রিফাত নিগার শাপলা, শিশু সাহিত্যিক
শেকড় থেকে একটা চারাগাছ যেমন পরিচর্যার মাধ্যমে বেড়ে ওঠে, তেমনি আমার জ্ঞানের আলোয় বিকশিত হবার প্রথম ক্ষেত্রটি ছিলো, রাজশাহী শহরের (পি.এন, গার্লস হাই স্কুল) প্রথম নাথ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। প্রথম চলতে শেখা, প্রথম কথা বলতে শেখার মতো, প্রথম স্কুলের গন্ডিতে প্রবেশ করার আনন্দটাই আলাদা! আব্বা, তখন রাজশাহী গভঃ কলেজের বোটানীর হেড অব দা ডিপার্টমেন্ট। অফিসে যাবার আগে আমাকে নিয়ে ভর্তি করে দিয়ে এলেন স্কুলে। নতুন নতুন বন্ধু, নতুন নতুন কতো রকমের অভিজ্ঞতা! ঢং ঢং ঘণ্টার শব্দ, লাইনে দাঁড়িয়ে সমবেত কণ্ঠে গাওয়া সেই জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছি,। পি.টি, করেছি। তারপর প্রথম ক্লাসের প্রথম লাইনটি ধরে ক্লাশরুমে প্রবেশ করেছি। স্যারের কথা আমরা মন দিয়ে শুনেছি, বুঝতে চেষ্টা করেছি। টিফিন পিরিয়ডে আবারও লাইনে দাঁড়িয়ে টিফিন নিয়েছি। ডালপুরি, লুচি-হালুয়া, গজা, লুচি-বুন্দিয়া, সিঙ্গারা কিংবা লুচি-নিরামিষ। টিফিনের বৈচিত্রময় স্বাদের স্পর্শ যেনো আজও জিহবায় লেগে রয়েছে ।
আমি সব সময় প্রথম বেঞ্চে বসতাম। আমার প্রিয় বন্ধুর নাম ছিলো মাররীনা। সে বসতো আমার বাম পাশটায়। মিটু, রেজিটি, আম্মান, আতিয়া, রুশু ওরাও ছিলো আমার সহপাঠি। এখন প্রজ্ঞা লাবনী ছাড়া পি.এন. গার্লস স্কুলের পরিচিত আর কারোর সাথেই আমার যোগাযোগ নেই। আব্বা ড. মুহাম্মদ সিরাজউদ্দিনের চাকরিতে বদলির সুবাদে আমাদেরও স্কুল ছাড়তে হতো প্রায়শই।
পি.এন. গার্লস স্কুলটা ছিল আমাদের সাগর পাড়ার বাসা থেকে অনেকটা দূরে। তবু সে পথ আমরা হেঁটেই পাড়ি দিতাম। ঘোড়ামারা পোস্ট অফিসের কাছাকাছি ছিল স্কুলটা।
স্কুলে ভর্তি হবার আগেই আব্বার কাছে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লিখতে শিখেছি, স্বরে-অ, থেকে ঔ পর্যন্ত, ক থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত, ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত এবং A থেকে Z পর্যন্ত। কাজেই ক্লাশে শুধু ‘এক এককে এক, দুই এককে দুই...’ এভাবে সমবেত কণ্ঠে নামতা মুখস্ত করা ছাড়া প্রথম দিকটায় পাঠ্যপুস্তকের প্রায় সবই ছিল আমার নখদর্পনে। আব্বার হাতের লেখা সুন্দর ছিলো বলে, তাঁর লেখার ওপর হাত ঘোরাতে ঘোরাতে আমার হাতের লেখাটাও বেশ ভালো ছিলো বলে টিচারদের খুব স্নেহের ছাত্রী ছিলাম ।
