বাবা একবার একটি রেস্তোরাঁ খুলেছিলেন। ঢাকা রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও আমাদের এলাকা ছিল ছোটখাটো উপজেলা শহরের মত নির্জন। গাছপালা, বন, মাঠ, আমবাগান, লিচুবাগানের মধ্যদিয়ে সরু কাঁচা রাস্তা শহরের দিকে চলে গেছে। ঢাকা শহরে ওরকম রেস্তোরাঁ তখন খুব কমই ছিল। আমাদের এলাকাতে বাবার রেস্তোরাঁ ‘ক্যাফে-ডি-মুমতাজ’ খুবই নাম করে ফেলল। দূর-দূরান্ত থেকে সংস্কৃতিমনা মানুষ সপরিবারে এখানে খেতে আসতেন। আর তরুণদের আড্ডা বসতো ক্যাফে ডি-মুমতাজে।
রেস্তোরাঁয় বাবার ফুটবয় হিসেবে কাজ করত রাজাবক্স নামে ফুটফুটে ও চটপটে একটি কিশোর। ও ছিল একান্ত বাবারই কর্মচারী। রেস্তোরাঁর কোন কাজ বাবা ওকে করতে দিতেন না। চিনতে অসুবিধা না হয় এজন্য বাবা ওকে আলাদা ইউনিফর্ম তৈরি করে দিয়েছিলেন। তবুও ভিড়ের সময়গুলো সামাল দিতে কখনও কখনও ওকে কিছু কাজ করতে হতো। কেউ ওকে ‘পিচ্চি’ বলে— ডেকে ফেললে ও সাথে সাথে কাজ বন্ধ রেখে বাবাকে ডেকে বলত, ‘দেখেন, নানা, ঐজন আমারে ‘পিচ্চি’কইছে।’ মোটকথা ও পিচ্চি ডাক শুনতে পছন্দ করত না। বাবা করিম দর্জিকে দিয়ে একটা নেমপ্লেট বানিয়ে ওতে রঙিন সূতোয় ওর নাম ‘সরতাজ’ লিখে ওর নির্দিষ্ট পোশাকের উপর লটকিয়ে দিলেন। রাজা বক্স এখন ‘হোটেল ডি-মুমতাজে’র সরতাজ। এখন আর কেউ ওকে পিচ্চি ডাকে না। কিন্তু সরতাজের একটা দোষ ছিলো। বলা-নেই কওয়া নেই কোন কোন দিন সে উধাও হয়ে যেত। রাতে হোটেলে ফিরে বাবার পা জড়িয়ে বলতো— নানা স্টেডিয়ামে গিয়েছি, খেলা দেখেছি।
আমাদের বিস্তর জায়গা-জমি তখন পাকিস্তান সরকার হুকুম দখল করে নিয়ে নিল। বসতবাড়ি থেকে আমাদের উচ্ছেদ করে দিল! আমরা অন্য বাড়িতে নতুন করে বসবাস শুরু করলাম। বাবা হোটেল ডি-মুমতাজের ব্যবসা বন্ধ করে জায়গা-জমির বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি অফিসে ব্যস্ত সময় কাটাতে লাগলেন। এ সময়ও বাবার ফুটবয় সরতাজ বাবার সাথে সাথেই থাকত। ওর বাইরের পোশাক হিসেবে হোটেল ডি-মুমতাজের পোশাকটাই ব্যবহার করত। ওর জার্সি দেখে সবাই বাবাকে চিনত। জানত ইনি অভিজাত রেস্তোরাঁ হোটেল ডি-মুমতাজের মালিক ছিলেন। সেই দুঃখের দিনগুলোতে সরতাজ বাবাকে মজার মজার কথা বলে, বাবার সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থেকে বাবার একজন ভীষণ প্রিয়পাত্র হয়ে উঠল। সরতাজ এখন বেশ বড়সড় এক যুবক। বাবা ওকে একটা রিকশা কিনে দিলেন। বাবাকে বহন করা ছাড়াও অবসর সময়ে সে রিকশা চালিয়ে কিছু আয়-রোজগার করতে শুরু করল।
একসময় সে ফুলি নামে একটি মেয়েকে বিয়ে করে ফেলল। হঠাত্ই এমনটি হয়ে গেল। বাবা মনক্ষুণ্ন হলেন। সরতাজ বাবাকে বলে মিরপুরের দিকে অল্প টাকায় ঘরভাড়া নিয়ে আমাদের সঙ্গে বহুদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গেল। আমরাও দুঃখ পেলাম। সরতাজের জন্য ততটা নয় বরং যতটা বাবার নিঃসঙ্গতায় একজন পছন্দের সাথী হিসেবে সরতাজের একটা বিশেষ কদর ছিল আমাদের কাছে তার জন্য।
তারপর আর খোঁজ নেই। সে-ও আসে না। আমরাও খোঁজ করি না। এর মধ্যে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। যুদ্ধের দিনগুলোতে বাবা প্রায়ই সরতাজের কথা বলতেন। দেশ স্বাধীন হবার পর ভাবতেন, কে জানে সরতাজ বেঁচে আছে কি-না!
