উত্তেজনা কিংবা মানের বিচারে গত শনিবার রাতের দুইটি কোয়ার্টার ফাইনালের অবস্থান ছিল দুই বিপরীত মেরুতে। তবে দুই ক্ষেত্রেই শ্রেয়তর দুই দলই জয় পেয়েছে। রাতের প্রথম ম্যাচে সুদীর্ঘ দুই যুগের সেমিফাইনাল বন্ধাত্ব ঘুচিয়েছে আর্জেন্টিনা। আর দ্বিতীয়টিতে টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচে কোস্টারিকাকে হারিয়ে সেমিতে তাদের সঙ্গী হয়েছে নেদারল্যান্ডস। ব্রাজিল-জার্মানির পর ফাইনালে যাওয়ার আরেকটি ইউরোপ-লাতিন লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে দুইদল।
তবে এই ম্যাচকে আমি দেখছি একটু ভিন্নভাবে। আর্জেন্টিনার দলগত সাফল্যের পাশাপাশি ম্যাচটা বিশেষ কিছু হয়ে উঠেছে লিওনেল মেসির জন্য। বিশ্বকাপ স্বপ্ন পূরণের আরেকটু কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন মেসি। তবে একই কথা প্রযোজ্য ডাচদের ক্ষেত্রেও। আর্জেন্টিনার জন্য শিরোপার অপেক্ষা যদি হয় দুই যুগের, ডাচদের ক্ষেত্রে সেটা এক শতাব্দীর। কোয়ার্টার ফাইনালে আরিয়েন রোবেন-ওয়েসলি স্নাইডারদের পারফরম্যান্স অবশ্য বলছে, এবার সেই অপেক্ষার অবসান হতে পারে।
গত কয়েক বছর ধরেই সর্বকালের সেরা প্রশ্নে পেলে-ম্যারাডোনার পাশাপাশি উচ্চারিত হচ্ছে মেসির নামও। যদিও, ফুটবল প্রেমী মাত্রই জানেন অর্জনের বিচারে এখনো সাবেক ঐ দুই খেলোয়াড়ের চাইতে বেশ পিছিয়ে আছেন মেসি। আরো স্পষ্ট করে বললে, জাতীয় দলের হয়ে এখনো বিশ্বকাপ জেতার বাকি মেসির। যেটা কিনা তাকে পিছিয়ে রাখছে পেলে-ম্যারাডোনার চাইতে। তবে এটা যৌক্তিকও বটে। কেবল ক্লাব সাফল্য কোন খেলোয়াড়কে সর্বকালের সেরায় পরিণত করতে পারে না। কারণ ক্লাবে আপনার সুযোগ থাকে আপনার কাঙ্ক্ষিত একাদশ নির্মাণের। সুতরাং আপনি যত প্রতিভাবান হোন না কেন ক্লাবের সাফল্যই কখনো চূড়ান্ত সার্টিফিকেট হতে পারে না।
বিভিন্ন সাক্ষাত্কারে মেসি নিজেও সেটা স্বীকার করেছেন। তাছাড়া, বিশ্বকাপ জেতা যে কোন সাধারণ ফুটবলারের চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে। সেই তুলনায় মেসি তো অনেক বড় নাম। এ যুগের সেরা হিসাবে বহু আগেই সে নিজেকে প্রমাণ করেছে। এবার তার সামনে সুযোগ সর্বকালের সেরা হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করার।
শিরোপার এত কাছে এসে নিশ্চয়ই খালি হাতে ফিরতে চাইবেন না মেসিও। আমি নিশ্চিত ডাচদের বিরুদ্ধে আরো উজ্জীবিত করে তুলবে মেসিকে। এটা আর্জেন্টিনার জন্যও খুব প্রয়োজন। কারণ, আলবাসিলিস্তারা এখন পর্যন্ত যে রকম খেলছে, সেটা তাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ প্রকাশ নয়। মেসি হয়তো তার সেরাফর্মেই আছেন, তবে তার সতীর্থদের প্রসঙ্গে এ কথা বলা চলে না।
প্রথম চারটি ম্যাচের মতোই এ ম্যাচেও আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স সমর্থকদের মন ভরাতে পারেনি। নক আউট রাউন্ডে সব দলই ফল নির্ভর খেলা খেলতে চাইবে, সেটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু, একটি দল যখন হঠাত্ করেই তাদের প্রথাগত কৌশলের বিরুদ্ধে খেলবে, তখন সেটা আপনার চোখে লাগবেই। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক তাই। আমরা কখনোই এই দলটিকে অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হতে দেখিনি। অথচ, প্রথমে গোল পেয়ে যাওয়ার পরে আর্জেন্টিনাকে দেখে অবাক হতে হয়েছে। মাত্র এক গোলের ব্যবধানকে পুঁজি করে রক্ষণাত্মক খেলা একটু অতিরিক্ত ঝুঁকি বলেও মনে হয়েছে আমার।
জয় নয় এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় পাওনা গঞ্জালো হিগুইন। শুরু থেকে নিজেকে হারিয়ে খোঁজা এই স্ট্রাইকার অবশেষে নিজের সেরা ঝলকের কিছুটা হলেও দেখাতে পেরেছেন। সেমিফাইনালে ডাচ বাধা পেরোতে চাইলে মেসির পাশাপাশি এই ফর্মটাকে ধরে রাখতে হবে তারও। কারণ, আর্জেন্টিনা ইতোমধ্যে দলের অন্যতম সেরা তারকা অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়াকে হারিয়েছে ঐ ম্যাচের জন্য।
আর্জেন্টিনা-বেলজিয়াম ম্যাচটা ততটা উত্তেজনাপূর্ণ না হলেও এর ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে নেদারল্যান্ডস-কোস্টারিকা ম্যাচ। টান টান উত্তেজনা, আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ, রোবেন-স্নাইডারদের সাথে কোস্টারিকা গোলরক্ষক নাভাসের লড়াই; কি ছিলো না এই ম্যাচে! টাইব্রেকারে গড়ালেও শেষ পর্যন্ত শ্রেয়তর দল হিসাবেই জিতেছে ডাচরা।
তবে এই ম্যাচের সেরা তারকা যদি আমাকে বেছে নিতে বলা হয়, আমি বলবো ডাচ কোচ লুইস ফন গলের কথা। গলের টেকনিকটা ছিল অতুলনীয়। নির্ধারিত সময়ে যখন ফল হলো না, তখন অতিরিক্ত সময়ের কথা ভেবে একজন ডিফেন্ডার পাল্টে স্ট্রাইকারকে নামালেন তিনি। সামনেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিতে যাওয়া এই কোচের চিন্তাধারাটা ছিল পরিষ্কার, ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে না দেয়া। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় শেষে যখন টাইব্রেকারে গড়াল, তখন দেখা গেল সেটাও আগেই ভেবে রেখেছিলেন ফন গল! খেলার ১২০ তম মিনিটে তৃতীয় এবং শেষ বদলীর সুযোগটা কাজে লাগালেন তিনি এবং বদলী গোলরক্ষক টিম ক্রুল গড়ে দিলেন খেলার ভাগ্য।
সব দিক থেকে আমি বলবো, টান টান উত্তেজনাপূর্ণ একটি সেমিফাইনাল অপেক্ষা করছে সবার জন্য।
