বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়-ব্যয় সংক্রান্ত সুস্পষ্ট কোনো নীতিমালাই নেই। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ও অন্যান্য ফি’র নামে ইচ্ছেমত আয় করছে, আবার ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইচ্ছেমত টাইট হচ্ছে। গবেষণা খাতে কোন বরাদ্দ নেই। ব্যয় কমানোর জন্য কম অভিজ্ঞ বা অনভিজ্ঞ গ্রাজুয়েটদের কম বেতনে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিচ্ছেন। নিজ আত্মীয়-স্বজন হচ্ছেন কর্মকর্তা বা কর্মচারী। প্রয়োজনীয় কোন শিক্ষা উপকরণই কিনছে না। নামেমাত্র ল্যাবরেটরি থাকলেও নেই কোন উপকরণ। টেক্সটাইল ও ফার্মেসি বিভাগের জন্য যেসব রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োজন তার ১০ ভাগও কিনছে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বিষয়ে ডিসিপ্লিন অনুমোদন নেয়া হচ্ছে, শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে, কিন্তু এ বিষয়ের জন্য কোন ব্যয় করছেন না। বিভিন্ন খাত দেখিয়ে অধিকাংশ টাকা মালিকরা নিজেরা বন্টন করে নিচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এ অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও (ইউজিসি) বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ভর্তি ফি, টিউশন ফি এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য বিষয়ে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগে এখন পর্যন্ত কোনো নীতিমালা নেই। শিক্ষক নিয়োগে ইউজিসি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মানার কথা বললেও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই তা মানছে না, ইচ্ছামতো শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে। ৭০ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ শিক্ষককে খণ্ডকালীন নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে কোন যোগ্যতা মানা হয় না। বেতন কম নিতে রাজি এমন গ্রাজুয়েটদের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষা হয়, সেখানে নিয়োগ বোর্ডে অভিজ্ঞ লোকই থাকে না।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নামমাত্র বেতনে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। বছরের পর বছর চাকরির পরও বেতন বৃদ্ধি হয় না। রাজধানীতে ধানমন্ডির একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক জানান, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা বেতনে প্রভাষক পদে লোক নিয়োগ দেন। অধ্যাপকের ক্ষেত্রে বেতন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি করা না হলেও প্রতিবছর বিভিন্ন খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বাড়তি ভর্তি, টিউশন ও অন্যান্য ফি নেয়া হয়।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তিতে নির্দিষ্ট আসন সংখ্যা নেই। আসন কোন বিষয়ই নয়, শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হয় না। মান যাচাই করা হয় না। যত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে, তত বেশি টিউশন ফি পাওয়া যাবে এ বিবেচনায় শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই প্রতিবছর টিউশন ফি ও ভর্তি ফিসহ অন্যান্য ফি বৃদ্ধি করে। তাছাড়া ট্রান্সক্রিপ্ট, সার্টিফিকেট, প্রশংসাপত্র ইত্যাদি সরবরাহ করার ক্ষেত্রে উচ্চহারে ফি নেয়। কী শিক্ষার মান, পরীক্ষা পদ্ধতি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা- সব ক্ষেত্রেই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা। টিউশন ফি না দিতে পেরে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সহজলভ্য ও সব শ্রেণীর জন্য উন্মুক্ত রেখে এবং মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা লাভের পথ আরো সুগম করতে শিক্ষার্থীদের প্রদেয় বিভিন্ন ফি ও চার্জ সহনীয় পর্যায়ে রাখা অত্যাবশ্যক মনে করে ইউজিসি।
বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের শর্তেই উল্লেখ রয়েছে: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষে ভর্তিকৃত পূর্ণকালীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ন্যূনতম শতকরা ছয়ভাগ বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ দিতে হবে। এর মধ্যে তিনভাগ আসন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের, বাকি তিনভাগ প্রত্যন্ত অনুন্নত অঞ্চলের মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের। এসব শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ও অন্যান্য ফি ব্যতীত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ প্রদান করতে হবে এবং প্রতিবছর এসব শিক্ষার্থীদের তালিকা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে দাখিল করতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ দেয় না। মঞ্জুরি কমিশনের নির্ধারিত ছকে ভুল তথ্য দেয় অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়। আবার কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় টিউশন ফি না নিলেও অন্যান্য ফির নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করে।
রাজধানীর কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের খরচের হিসাবে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী ১৫ থেকে ২০টি বিষয়ে পড়াশোনার খরচ মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের নাগালের বাইরে। যদিও মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়ে কম মূল্যে পড়াশোনার সুযোগ আছে। নর্থ সাউথসহ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হলেও অতিরিক্ত টিউশন ও অন্যান্য ফি নেয়া হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য পড়াশোনা করা সম্ভব নয়।
