নবনিযুক্ত কোচ চন্দিকা হাতুরুসিংহের সাথে খারাপ ব্যবহার, জাতীয় দলের হয়ে না খেলার হুমকি ও সাম্প্রতিক সময়ে একজন দর্শককে মারধরের মতো আচরণগত সমস্যার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) জাতীয় অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে ছয় মাসের জন্য সকল ধরনের ক্রিকেটে ছয় মাসের জন্য নিষিদ্ধ করেছে। এছাড়াও আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তার বিদেশে খেলার অনুমতি বাতিল করেছে বোর্ড।
বাংলাদেশ দল এ বছর শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাবে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মিলিয়ে অনুষ্ঠেয় এ সফরে মুশফিকুর রহিমের দল তিনটি ওডিআই, একটি টি-টোয়েন্টি ও দুটি টেস্ট ম্যাচ খেলবে। সাকিব এগুলো তো নয়ই এমনকি নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ঘরোয়া ক্রিকেটেও খেলতে পারবেন না। ফলে বর্তমান শাস্তি বহাল থাকলে আগামী বছর অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের এক মাস আগেই কেবল খেলায় ফিরতে পারবেন।
বিসিবি’র জরুরি সভায় গতকাল সোমবার সর্বসম্মতভাবে এ সিদ্ধান্ত হয়। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এমপি কাল বৈঠক শেষে এ তথ্য জানান। তিনি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, সাকিবের বিষয়টি আমরা বোর্ড মিটিংয়ে বিশদ আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কোচের সাথে ও যে দুর্ব্যবহার করেছে সেটা ও আমার কাছে স্বীকার করেছে। এগুলো তার বলা উচিত হয়নি। ওর ব্যাপারে মাত্র দুই একটি কথাবার্তা পত্রিকায় এসেছে। কিন্তু ও ধারাবাহিক ভাবে সমস্যা করেই যাচ্ছে। বোর্ড মনে করেছে ওর সিরিয়াস আচরণগত সমস্যা রয়েছে। ওর মতো এমন আচরণগত সমস্যা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন কাউকে এর আগে পাইনি। বোর্ড সভায় যারা ছিল তারা বলেছে এর আগে আমরা এরকম কাউকে পাইনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘ও যে শুধু একটা এনওসি ভঙ্গ করে বিদেশে চলে গেল এটাই শেষ নয়। ওর অনেক সমস্যা রয়েছে। সব দেখে আমাদের মনে হয়েছে যে ওর ব্যবহারটা এমন যেটা নাকি আমাদের দলে সরাসরি ইমপ্যাক্ট ফেলছে। তার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক কিছু খেলোয়াড় তাদের মত দেয়া শুরু করেছে। এটা আমাদের ক্রিকেটের জন্য সর্বনাশ ডেকে নিয়ে এসেছে। তাই আমরা মনে করি অবশ্যই তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।’
এ প্রসঙ্গে বোর্ডের দায় নিয়েও কথা বলেন পাপন, ‘এ কাজগুলো তারা এক মাস দুই মাস ধরে করছে তা নয়। ওরা সব সময় করে আসছে। ছোট খাট ভুলত্রুটি করেছে, আমরা ততটা সিরিয়াস ভাবে নেইনি। যেহেতু সে দেশের জন্য মূল্যবান খেলোয়াড়। সেই জন্য অনেককিছুই আমরা এড়িয়ে যাই বিভিন্ন সময়। এড়িয়ে যেতে যেতে এখন এমন অবস্থা হয়েছে, এখন বোর্ড মনে করছে আর কিছুদিন পর এরা আর কাউকেই মানুষ মনে করবে না। এরা সবাই কন্ট্রোলের বাইরে চলে যাচ্ছে। কোচের কথা শোনে না, ক্যাপ্টেনের কথা শোনে না, কারো কথা শোনে না। এই অবস্থাতে আমরা যেটা মনে করি ডিসিপ্লিন ইজ দ্য মাস্ট এবং খেলাধুলাটাই কিন্তু একটা ডিসিপ্লিনের বিষয়।’
বিসিবি প্রধানের মতে ‘যেহেতু সে একজন রোল মডেল। সে যদি এমন একটা খেলোয়াড় হত যে কিনা জাতীয় দলে খেলেছে, কেউ চিনে না তাহলে এক জিনিস। কিন্তু সাকিব আমাদের রোল মডেল। দেশে অ্যাম্বাসেডরের মত। বাংলাদেশকে অনেকে চেনেই সাকিবের মাধ্যমে। এই জন্য আমরা মনে করি এই ধরনের ব্যক্তিদের সুনাম অর্জন করা ভালবাসা পাওয়াটা যেমন সহজ। তেমনি সেটা ধরে রাখার জন্য বেশ পরিশ্রম করতে হবে। সেজন্য আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
