বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন নীতিমালায় বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হতে হবে’ উল্লেখ করা হলেও অধিকাংশ উদ্যোক্তাই এটিকে প্রধানত ব্যবসা হিসাবে দেখছেন। এ কারণে কোর্স শেষ না হলেও ‘টিউশন ফি’ আদায়ের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা নেয়া হয়। ব্যয় কমানোর জন্য শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত নন সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কর্মকর্তা বা ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের দিয়ে ক্লাস নেয়া হয়। আর বিভিন্ন উপঢৌকন দিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে ম্যানেজ করে ক্লাস না করা, পরীক্ষা না দিয়ে অংশগ্রহণ দেখানোর মতো ঘটনাও ঘটে। ফলে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার নামে সময় ক্ষেপণই হয়। এ কারণে মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞ শিক্ষকের প্রকট অভাব বিদ্যমান। কোন কোন বিভাগে রয়েছেন একজন মাত্র অধ্যাপক। আবার কোথাও একজন অধ্যাপকও নেই। এই অভাব তারা পূরণ করতে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অর্থের বিনিময়ে পার্টটাইম শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেন। এরা ক্লাস শেষ করেই ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যান, শিক্ষার্থীরা কোন সমস্যার সমাধান পান না তাদের থেকে।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য বলেন, দেশে বর্তমানে ৭৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালু আছে। অন্যদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে ৩৪টি। বিভিন্ন বিভাগে যোগ্য, মানসম্মত শিক্ষক তেমন নেই। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে ৪টি ফ্যাকাল্টি রয়েছে। বিভাগ রয়েছে ৬ থেকে ২০টিরও অধিক। কোন একটি বিভাগ পরিচালনা করার জন্য কমপক্ষে একজন অধ্যাপক, একজন সহযোগী অধ্যাপক, একজন সহকারী অধ্যাপক ও একজন প্রভাষক প্রয়োজন। দেশে বর্তমানে কোন বিষয়ে ৭৯ জন প্রফেসর পাওয়া যাবে না। তাহলে কিভাবে এসব বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্মত শিক্ষাদান করবে !
আবার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন অধিদপ্তরের প্রাক্তন মহাপরিচালক বা উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা ক্লাস নেন। এদের ব্যক্তিজীবনে শিক্ষকতার কোন অভিজ্ঞতাও নেই।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য রয়েছে প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি রয়েছে অথচ অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তা নেই। নেই গবেষণাপত্র এমনকি সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের ব্যবস্থা। কোথাও কোথাও লাইব্রেরি থাকলেও তাতে হাতেগোনা কিছু বই রয়েছে।
পরীক্ষা পদ্ধতি এবং পরীক্ষায় নিরপেক্ষতা ও যথাযথ মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাসে একটি ক্লাসও হয় না। কিন্তু ঠিক চার মাসে সেমিস্টার শেষ হয়। মান থাকবে কীভাবে?
অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ১৯৯২ সালে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়। পরে শিক্ষার্থীদের চাহিদা বিবেচনায় আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যলয় অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু শিক্ষাকে যখন পুরোপুরি ব্যবসা হিসাবে দেখা হয় এবং গণহারে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয় তখনই শিক্ষার নামে বাণিজ্য শুরু হয়। ৭৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হলেও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মানে পিছিয়ে আছে।
সমপ্রতি প্রকাশিত টিআইবির রিপোর্টেও বলা হয়েছে, ক্লাস না করিয়ে, পরীক্ষা না নিয়ে ও ব্যবহারিক ক্লাস (বিশেষায়িত ল্যাব সুবিধা অপর্যাপ্ত) না নিয়ে টাকার বিনিময়ে সার্টিফকেট প্রদান করা হয়। কাগজে-কলমে শিক্ষকের কোটা পূরণ দেখালেও বাস্তবে শিক্ষকের উপস্থিতি থাকে না। গবেষণার জন্য অর্থবরাদ্দ রাখার নিয়ম থাকলেও তা ব্যয় করে না।
