গত প্রায় তিন বছর ধরে পুঁজিবাজারের লেনদেনে খরা চলছে। ২০১১ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন যেখানে দৈনিক এক হাজার কোটি টাকার মতো ছিল সেখানে এখন গড়ে লেনদেন হচ্ছে তিনশ’ কোটি টাকার মতো। গত কয়েকদিনে তা আরও কমে দুইশ’ কোটি টাকার ঘরে চলে এসেছে। লেনদেন কমে যাওয়ায় খরচ চালাতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে স্টক এক্সচেঞ্জ ও ট্র্যাক হোল্ডারদের (ব্রোকারেজ হাউস মালিক)। এ নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ বেশ উদ্বিগ্ন। ট্র্যাক হোল্ডাররাও ক্ষুব্ধ।
স্টক এক্সচেঞ্জের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে সূচকের ওঠানামা থাকতেই পারে। তবে লেনদেন এতো কমে যাওয়া মোটেও ইতিবাচক নয়। এতে করে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা বেড়ে যায়। তাছাড়া লেনদেনের উপর লাগা চার্জ (মোট লেনদেনের উপর চার্জ) ও হাওলা চার্জ (প্রতি বার লেনদেনে চার্জ) দিয়েই মূলত স্টক এক্সচেঞ্জ খরচ নির্বাহ করে। ট্র্যাক হোল্ডাররাও লেনদেনের চার্জের উপর ভিত্তি করেই খরচ চালায়। অথচ দিন দিন পুঁজিবাজারের লেনদেন কমে যাচ্ছে। অনেক দিন ধরেই লেনদেন হচ্ছে গড়ে সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকারও কম। বর্তমানে তা আরও কমে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ২১৮ কোটি টাকা। আগেরদিন সোমবার লেনদেন হয়েছে ১৯১ কোটি টাকা। লেনদেন খরা প্রসঙ্গে ডিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. স্বপন কুমার বালা ইত্তেফাক’কে বলেন, লেনদেন এতো কমে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়। কারণ চারশ’ কোটি টাকার কম লেনদেন হলে স্টক এক্সচেঞ্জের খরচ বহন করা কঠিন। তাছাড়া ডিমিউচ্যুয়ালাইজড (স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পৃথক) স্টক এক্সচেঞ্জে কম লেনদেন হলে তা স্টক এক্সচেঞ্জের জন্য বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এদিকে লেনদেন কমে যাওয়ায় ট্র্যাক হোল্ডাররাও ভালো নেই। লেনদেন কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ড. স্বপন কুমার বালা বলেন, বর্তমানে কিছু শেয়ারের দাম কম থাকায় অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করেছেন। তারা ঘন ঘন লেনদেন করেন না। ফলে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ কমেছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ শেয়ারবাজারের জন্য ভালো হলেও এতে করে দৈনিক ভিত্তিতে লেনদেন কমে গেছে। তাছাড়া অর্জিত মূলধনী আয়ের উপর কর আরোপের প্রস্তাবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। পরে সে প্রস্তাব প্রত্যাহার করায় স্বস্তি ফিরেছে। তবে শেয়ারবাজার নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে সতর্ক থাকলে সামনে লেনদেন ভালো হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ডিএসই’র মতো অপর স্টক এক্সচেঞ্জ চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) গত প্রায় তিন বছর ধরে লেনদেন খরা চলছে। বর্তমানে সিএসইতে লেনদেন হচ্ছে বিশ কোটি টাকার ঘরে। অথচ ২০১১ সালে লেনদেন হতো একশ’ কোটি টাকার উপরে।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১১ সালের জানুয়ারিতে লেনদেনের পতন শুরু। এরপর মাঝে মাঝে কিছুদিন লেনদেন ভালো হলেও বেশিরভাগ সময়ই ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ছয়শ’ থেকে সাতশ’ কোটি টাকা। আর বছরের শেষ কয়েক মাসে ডিএসই’র গড় লেনদেন সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকায় নেমে আসে। ২০১২ সালের বেশিরভাগ সময়ই লেনদেন হয়েছে তিনশ’ কোটি টাকার কাছাকাছি। এ সময়ে অনেক দিন লেনদেন হয়েছে দুইশ’ কোটি টাকার নিচে। ২০১৩ সাল জুড়ে লেনদেনের খরা তীব্রতর হয়েছে। চলতি বছরে এসেও লেনদেনে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। বর্তমানে লেনদেন নেমে এসেছে দুইশ’ কোটি টাকার ঘরে।
এদিকে পুঁজিবাজারে লেনদেন কমে যাওয়ায় ট্র্যাক হোল্ডাররা তাদের ব্রোকারেজ হাউস চালাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই কর্মী ছাটাই করেও হাউস চালাতে পারছেন না। এসব নিয়ে ট্র্যাক হোল্ডাররা চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। একাধিক ট্র্যাক হোল্ডারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রায় তিন বছর ধরে পুঁজিবাজারের লেনদেন তলানীতে নেমে এসেছে। এভাবে লেনদেন কমে যাওয়ায় হাউস চালাতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঋণ করে হাউসের খরচ চালাতে হচ্ছে। বাজার ভালো না থাকায় শেয়ারে বিনিয়োগ করেও লাভ করা যাচ্ছে না। ফলে ব্রোকারেজ হাউস নিয়ে বিপাকে আছেন তারা। একজন ট্র্যাক হোল্ডার বলেন, বাজার ভালো হওয়ার আশায় এতোদিন ঋণ করে হলেও হাউস চালিয়েছি। তবে এভাবে আরও চলতে থাকলে হাউস চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
