পদ্মা-যমুনায় ভাঙ্গন

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৭
পদ্মা ও যমুনা নদীতে তীব্র ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়েছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে রাজবাড়ী শহর রক্ষা বাঁধ। বিলীন হচ্ছে টাঙ্গাইলের দুই গ্রাম। এছাড়া মানিকগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা গিলে খাচ্ছে নদী। রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের গাফিলতির কারণে নদী সংরক্ষণের টাকা ফেরত যাওয়ায় এবার শহর রক্ষা বাঁধ হুমকির মধ্যে পড়েছে। একশ’ মিটার নদী সংরক্ষণের কাজ না করায় আশপাশের কয়েক জায়গায় নতুন করে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়নের পাকুরিয়া (লালগোলা) এলাকায় নদী ভাঙ্গন দেখা দেয়ায় গত শনিবার জেলা প্রশাসক, উপজেলা চেয়ারম্যান, স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যানগণ এলাকাটি পরিদর্শন করেন। এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, লালগোলা হাটের উত্তরে পদ্মা নদীতে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। বাড়ির গাছ কেটে সরিয়ে নিচ্ছেন মালিকরা। এলাকাবাসী জানান, দু’তিন দিনের মধ্যে কয়েকশ’ মিটার এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে। ফলে নদী এখন শহর রক্ষা বাঁধের ৩০/৪০ মিটার দূরে। একইভাবে একটু ভাটিতে পশ্চিম উড়াকান্দা দেওয়ান বাড়ি এলাকায় দুশ’ মিটার এলাকা জুড়ে নদী ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। এখানে একটি গোরস্থান নদীতে চলে গেছে। একটি প্রাচীন প্রাথমিক বিদ্যালয় যে কোন সময় নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লালগোলা এলাকার নদী ভাঙ্গন কবলিত ঝুঁকিপূর্ণ একশ’ মিটার নদী তীর সংরক্ষণ কাজের জন্য ২০১১-২০১২ অর্থ বছর ২৯ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। কার্যাদেশও দেয়া হয়। কিন্তু সরকার দলীয় ঠিকাদার সে কাজ না করায় টাকা ফেরত যায়। দু’বছর নদী ভাঙ্গন না থাকায় এলাকাবাসী আশংকামুক্ত ছিলো। কিন্তু এবার নতুন করে ভাঙ্গন দেখা দেওয়ায় এ এলাকার মানুষ আতংকিত হয়ে পড়েছে। এই এলাকার হাটবাজার, বাড়িঘর, স্কুল-মাদ্রাসা ও ফসলী জমি নদীতে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী লুত্ফর রহমান জানিয়েছেন, গত ৩ জুলাই থেকে এ ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েক মিটার এলাকা নদী গর্ভে চলে গেছে। বর্তমানে নদী থেকে রাজবাড়ী শহর রক্ষা বাঁধ মাত্র ৫০ মিটার দূরে রয়েছে। দ্রুত ভাঙ্গন রোধের জন্য বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম খান জানান, নদী ভাঙ্গন এলাকার পরিদর্শন শেষে শনিবার একশ’ মিটার নদী পাড় সংরক্ষণ কাজ জরুরি ভাবে করার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে পত্র দেয়া হয়েছে। গোপালপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, যমুনার নজীরবিহীন ভাঙ্গনে শতাব্দী প্রাচীন ৪টি গ্রাম গোপালপুর উপজেলার মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম শাখারিয়া ও চক ভরুয়া ইতিমধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। চর সোনামুই অর্ধেক নিমজ্জিত হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে চক সোনামুইও নদী গর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। চক সোনামুই গ্রামের ছানোয়ার হোসেন জানান, তারাকান্তি- ভুয়াপুর যমুনা বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নির্মাণের সময় এসব গ্রামকে বাঁধের বাইরে রাখা হয়। বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মিত হলে যমুনার মূল স্রোত ধারা পূর্ব দিকে সরে গিয়ে এসব গ্রামে হানা দেয়। বিগত দশ দিনের ভাঙ্গনে গ্রাম দুটির সহস্রাধিক একর আবাদী জমি, পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়েছে। স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, দোকানপাট কিছুই রেহাই পায়নি। নিম্নবিত্ত চাষীরা কৃষি ব্যাঙ্কের ঋণে ৫শ’ একর জমিতে গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদ করেছিল। তা-ও যমুনা গ্রাস করেছে। ক্ষতিগ্রস্তরা বর্তমানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অনেক পরিবার পানিবন্দী। ঘরে খাবার নেই। উপজেলা চেয়ারম্যান ইউনুস ইসলাম তালুকদার জানান, লাগাতার বৃষ্টি জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। বরাদ্দের অভাবে নিঃস্ব মানুষের মধ্যে ন্যূনতম ত্রাণ সামগ্রীও বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জাফরগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বিতল ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও পাশের এলাকা যমুনার ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে। এর নিকটবর্তী জাফরগঞ্জ বাজার, গোয়ারিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় দ্বিতল ভবনসহ গোটা এলাকা ভয়াবহ ভাঙ্গনের মুখে পড়ায় জনমনে দারুণ আতংক বিরাজ করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জাফরগঞ্জ বাজারসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার ভাঙ্গন রোধে ইতিপূর্বে কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে ‘জিও ব্যাগ’ ফেলা হয়েছে। তা সত্ত্বেও যমুনার ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ সাপেক্ষে আরো ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।