বহু বছর পর হঠাত্ একদিন রিকশা নিয়ে সরতাজ এসে হাজির। বাবার বয়স হয়েছে। স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে। আমাদের বিশাল বাড়িটা ফাঁকা পড়ে থাকে। বাবাকে দেখে সরতাজ কান্নায় ভেঙে পড়ে। ‘নানা, আপনার এই হাল হইছে, হায়-আল্লাহ ঢাকা শহরেই থাকি তবু একটা দিন আইস্যা আপনের খোঁজ লই নাই। নানা, মাফ কইরা দেন।” বাবা চুপচাপ ছিলেন। সরতাজও খুব ভালো ছিল না। সেই ফুটফুটে চটপটে ভাবটা নেই। বরং বয়সের চেয়ে বেশি বুড়ো দেখাচ্ছে। সরতাজ খাওয়া-দাওয়া করল। থাকল অনেকক্ষণ। বাবাকে জানালো ওর দুই ছেলেমেয়ে। ছেলের নাম ‘আরজিন বক্স’ মেয়ের নাম ‘টিনা’। দু’জনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। থাকে ভিন্ন জেলায়। ফুলীকে ও ভালবাসে আগের মতোই।
ফুলী বায়না ধরেছে, একটা রঙিন টিভি কিনে দিতে হবে। বিশ্বকাপের খেলা দেখবে নিজের ঘরে বসে। সবুজ মাঠে রঙিন জার্সি পরা খেলোয়াড়দের খেলা দেখার মজাই আলাদা। টাকাও জমিয়েছে— তবে পুরোটা হয় না। সামান্য কম আছে। বাবা বললেন, আমার বাড়িতে দু’টো ঘর তো খালি পড়ে আছে। ফ্যামিলি নিয়ে এখানে চলে আয়। আর বাকি টাকা আমার থেকে নিয়ে টিভি কিন। সরতাজ রাজি হয়ে গেল।
দু’চারদিন পর ওরা আমাদের বাড়ির পেছনে দু’টি ঘরে মাল-সামান নিয়ে উঠে এলো। ফুলী এখন বাবার জন্য কিছু কাজকর্ম করে দেয়। সরতাজও প্রতিদিনই একবেলা আসে— বাবার পাশে বসে নানান গল্প করে। বাবার নিঃসঙ্গতা কেটে যাওয়ায় আমরাও মনে-মনে খুশি। পুরনো বিশ্বস্ত ফুটবয় বলে ওকে অনায়াসে আমাদের আপনজন ভাবা যায়।
বিশ্বকাপের খেলা চলছে। রাত জেগে খেলা দেখতে হয়। ইদানিং তার রিকশাও চালাতে হয় না। আমাদের বাড়ির দেখাশোনা বাবদ আমরা ওকে একটা মাসোহারা দেই। বাবা প্রায়ই ওকে বলেন, প্রতিদিন খেলা দেখিস না। ঘুমের সময় ঘুম, না হলে শরীর খারাপ করবে। ও শোনে না। বোঝা গেল, ফুলী নয়— নিজের শখেই টিভি কিনেছে। ওর পছন্দের দল ফাইনাল খেলবে। উত্তেজনায় ওর বেলা কাটে না। চানাচুর, মুড়ি, চিপস, ড্রিংকস বাদাম-মুড়কি কিনে এনেছে। রাতেরবেলা বাবাকে বলে গেছে নানা আমার দল জিতলে সকালে আইস্যা আপনারে কদমবুচি করবো। সারা রাত ঐসব খাওয়া আর উত্তেজনায় গড়িয়ে পড়া। এই গোল হয়েও হয় না, তো ঐ গোল যায় গোলবারের বাইরে দিয়ে। কখনও রাগে, কখনও দুঃখে ও মাথার চুল ছেঁড়ে। শেষ রাতে ওর বুকব্যথা শুরু হয়। ক্রমে অসহ্য। বাবাকে খবর দিলে বাবা ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেন। ও যেতে রাজি হয় না। বলে, এখুনি ব্যথা কমে যাবে। ইতোমধ্যে ওর দল এক গোল দিয়ে দিয়েছে। সেই আনন্দে ব্যথা ভুলে যায় এবং বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠে।
