এক সময় যে সব নারী সংসারের কাজ-কর্ম সেরে দিনের বেশির ভাগ সময় ঘরে বসে থাকতেন। কিংবা প্রতিবেশীদের সাথে গল্প-গুজবে সময় কাটাতেন। আজ তারা টুপি সেলাইয়ের কাজে এতোটাই ব্যস্ত যে করো সাথে কথা বলার সময়টুকুও পান না। তবে এই ব্যস্ততা এখন ঈদের আগে আরো বেড়ে গেছে। এই কাজে শুধু গৃহবধূরাই ব্যস্ত নন, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়েরাও লেখাপড়ার পাশাপাশি টুপি সেলাইয়ের কাজ করছেন। বগুড়ার ধুনট উপজেলার চিত্র এটি।
সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামীণ নারীরা সবাই টুপি সেলাই করায় ব্যস্ত। তাদের হাতে তৈরি করা এই টুপি দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রির পাশাপাশি রপ্তানি হচ্ছে সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে। এ উপজেলার ২১৫ টি গ্রামের প্রায় ৭৫ হাজার নারী টুপি সেলাই করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। পুরুষের পাশাপাশি বাড়তি আয় করে তারা সংসারে সহযোগিতা করছেন। এছাড়া স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়েরা টুপি সেলাই করে তাদের লেখাপড়ার খরচ যোগাচ্ছেন। উপজেলার প্রায় সবগুলো গ্রামেই এখন টুপি তৈরির কাজ চলছে। উপজেলার চৌকিবাড়ী গ্রামের গৃহবধূ মোমেনা খাতুন জানান, ‘ছেলের বাবার একলার কামাই দিয়া আগে আমাগোরে খুব কষ্টে দিন যাচ্ছিল। কিন্তু এখন আর আমাগোরে তেমন কোন কষ্ট করতে হচ্ছে না।’ মোমেনা খাতুন ৫/৬ বছর আগে টুপি সেলাই শুরু করেন। ঘরের কাজ শেষে দিনের যে টুকু সময় পায় সেই সময়েই দৈনিক ৩/৪ টা টুপি সেলাই করতে পারেন। তিনি জানান, টুপি বিক্রি করতে কোন হাট-বাজারে যেতে হয় না। বাড়ি থেকেই পাইকাররা এসে প্রতি সপ্তাহে টুপি কিনে নিয়ে যান। সব খরচ বাদে তার প্রতিমাসে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা বাড়তি আয় হয়।
একই গ্রামের রাশেদা খাতুন জানান, আগে হাত খরচের জন্য ৫/১০ টাকা স্বামীর কাছ থেকে চেয়ে নিতে হতো। অভাবের সংসারে স্বামী কোন কোন দিন ৫ টাকাই দিতে পারতেন না। কিন্তু যখন থেকে তিনি টুপি সেলাই শুরু করেছেন তখন থেকে আর কারো কাছে টাকার জন্য হাত পাততে হয় না। তিনি প্রতি মাসে প্রায় তিন হাজার টাকার টুপি বিক্রি করেন। শুধু মোমেনা ও রাশেদা খাতুনই নন, তাদের মতো ওই গ্রামের গৃহবধূ লাকি, সনি, কুলসুম, রানু, পারুলসহ আরো অনেকেই টুপি সেলাই ও বিক্রি করে এখন স্বাবলম্বী।
চৌকিবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সাথী খাতুন। সে লেখাপড়ার পাশাপাশি মায়ের কাছে টুপি সেলাই করার কাজ শিখেছে। সে-ও প্রতিমাসে ৩০ টি টুপি সেলাই করতে পারে। এখন তার প্রতি মাসে ৫/৬শ’ টাকা আয় হয়। তার লেখাপড়ার খরচ বাবা- মার কাছ থেকে নিতে হয় না।
উপজেলার ধেরুয়াহাটি গ্রামের আদিবাসী নিবারণ চন্দ্রের মেয়ে রত্না রায় টুপি সেলাইয়ের টাকা দিয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি গত বছর মথুরাপুর জিএমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন। টুপি সেলাই কাজে ব্যস্ত নারীরা জানান, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার সময়ে টুপির চাহিদা বেশী হওয়ার কারণে ঈদের আগে তারা টুপি সেলাইয়ের কাজে বেশি সময় ব্যয় করেন।
জানা গেছে, গ্রামের নারীদের টুপি সেলাইয়ের কাজে কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহূত হয় সুতা ও ক্রুস কাঁটা। পাইকাররা ২৫ টাকায় ক্রুস কাঁটা এবং ৫০ থেকে ১০০ টাকার সুতা সরবরাহ করেন। কারো টাকা না থাকলে বাকিতে ওই সব কাঁচামাল যোগান দেন তারা। পরবর্তীতে টুপি ক্রয় করার সময় সময় এগুলোর দাম কেটে রেখে বাকি টাকা দেয়া হয়।
চালাপাড়া গ্রামের পাইকারী টুপি ব্যবসায়ী বাচ্চু মিয়া জানান, প্রতি সপ্তাহে গ্রামে গ্রামে গিয়ে সুতা ও ক্রুস কাঁটা সরবরাহ করতে হয়। পরের সপ্তাহে সেলাই করা টুপি কিনে আনি। প্রতিটি টুপির দাম প্রকার ভেদে ২০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত। তিনি আরো জানান, আগে শুধু এক ডিজাইনের টুপি তৈরি হতো। কিন্তু এখন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে টুপির বাহারী নামকরণ হয়েছে। যেমন নব্বইফুল, কলারফুল, বকুলফুল, তালাচাবি, স্টার, গুটি, বিস্কুট, আনারস, মৌচাক ও মাকড়াশার জাল। ডিজাইন ভেদে সবচেয়ে বেশি দাম নব্বইফুল ও আনারস টুপির। নব্বইফুল টুপির দাম ৯০ থেকে ১শ’ টাকা, আনারস টুপি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, মৌচাক ২৮ থেকে ৩০ টাকা, মাকড়াশার জাল ২০ থেকে ২৫ টাকা, বিস্কুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা।
স্থানীয় এসব ব্যবসায়ীরা গ্রামের নারীদের সেলাই করা টুপি কিনে নিয়ে ঢাকার চকবাজার, বাইতুল মোকারম মসজিদ মার্কেটসহ রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে বিক্রি করেন। সেখান থেকে এসব টুপি রপ্তানি হয় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে। ধুনটের নারীদের তৈরি টুপি সেলাই প্রকল্প কার্যত এখন একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ধুনট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার ফর পুওর পিপল্স (ডিসিপি) নামের একটি বেসরকারি সংস্থা টুপি সেলাই প্রকল্পটি তত্ত্বাবধায়ন করছে এবং সহজ শর্তে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করছে।
ডিসিপি’র নির্বাহী পরিচালক এনামুল বারী সরকার জানান, পাইকারদের তুলনায় আমরা কমদামে ভাল সুতা সরবরাহ করি এবং বেশি দামে নারীদের কাছ থেকে টুপি কিনে থাকি। তাছাড়া তাদের নতুন নতুন বিভিন্ন ডিজাইনের টুপি তৈরিসহ কারুশিল্পে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকি।