ইউজিসির নির্দেশনা অনুসারে ২টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করা নিষিদ্ধ থাকলেও তা না মেনে অধিকসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পৃক্ত থাকাসহ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উপঢৌকন গ্রহণ করে পাস করিয়ে দেয়া, পরীক্ষার পূর্বে প্রশ্ন বলে দেয়া ও সে অনুসারে শ্রেণীকক্ষে পাঠদান করা হয়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষামূল্য ও সার্টিফিকেট মূল্য নেই জেনেও ভর্তি হওয়াসহ সার্টিফিকেট ক্রয়, ভূয়া সার্টিফিকেটের ব্যবহার, শিক্ষকদের নম্বর বাড়িয়ে দেয়া বা পাস করানোর জন্য চাপ প্রয়োগের মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত। এসব প্রসঙ্গ তুলে শিক্ষাবিদরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী ‘ইত্তেফাককে’ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডে এমন সদস্যও আছেন যাদের স্কুল কমিটিতে সদস্য হিসাবে থাকার যোগ্যতা নেই। এছাড়া কিছু ব্যবসায়ীও ট্রাস্টি বোর্ডে সদস্য হয়ে যান। পড়াশোনা বিষয়টি বাদ দিয়ে ব্যবসায়ী মনোভাব থাকায় শিক্ষার মানের দিকে তারা নজর দেন না। তিনি গুণী ব্যক্তিদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে মত দেন।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিবিজেনস ম্যানেজমেন্ট অনুষদের প্রাক্তন ডিন অধ্যাপক গাজী এমএ জলিল বলেন, যারা শিক্ষাকে পুরোপুরি ব্যবসা হিসাবে দেখে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন সেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান নেই। শিক্ষার মানের জন্য প্রয়োজন ভালো শিক্ষক, শিক্ষার পরিবেশ, অবকাঠামো। কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই তিনটি বিষয়ই অনুপস্থিত। শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন ভালো কোর্স, কারিক্যুলাম ও শিক্ষার মান মূল্যায়ন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা না দিয়েই সার্টিফিকেট পেয়ে যায়। তাহলে এ সব শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া শিখতে চাইবে কেন?
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. ছাদেকুল আরেফিন মাতিন বলেন, ইউসিকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। অবকাঠামো শর্ত কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। বিভাগগুলোতে পূর্ণকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। পর্যাপ্ত শিক্ষা সামগ্রীর ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাহলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষার মান উন্নত হবে ও উচ্চশিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় থাকবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আশা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ডালেম চন্দ্র বর্মন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। নেই শিক্ষক। শিক্ষার পরিবেশও নেই-সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ভালো হতে পারে না। শিক্ষার মানে প্রয়োজন শিক্ষা উপকরণ ও ল্যাবরেটরি। কিন্তু বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এগুলো অনুপস্থিত।
টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিতাই চন্দ্র সূত্রধর বলেন, সেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টেক্সটাইল কোর্স চালু করা হয়েছে তাদের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই ল্যাবরেটরি নেই। অথচ টেক্সটাইল বিষয়ের জন্য ল্যাব ছাড়া হবেই না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বছরে তিনটি সেমিস্টার থাকে। ক্লাস, কোর্স শেষ হোক বা না হোক নির্দিষ্ট সময় পরীক্ষা নেয়। এ কারণে শিক্ষার্থীরা কিছুই শিখতে পারে না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে বাকিগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাতারে ফেলা যায় না। এ প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষাকে পুঁজি করে বাণিজ্যিক মনোভাব লালন করে। অধিকাংশেরই কোন ক্লাস, ল্যাব, শিক্ষক নেই। কিভাবে এ সংকটের উত্তরণ করা সম্ভব? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদারকি বাড়াতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের আজকের এ ব্যর্থতার পিছনে কাজ করছে হয় অদক্ষতা, না হলে আর্থিক লেনদেনের বিষয়।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো শামছুল আলম বলেন, কয়েকটি বাদে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় সার্টিফিকেট সর্বস্ব, যাদের কোন গুণগত মান নেই। কীভাবে এ সংকটের উত্তরণ করা যায়? তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভালো করে তদারক করতে হবে, সাথে সাথে তাদের ব্যবসায়িক চিন্তা বাদ দিতে হবে। পাশাপাশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি তদারকি বডি করা যেতে পারে। যারা নিয়মিতভাবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তদারকি করবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদারকি বাড়াতে হবে।
