বিশ্বকাপের সময়টাই কেন তিনি বিদায় নেয়ার জন্য বেছে নিলেন? সময়ের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসা আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর যে বিশ্বকাপ খেলারই সুযোগ মেলেনি কখনও! আর্জেন্টিনা, স্পেন ও কলম্বিয়া-এই তিনটি দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অংশ নিলেও স্টেফানোর মূল পরিচয়, তিনি রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি। পঞ্চাশের দশকে রিয়ালের পাঁচটি ইউরোপিয়ান কাপ জয়ের মূল নায়ক এখনো লা লিগার পঞ্চম সর্বোচ্চ গোলদাতা।
তিনি হলেন ফুটবল ইতিহাসের এক দীর্ঘশ্বাসের নাম। কোন দিন বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ হয়নি। অথচ তাকে বলা হয়ে থাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়দের একজন। দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিই বা বলা যেতে পারে একে? তার স্বর্ণালী সময়ে তার দেশ আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেনি। পরে স্পেনের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে স্পেনের হয়ে খেলা শুরু করলেও তার বিশ্বকাপ স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে স্পেন বাছাইপর্বের বাঁধাই পার হতে পারেনি। ১৯৬২ সালে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ হলেও সেবার তার স্বপ্নের সমাধি রচনা করে দুর্ভাগ্যের চোট। বাছাইপর্বে তার দাপটে মূল পর্বের টিকেট পায় স্পেন। কিন্তু বিকশ্বকাপ শুরু হবার কদিন আগে মাংসপেশীর ব্যথা নিয়ে আর খেলা হল না বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের সৌভাগ্য হল না নিজের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজনকে দেখার। হতাশা থেকেই সেবার ৩৬ বছর বয়সে অবসরই নিয়ে নিলেন তিনি।
পঞ্চাশের দশকে তিনি রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে জিতেছেন পাঁচটি ইউরোপিয়ান শিরোপা—আলফ্রেডো ডি স্টেফানোকে বোঝানোর জন্য এই ছোট্ট তথ্যটিই যথেষ্ট। এখানেই শেষ নয় তার কীর্তি। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তার দল রিয়াল লা লিগা জিতেছে মোট আটবার। ডি স্টেফানো ছিলেন সর্বজয়ী এই লস ব্লাঙ্কোস দলের প্রাণভোমরা। আর্জেন্টিনায় থাকাকালে তিনি ১৯৪৫ ও ১৯৪৭ সালে রিভারপ্লেটের হয়েও লিগ শিরোপা জেতেন। কলম্বিয়ান ক্লাব মিলিওনারিওসের হয়েও তিনি জিতেছেন তিনটি লিগ শিরোপা (১৯৪৯, ১৯৫১, ১৯৫২)।
বিশ্বকাপ জয় করতে না পারলেও তার অর্জনের খাতাটা কিন্তু খুব ছোট নয়। ফুটবল বিশ্বের বাঘা-বাঘা সব পুরস্কার জিতেছেন তিনি। ১৯৫৭ ও ১৯৫৯ সালে তিনি ইউরোপের সেরা ফুটবলার হওয়ার সম্মান অর্জন করেন। তিনি পাঁচবার স্প্যানিশ লিগের সেরা গোলদাতা হয়েছিলেন। খেলোয়াড়ী জীবন শেষেও ছিলেন আলোচনায়।
মাঠের খেলা ছাড়ার পর তিনি গড়ে তোলেন কোচ হিসেবে এক সমৃদ্ধ ক্যারিয়ার। কোচ হিসেবে তিনি মোট ১২টি ক্লাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে আছে স্পোর্টিং লিসবন, ভ্যালেন্সিয়া ও রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাব। আর্জেন্টিনার দুই প্রধান বোকা জুনিয়র্স ও রিভারপ্লেটেও তিনি কোচ হিসেবে শিরোপা জেতান। রিয়াল মাদ্রিদকে শিরোপা জেতাতে না পারলেও ১৯৮০ সালে তিনি ঠিকই ভ্যালেন্সিয়াকে স্প্যানিশ লা লিগার শিরোপা জেতান।
কিন্তু এতো অর্জন, এতো গৌরব এখন অর্থহীন। সবই এখন অতীত। জীবনের মায়া ত্যাগ করে ৮৮ বছর বয়সে বিদায় নিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন আলফ্রেডো ডি স্টেফানো। বিশ্বকাপের উল্লাস, আমেজ, উত্সব স্তব্ধ করে দিলেন। কি কাকতালীয় ভাবে যে বিশ্বকাপ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল তাকেই দিয়ে দিলেন কড়া জবাব। বিশ্বকাপও তাই কাঁদছে তার নামে। এমন মৃত্যু জোটে কয় জনের ভাগ্যে!
সংখ্যায় আলফ্রেডো ডি স্টেফানো
৫১০ পাঁচটি ক্লাবের হয়ে খেলা ম্যাচ
৪১৮ ক্লাব ক্যারিয়ারে গোল
২২ খেলোয়াড় হিসেবে মোট ট্রফি জয়
১২ কোচ হিসেবে দায়িত্বে থাকা ক্লাব
৬ কোচ হিসেবে ট্রফি জয়
৫ রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইউরোপিয়ান কাপ জয়
৩ ভিন্ন ভিন্ন দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার অভিজ্ঞতা
