিয়েছে। আর্জেন্টিনা-বেলজিয়াম ম্যাচ উপলক্ষে আগত আর্জেন্টাইন ভক্তদের জায়গা করে দিতে রাজধানী ব্রাসিলিয়ার উত্তরদিকে প্রদর্শনীমূলক পার্ক নির্মাণও করা হয়েছে। এখানে ১০ হাজারের মতো সমর্থক ভ্রমণ করতে পারবে।
বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে মুখোমুখি হতে হলে আরও কিছু কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এরই মধ্যে শুক্রবার কলম্বিয়ার বিপক্ষে চোট পেয়ে ব্রাজিল তারকা নেইমারের বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে। সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে মুখোমুখি হওয়ার আগে দলের তারকা খেলোয়াড়ের এই চোট চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বাগতিক ব্রাজিলের। সেমিতে জার্মানিকে হারাতে পারলেই নিজেদের মাঠে শিরোপা জয়ের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ফাইনালে ব্রাজিলের সঙ্গী হওয়ার পথে গতকাল পর্যন্ত আরও দুই ধাপ বাকি ছিল আর্জেন্টিনার জন্য। বেলজিয়ামকে কোয়ার্টার ফাইনালে হারাতে পারলে সেমিফাইনালে সাবেলার শীষ্যদের রাতে নেদারল্যান্ডস-কোস্টারিকা মধ্যকার রাতের অপর ম্যাচে বিজয়ী দলের মুখোমুখি হতে হবে। শেষ চারে নিজ নিজ ম্যাচে জয় পেলে প্রথমবারের মতো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মধ্যকার ধ্রুপদী এক লড়াই দেখবে ফুটবল বিশ্ব!
এমন সম্ভাবনার আগে বেশ রোমাঞ্চিত আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থকরা। ফেডারিকো ব্রান্দোলিনি নামের ২৩ বছর বয়সী এক আর্জেন্টাইন শিক্ষার্থী চিত্কার করে বলেন, ‘আর্জেন্টিনা ফাইনালে যাবে এবং বিশ্বকাপ জিতবে।’ ব্রান্দোলিনির সঙ্গে থাকা ব্রাজিলিয়ান বন্ধু ২১ বছর বয়সী মরোনি কাভেস বলেন, ‘তারা মনে করে তারা ফাইনালের পথে আছে। কিন্তু আমি মনে করি, আর্জেন্টিনা বেলজিয়াম বাধাই পেরোতে পারবে না।’ নেইমারের ছিটকে পড়া এবং সেমিফাইনালে থিয়াগো সিলভা না খেলতে পারলেও ব্রাজিলই চ্যাম্পিয়ন হবে বলে মনে করেন ব্রাজিলিয়ান সমর্থক কাভেস।
বেশ কয়েক বছর ধরে ব্রাজিলে অবস্থান করা বুয়েন্স আয়ারস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক রাউল বেরনাল মেজ্জা বলেন, ‘আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল প্রত্যেকেই নিজেদের দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের শ্রেষ্ঠ মনে করে। আর এটাই দল দু’টিকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর্জেন্টাইনরা চায় ব্রাজিল হারুক, আবার ব্রাজিলিয়ানরা চায় আর্জেন্টিনা হারুক।’
সেরা ফুটবলারের ব্যাপারেও দুই দেশের সমর্থকরা নিজ নিজ অবস্থানে অটল। ব্রাজিলিয়ানরা পেলেকে সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার দাবি করে, পক্ষান্তরে আর্জেন্টাইনরা সেরা ফুটবলার বলে দাবি করে ম্যারাডোনাকে। দুই দেশের সমর্থকদের এই তর্কটা আছে বর্তমান তারকা লিওনেল মেসি এবং নেইমারকে ঘিরেও।
গত ১৯টি বিশ্বকাপের মধ্যে সাতবারই শিরোপা জিতেছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। দল দু’টি প্রথম প্রীতিম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ১৯১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। লড়াইয়ে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। এর এক সপ্তাহ পরেই দু’দলের প্রথম অফিশিয়াল ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে কোপা রোকা শিরোপা জেতে ব্রাজিল।
আর্জেন্টিনা সর্বশেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে ১৯৯০ সালের আসরে। ফাইনালে জার্মানির কাছে হারতে হয়েছিল তাদের। কিন্তু বিশ্বকাপে সাফল্যে ১৯৭৮ ও ’৮৬ তে বিশ্বকাপ জয়ী আর্জেন্টিনার চেয়ে অনেক এগিয়ে ব্রাজিল। ১৯৫৮, ’৬২, ’৭০, ’৯৪ এবং ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জেতে তারা।
পার্শ্ববর্তী দেশ স্বাগতিক হওয়ায় এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের ম্যাচগুলোতে ব্যাপক সমর্থক পাচ্ছেন। রিও ডি জেনেরিও এবং পর্তো অ্যালগ্রিতে দলটির ম্যাচে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। ব্রাসিলিয়ায়ও ব্যাপক সংখ্যক আর্জেন্টাইন ভক্তের সমাগম হয়েছে। অ্যাম্বাসির ধারণা চল্লিশ হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থক এখন ব্রাজিলে কিন্তু পুলিশ বলছে ৬০ হাজার সমর্থকের কথা। তাদের সামাল দিতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা হাতে দিয়েছে ব্রাজিল কর্তৃপক্ষ। তিন হাজারেরও বেশি পুলিশ প্রস্তুত রাখছে তারা। আর্জেন্টাইন হুলিগানদের ঠেকাতে বিমানন্দরগুলোতে সর্বোচ্চ নজরদারি বসিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