ভারতের বিরুদ্ধে সিরিজ চলাকালে দর্শককে পেটানো প্রসঙ্গে বোর্ড সভাপতি বলেন, ‘আপনারা সবাই জানেন ও ড্রেসিংরুম থেকে বের হয়ে গ্যালারিতে গিয়ে দর্শকদের পিটিয়েছে। আমাদের কাছে প্রত্যক্ষদর্শী যারা নাকি সিকিউরিটির লোক ছিল, তারা ওই ছেলেকে ওর কাছ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসলো। তারা বলেছে ও ছেলেটাকে মেরেছে। সাকিব নিজেও ম্যানেজার থেকে শুরু করে অনেকের কাছে বলেছে সে মেরেছে। অথচ সেদিন যখন তাকে হিয়ারিংয়ের জন্য ডাকলাম তখন সে বললো না আমি ওকে মারিনি। তারপরও যখন জানতে চাইলাম তুমি কার অনুমতি নিয়ে ড্রেসিংরুম থেকে বের হলে ও তখন বলল এখন থেকে বের হতে হলে যে কারো অনুমতি লাগে তা আমার জানা ছিল না। এই বিষয়গুলো আমরা যত ছোট ভাবেই দেখি না কেন, বোর্ড মনে করছে এগুলো আরও বেশি অবজ্ঞা। সে কাউকেই তোয়াক্কা করে না। এসব আর প্রশ্রয় দেয়া যায় না।’
সবশেষ পাপন বলেন, ‘আজকে বোর্ড যেটা বলেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটতো সাকিবের জন্য না। সাকিব বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের জন্য। এই জিনিসটাই আমাদের মাথায় রেখে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এজন্য অনেক কঠিন, অত্যন্ত দু:খজনক, অত্যন্ত কষ্টকর সকলের জন্যই কিন্তু আমরা বাধ্য হয়েছি শাস্তিটা দিতে। এমনকি এর পুনরাবৃত্তি ঘটলে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা আছে যে কোন খেলোয়াড়ের। এই ম্যাসেজটাই আপনাদের কাছে দিতে চাই। ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে কোন ছাড় দেয়া হবে না।’
এদিকে জাতীয় দলে পরিবর্তন প্রসঙ্গে বোর্ড সভাপতি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় কিছু পরিবর্তন আসবে। তবে এদিন সাকিবের ইস্যুটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই অন্য বিষয়গুলো আলোচনা করেননি। এর মধ্যেও সিদ্ধান্ত হয়েছে এখন থেকে কোন খেলোয়াড় বিজ্ঞাপন কিংবা বাণিজ্যিক কোন বিষয়ে সম্পৃক্ত হতে হলে বিসিবিকে অবশ্যই জানাতে হবে। তাদের অনুমোদন নিয়েই করতে হবে। প্রতিটি খেলোয়াড়ের কাছে বিসিবি থেকে এ ব্যাপারে চিঠি যাবে।
সাকিবের বিরুদ্ধে ছয় অভিযোগ
১.এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচ চলা অবস্থায় লাইভ ক্যামেরার সামনে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি। ২. একটি দৈনিকে বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর কথাবার্তা বলা। ৩. ভারতের বিপক্ষে গত মাসে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথম খেলায় স্ত্রীকে উত্ত্যক্তকারীদের ওপর চটে গিয়ে ড্রেসিংরুম ছেড়ে গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে গিয়ে তাদের মারধর করা। ৪. ভারতের সঙ্গে ওয়ানডে সিরিজ চলাকালে নিয়ম-রীতির তোয়াক্কা না করে বাকি সহযোগীদের ছাড়া পাঁচ তারকা হোটেলে সস্ত্রীক অন্য ফ্লোরে অবস্থান। ৫. বোর্ডের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি না নিয়ে ক্যারিবীয় প্রিমিয়ার লিগ (সিপিএল) খেলতে যাওয়া ৬. ওয়েস্ট ইন্ডিজের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগের আগে প্রধান কোচ চন্দিকা হাতুরুসিংহের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া এবং টেস্ট ও ওয়ানডে খেলা ছাড়ার হুমকি।
