আসন্ন ঈদুল ফিতরে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখো যাত্রীদের নদী পারাপারে নৌযান সংকটে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ আভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিসি)। ঈদে ঢাকা শহরের মানুষের ঘরে ফেরার একটা হিড়িক পড়ে যায়। এবার ভরা বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে যাত্রীদের। কিন্তু যাত্রীর তুলনায় নৌযানের অভাব রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে যাত্রীদের দুর্ভোগের আশঙ্কা রয়েছে। যদিও বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদের আগেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এবং যাত্রীরা নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারবেন।
পদ্মা-মেঘনাসহ বিশাল নদীগুলো উত্তাল হতে শুরু করছে। এসব নদী পাড়ি দিয়ে নিরাপদে ঘরে ফেরার একমাত্র নির্ভরযোগ্য নৌযান হচ্ছে বিআইডব্লিউটিসি’র প্যাডেল স্টীমার। কিন্তু বৃটিশ আমলে তৈরি প্যাডেল স্টীমারসহ সংস্থার অধিকাংশ জাহাজই বিকল। নতুন করে তৈরি জাহাজ এমভি বাঙালির সঙ্গে জোড়াতালি দিয়ে তিনটি পুরানো জাহাজ বর্তমানে চলাচল করছে। এই ৪টি জাহাজ দিয়েই ঢাকা-বরিশালসহ চাঁদপুর, মোড়েলগঞ্জ ও মাছুয়া রুট টিকিয়ে রাখা হয়েছে। মনপুরা, ইলিশা, মজু চৌধুরীর হাট, দৌলতখান, আলেকজান্ডার, শশীগঞ্জ, চরচেঙ্গা, বাটামারা, রাঙাবালীসহ দুর্গম এলাকাগুলোতে চলাচলকারী সংস্থার ১৩ টি সি- ট্রাকের মধ্যে ৯ সি-ট্রাকই বর্তমানে বিকল হয়ে বিভিন্ন ডকইয়ার্ডে পড়ে আছে। ফলে আগুনমুখাসহ বিশাল নদী পাড়ি দিয়ে ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে। ঈদের পূর্বে আবহাওয়া আরো খারাপ হলে বড় ধরনের দুঘর্টনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানিয়েছে, সংস্থার অধীনে থাকা ৪টি প্যাডেল স্টীমারের মধ্যে পিএস অস্ট্রিচ মেরামতের জন্য ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে নারায়ণগঞ্জ ডক-ইয়ার্ডে পাঠানো হয়। এখনো সেটি সচল হয়নি। রেলওয়ে থেকে ক্রয় করা দেশের সর্ববৃহত্ জলযান হিসাবে পরিচিত এমভি সোনারগাঁও ৯ কোটি টাকায় ক্রয় করা হয় যার মেরামতে খরচ হয়েছে ১৩ কোটি টাকা। কিন্তু যাত্রী পরিবহনে কখনোই সাফল্য দেখাতে পারেনি জাহাজটি। বছরের পর বছর নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে পড়ে থাকার পর গত বছর জাহাজটি বেসরকারি উদ্যোক্তার কাছে ভাড়া দেয়া হয়েছে। বর্তমানে জাহাজটি শ্যামপুর ঘাটে ভাসমান রেস্তোরাঁ হিসাবে ব্যবহূত হচ্ছে। সংস্থার সবচেয়ে নাজুক জাহাজ হিসাবে পরিচিত এমভি সেলা সচল থাকার কথা জানালেও তা সার্ভিসে নেই। জাহাজটি সদরঘাটে নোঙ্গর করে রাখা হয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিসি’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বর্তমানে নতুন তৈরি করা বাঙালির সঙ্গে জোড়াতালি দিয়ে চলছে পিএস লেপচা, পিএস মাহসুদ ও পিএস টার্ন।
ঢাকা-বরিশাল-মোড়েলগঞ্জ রুট জোড়াতালি দিয়ে কোন রকম টিকিয়ে রাখা হলেও বরিশাল-চট্টগ্রাম রুট জাহাজ সংকটের কারণে গুটিয়ে গেছে আরো দু’বছর আগে। সর্বশেষ ২০১২ সালের জুন মাস এ রুটে জাহাজ চলেছে বলে বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে এ রুটের পুনর্বাসনকৃত এমভি বার আউলিয়া জাহাজটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হলেও তা চট্টগ্রাম-হাতিয়া রুটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বর্তমানে পুনর্বাসনকৃত জাহাজগুলোর মধ্যে এমভি আবদুল মতিন, এমভি মনিরুল হক ও এমভি বার আউলিয়া কাগজে-কলমে উপকূলীয় নৌযান হিসাবে যুক্ত থাকলেও যাত্রী পরিবহন শুধু চট্টগ্রাম থেকে হাতিয়া-সন্দ্বীপ পর্যন্ত। ফলে চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের চাঁদপুর অথবা লক্ষ্মীপুর হয়ে বিকল্প নৌযানে ঘরে ফিরতে হবে। উপকূলের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ-উপদ্বীপগুলোতে চলাচলকারী ১৩ টি সি- ট্রাকের মধ্যে বর্তমানে এসটি শেখ কামাল, এসটি শেখ রাসেল, এসটি সুকান্ত বাবু, এসটি খিজির-৫, এসটি খিজির-৬, এসটি খিজির-৭, এসটি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, এসটি শেখ ফজলুল হক মনি এবং এসটি রূপালী বিভিন্ন ডকইয়ার্ডে মেরামতের জন্য রয়েছে। খিজির-৫এর ইজারাদার জানান, তিন মাস পূর্বে তিনি ইজারা গ্রহণ করলেও এখন পর্যন্ত তাকে সি-ট্রাক বুঝিয়ে দেয়নি সংস্থার কর্মকর্তারা। সংস্থার বরিশালস্থ এজিএম গোপালকৃষ্ণ মজুমদার জানান, ৪টি রকেট স্টীমারের বাইরে তার অধীনে থাকা ৩টি সি-ট্রাকের মধ্যে একটির মেরামত কাজ চলছে এবং বাকি দুটি সচল রয়েছে। সংস্থার চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মুস্তাফিজুর রহমান জানান, সব আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে থেকেই ত্রুটিপূর্ণ নৌযানগুলো সার্ভিসে ফিরিয়ে আনার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঈদে নির্বিঘ্নে সর্বোচ্চ সংখ্যক যাত্রী পরিবহনের জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
