ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে ব্রাজিল

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৪, ২২:২৩
আশা যখন হতাশার খোলসে ঢুকে যেতে বাধ্য করে তখন আবেগ নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। এমনটি প্রমাণ করে দিলেন বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশ ব্রাজিলের সমর্থকরা। মঙ্গলবার সেমিফাইনালে জার্মানির সঙ্গে ৭-১ গোলের বেদনাদায়ক পরাজয়ের পর ব্রাজিল জুড়ে সমর্থকরা রীতিমতো উন্মত্ত হয়ে ওঠে। হিতাহিত জ্ঞানশুন্য হয়ে তারা নিজের দেশের সম্পদ ধ্বংস করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় যেন। দেশজুড়ে চালায় ব্যাপক তান্ডব। ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের শিকার হয় সাধারণ মানুষ ও সরকারি সম্পদ। নেইমার ছিলেন না এই ম্যাচে। তারপরেও কথা দিয়েছিল ডেভিড লুইজরা বিশ্বকাপ এনে দেবেন। কিন্তু তারপরেও ‘ঐতিহাসিক’ হার মাথা নত করে দিয়েছে ব্রাজিল দলকে। ম্যাচের শেষে খেলোয়াড়রা দেশবাসির কাছে ক্ষমা চাইলেও লজ্জায়, বেদনায় ব্রাজিল ভক্তদের ওপর শোকের ছায়া নেমে আসে। ম্যাচের শেষ লগ্নে সান্ত্বনা হিসাবে ব্রাজিলের হয়ে একটি মাত্র গোল করেন অস্কার। কিন্তু সেই শান্ত্বনার গোল ব্রাজিলের সমর্থকদের ক্ষোভের আগুনে এক বিন্দু পানিও ঢালতে পারেনি। ফলে সেই আগুন দগ্ধ করেছে গোটা ব্রাজিলকে। তারা লিপ্ত হয় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে। ব্রাজিলজুড়ে বিভিন্ন শহরে ক্ষুব্ধ সমর্থকরা বাস ও অন্যান্য যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, দোকানপাট লুটপাট, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। প্রথমার্ধে ৫-০ তে পিছিয়ে পড়ার পর কয়েকটি শহরে দাঙ্গা-হাঙ্গামা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সমর্থকরা যখন বুঝতে পারে যদি অলৌকিক কিছু না ঘটে তবে এত গোল শোধ করে ড্র কিংবা জয় কোনোটাই আর ধরাছোয়ার ভেতরে নেই। তখনই দেশজুড়ে নেমে আসে যেন ‘শোকের ছায়া’। শোক থেকে জন্ম নেয় ক্ষোভ। অতি শিঘ্রই সেই ক্ষোভ পরিণত হয় নিয়ন্ত্রণহীন সহিংস বিক্ষোভে। খেলা শুরুর আগেই ব্রাজিলের বৃহত্তম শহর সাও পাওলোতে সমর্থকরা জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রাজিলের জয় উদযাপন করার জন্য বাঁজি পটকা, আঁতশবাজি নিয়ে তৈরী হয়ে ছিল। কিন্তু যখন ব্রাজিলের আশার সমাধি রচনা হলো তখন আনন্দের পরিবর্তে ক্ষোভের আগুন প্রকাশ করতেই ফোটানো হলো সেসব পটকা। বড় পর্দায় যারা খেলা দেখতে জড়ো হয়েছিল তারা তিন চার গোল দেখার পরেই ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলে। খেলা শেষ হবার পর যোগ দেয় পথদাঙ্গায়। সাও পাওলো মিউনিসিপ্যাল ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি জানায়, ব্রাজিলের ক্ষুব্ধ সমর্থকরা একটি বড় বাস কোম্পানির স্টেশনে হামলা চালায়। তারা সেখানে আগুণ ধরিয়ে দেয়। সেখানে পার্ক করে থাকা ১৫ টি বিলাসবহুল বাস পুড়ে যায়। কয়েকটি বাড়িঘর ও দোকানে লুটপাট চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে। ঘটনার পর পথচারী এবং বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারণ ক্ষুব্ধ সমর্থকরা একের পর এক যানবাহনে হামলা চালাতে শুরু করে। বেশিরভাগ ক্ষুব্ধ সমর্থকের দল বাসে হামলা চালায়। সাও পাওলোর রাস্তায় আরো কয়েকটি বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়। গুয়ারুলহোসে একটি বাস থামিয়ে তাতে ব্রাজিলের বিক্ষুব্ধ সমর্থকরা উঠে পড়ে। এরপর যাত্রীদের দ্রুত বাস থেকে নেমে যেতে বলে। সবাই নেমে গেলে তাতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। শহরটিতে অন্তত ২০ বাস পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে তারা। পুড়িয়ে দেয় আরো কয়েকটি সাধারণ যানবাহন ও দোকানপাট। সাও ম্যাথেউস জেলায় একটি নেটওয়ার্ক অফিসে হামলা চালায় বিক্ষোভকারীরা। সেটি তারা ধ্বংস করে ফেলে। পুলিশ এগিয়ে এলে তাদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। সেখান থেকে কয়েকজন গ্রেফতার হয়। এদিকে, জার্মানির কাছে পরাজয়ের পর ব্রাজিলের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় বাহিয়া অঙ্গরাজ্যের রাজধানী সালভাদোরে দাঙ্গাবাজ সমর্থকরা ব্যাপক হাঙ্গামা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। পুলিশ জানায়, ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সত্ত্বেও তারা দোকানপাটে লুটপাট, ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালায়। বিভিন্ন স্থান থেকে পুলিশ অন্তত ১০ জনকে গ্রেফতার করে। বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র কোপাকাবানা বীচে একদল দাঙ্গাবাজ আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং এখানে সেখানে বিক্ষিপ্ত হামলা চালায়। এতে লোকজন হুঁড়োহুড়ি করে ছুটে পালানোর চেষ্টা করে। এসময় অনেকে আহত হয়। এখান থেকে আরো ৫ দাঙ্গাবাজ গ্রেফতার হয়। অপরদিকে, পারনামবুকো অঙ্গরাজ্যর রাজধানী এন রেসিপেতে ব্রাজিলের ক্ষুব্ধ সমর্থকদের বেপরোয়া হামলা থামাতে বিপুল সংখ্যায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তারপরেও চলে হতাশ সমর্থকদের তান্ডব। পুলিশ দফায় দফায় টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাটিচার্জ করে। এসময় অনেকে ঘোড়ার পায়ের নিচে চাপা পড়ে আহত হয়। এন কুরিটিবা শহরেও ক্ষুব্ধ সমর্থকরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। তারা এমন লজ্জাকর পরাজয় উপহার দেয়ার কারণে খেলোয়ারদের শাস্তি দাবি করে। এক পর্যায়ে তারা রাজপথে নেমে বাস ও অন্যান্য যানবাহনে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। সাইট ফেন্সিংয়ে কয়েকটি বাসে আগুণ ধরানো হয় এবং দোকানপাট লুটপাট করা হয়। বেলো হরিজন্তি শহরে রাস্তায়ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট ও বিভিন্ন বাড়িঘরে হামলা শুরু হতেই পুলিশ তত্পর হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তারপরেও গণহারে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এখানে এক সমর্থক নিজের বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বলতে থাকে, ‘আমার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমি ব্রাজিলিয়ান, আমার দেশ ফুটবল খেলে। এই পরিচয়টাই এখন লজ্জার!’ তার পাশে আরেক তরুণ গড়াগড়ি খেতে খেতে বলছিলেন, ছি ছি! কি লজ্জা, কি লজ্জা! তার পাশেই আরেক ভক্ত ফুটপাতের দেয়ালে নিজের মাথা ঠুকে রক্ত বের করছিল। তার অদূরেই একদল বিক্ষোভকারী যানবাহন ও পুলিশকে লক্ষ্য করে ছুড়ে চলেছে ইটপাটকেল ও পাথর। খেলায় জয় পরাজয় থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কয়েকবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটির ক্ষুব্ধ সমর্থকদের মন্তব্য, জার্মানির কাছে হেরে গেলে সেই হার অন্তত সম্মানযোগ্য হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তারা যা করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য। বিশ্বকাপের দাবিদার হলুদ জার্সির দলটির এই লজ্জাকর পরাজয়ে ভক্তরা ঠিক কাকে দোষ দিবে তা হয়তো ঠিক করতে না পেরেই জনগণের সম্পদ ধ্বংস করার উন্মত্ব উত্সবে মত্ত হয়ে উঠেছিল।