কেন্দ্রীয়ভাবে গঠিত উচ্চ ক্ষমতার একটি কমিটির মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশসহ ডিসিদের ৩০৭টি প্রস্তাব এবারের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে উত্থাপনের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে পরিচালনা পরিষদের হাতে এ নিয়োগের ক্ষমতা থাকায় গত কয়েক দশকে শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয় প্রাধান্য পেয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগও উঠেছে প্রবলভাবে। এমন অভিমত দিয়ে ডিসিরা বলছেন, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন জরুরি।
আগামী ৮ থেকে ১০ জুলাই এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে এর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এ সম্মেলন। এতে সকল সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা অংশ নেবেন।
ডিসিদের প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩২ বছর, গণকর্মচারী (অবসর) আইন ১৯৭৪-এর ৯ (২) ধারা অনুযায়ী ২৫ বছর চাকরিজীবন পূরণ করার পর স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের সময়সীমা ২০ বছর করা। এ ছাড়াও প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে কর্মজীবী বাবার জন্য ১৫ দিন পিতৃত্বকালীন ছুটি, প্রতিটি পুলিশ স্টেশনে অনলাইন জিডি এন্ট্রি সিস্টেম চালু করা ও খাদ্যে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
তিন দিনের সম্মেলনে ২৪ টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম দিন ৭, দ্বিতীয় দিন ৯ ও তৃতীয় দিন ৮টি অধিবেশন হবে। ৩০৭ টি প্রস্তাবের মধ্যে বেশি প্রস্তাব হচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত, যার সংখ্যা হচ্ছে ৩৮। এর পরে রয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়, যার সংখ্যা হচ্ছে ৩৫। পরে রয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, যার সংখ্যা ২৭টি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
৩৮টি প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাসিক আপ্যায়ন ভাতা বরাদ্দ, সার্কিট হাউসে ভিআইপিদের আবাসন সুবিধা, গাড়ির জন্য জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি, সরকারি কর্মচারীদের জন্য চিকিত্সা বীমা চালু, সরকারি কর্মকর্তাদের হাজিরা পদ্ধতি ডিজিটালে প্রবর্তন, জেলা প্রশাসকদের রেকর্ড কক্ষে সংরক্ষিত সব রেকর্ড ও খতিয়ান কম্পিউটারাইজ করা, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে বরাদ্দ দেয়া, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা, কর্মজীবী বাবার জন্য ১৫ দিন পিতৃত্বকালীন ছুটি প্রদানের বিধান করা, ভূমি প্রশাসনে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের পদবি পরিবর্তন করা।
স্থানীয় সরকার বিভাগ
এ বিভাগের প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পৌরসভা সচিবদের নিয়োগ-বদলি ও শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বিভাগীয় কমিশনারের ওপর ন্যস্ত করা, ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের জনস্বার্থবিরোধী কার্যক্রমের জন্য বরখাস্ত করার এখতিয়ার বিভাগীয় কমিশনারের ওপর ন্যস্ত করা, প্রথম শ্রেণির পৌরসভার ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনার ও অন্যান্য শ্রেণির পৌরসভার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসককে কর্মচারী নিয়োগ ও বদলি ক্ষমতা দেয়া। এসব ক্ষমতা এখন মন্ত্রণালয়ের হাতে রয়েছে।
তথ্য মন্ত্রণালয়
৩টি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে: ক্যাব্ল টেলিভিশন নেট্ওয়ার্ক লাইসেন্সিংয়ের মতো ক্ষমতা জেলা প্রশাসকদের দেয়া, রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত হানে এমন কোনও বিষয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে পত্রিকাটির ডিক্লারেশন বাতিলের ক্ষমতা এবং ঘোষণাপত্রের ফি বাড়ানো।
ভূমি মন্ত্রণালয়
ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রেকর্ড কক্ষ নির্মাণ বা সংস্কার করা, বালুমহাল নীতিমালা সংশোধন করা, জরিপ শুরুর ৫ বছরের মধ্যে নির্ভুল রেকর্ড প্রকাশ খতিয়ানের সত্যায়িত কপি সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস থেকে সরবরাহ করার বিধান রাখা, নতুনভাবে সিএস ও এসএ ভলিউম সরবরাহের ব্যবস্থা করা, উপজেলা ভূমি অফিসে পৃথক সার্ভার স্থাপন করা, ভূমি জরিপ, ভূমি রেজিস্ট্রেশন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা এ ৩টি বিভাগকে একই মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনে আনা, সরকারি সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থবরাদ্দ দেয়া।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
১৩টি প্রস্তাবের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রত্যেক থানায় অনলাইন জিডি এন্ট্রি সিস্টেম চালু করা, সীমান্তে নজরদারি ও তদারকি বাড়ানো, বিজিবির জনবল বাড়ানো, সীমান্ত এলাকায় ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, মোবাইল কোর্ট আইনে দণ্ডবিধির কয়েকটি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা, প্রত্যেক জেলায় জেলা ট্রেজারির জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা ও আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদানের প্রয়োজনীয় সব তথ্যসংবলিত পাসপোর্ট আকৃতির বই সরবরাহের ব্যবস্থা করা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়
১৩টি প্রস্তাবের উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পাঠ্যপুস্তক সংরক্ষণের জন্য প্রতি উপজেলায় একটি ভবন নির্মাণ, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা, দুর্গম ও হাওড় অঞ্চলে মাধ্যমিক পর্যায়ের যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ মহিলা কোটার বাধ্যবাধকতা শিথিল করা।
আইন মন্ত্রণালয়
৪টি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে জিপি ও পিপি নিয়োগ এবং তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা, পাশাপাশি তাদের সহযোগিতার জন্য সহকারী নিয়োগ করা, সরকার পে মামলা পরিচালনা ও আপিল দায়ের করার জন্য কোর্ট ফি বাবদ প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেয়া।
রেলপথ মন্ত্রণালয়
প্রস্তাবের মধ্যে কুমিল্লা-ঢাকা শাট্ল ট্রেন সার্ভিস চালু করা এবং ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব পর্যন্ত রেললাইন ডাবল করা ও কমিউটার ট্রেন চালু করা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
৩টি প্রস্তাবের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সব জেলায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অফিস নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেয়া এবং অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে ঘোষিত সব পণ্যসামগ্রীর লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন ফি’র হার নির্ধারণ করা।