আমাদের স্কুলের প্রবেশ দ্বারটি ছিলো বিশাল আকারের। বড়ো গেটের বাম পাশে স্কুলে ঢোকার জন্য ছোট আরেকটা গেট ছিল। বেশির ভাগ সময় সেই গেট দিয়েই আমরা স্কুলে প্রবেশ করতাম। শুধু স্কুল ছুটির সময় বড় গেটটা সম্পূর্ণ খুলে দেয়া হতো, ছাত্রীদের বেরুনোর জন্য। স্কুল গেট দিয়ে ঢুকতেই ছিল বিরাট মাঠ। মাঠের ঠিক উল্টাদিকে এক কোণায় ছিলো, লাইন ধরে ৭/৮টা বাথরুম। তার দু’পাশে ছিলো বেশ ক’টা ভ্যান্নাগাছ। একবার সেই ভ্যান্নার বিচি খেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর একজন ছাত্রীর বমি করে সেকী সংকটময় অবস্থা! তাকে দেখে আমাদের কচি মনে একটা অদ্ভুত ধারণা জন্মেছিলো। ওই দিকটায় ভূত আছে।
টিফিন পিরিয়ডে খেলার সময়টা ছিলো, স্কুল চলাকালীন সময়ের ভেতর সবচেয়ে আনন্দের। বন্ধুরা মিলে খেলতাম— এক্কা-দোক্কা, রুমাল চোর, হা-ডু-ডু, কানামাছি, ছি-বুড়ি আরো কতো কী! প্রায়ই ছড়া কেটে একটা খেলা খেলেছি, ছড়াটা হলো—‘ ওপেনটি বাইস্কোপ নাইন, টেন, টেইস্কোপ।চুল টানা, বিবিয়ানা সাহেব বাবুর বৈঠকখানা। পি.এন. পার্লস হাই স্কুলে আমরা সব ছাত্রীরা পি.টি করতাম ড্রামের তালে তালে।
প্রতিটা ছড়ার ছন্দ, গানের অন্তমিল ও তালের ঝংকার আমাকে এতোটাই আপ্লুত করতো যে, আমি আমার সবটুকু মনোযোগ ঢেলে তা উপভোগ করার চেষ্ট করতাম। সেদিনের সেই আকর্ষণ থেকেই হয়তো আমি আজ ছন্দ, সুর অন্তমিলনের গভীর সমুদ্রে নিমজ্জিত হতে পেরেছি। আজও তাই ভুলতে পারিনি, স্কুলের পাঠ্য তালিকার বাইরে শেখা অর্থহীন কতগুলো ছড়া, ছন্দ ও তালের মূর্চ্ছনা।
নামতাদি আমার সবচাইতে প্রিয় শিক্ষয়িত্রী ছিলেন। বড়ো মিষ্টি করে কথা বলতেন। তিনি আমাদের বাংলা পড়াতেন। আর আমারও সবচাইতে প্রিয় বিষয় বাংলা কবিতা। ক্লাসে সবার আগে আমি মুখস্ত করে পড়া দিতাম। নমিতাদি যখন আবৃত্তি করতেন পাঠ্যবই থেকে, তা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। বাসায় গিয়ে তার মতো করে পড়তে চেষ্টা করতাম। নমিতাদি‘র ক্লাসে একটা পিন-পতনের শব্দও হতো না। কারণ তিনি অসম্ভব আদর করে শিক্ষা দিতেন। অত্যন্ত অমায়িক স্বভাবের শিক্ষয়িত্রী ছিলেন তিনি। বাংলা ছাড়াও অন্যান্য সব বিষয়েই আমার দখল ছিলো বেশ। শুধুমাত্র ড্রইং-এ দু’নম্বর কম পেয়ে আমি ক্লাশ ওয়ান-এর বার্ষিক পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান অধিকার করে নতুন ক্লাশে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। কথাশিল্পী রাবেয়া সিরাজ আমার প্রয়াত মা, তিনি সেই সার্টিফিকেট-টি অত্যন্ত যত্নের সাথে তুলে রেখেছিলেন। যা আজও আমার কাছে সংরক্ষিত আছে।
স্কুলের গেটের পাশে বসতো বেশ ক’টি ভ্রাম্যমাণ দোকান। হজমি, ঝালমুড়ি , আইসক্রিম, ছোলাবুট, বাদাম, চালতার আচার— কতো মজা করে দলবেধে সেসব খেয়েছি।
