ভবিষ্যত্ আইটি নেতৃত্ব গড়ে তোলার কর্মসূচি

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৪, ১৯:৩৫
কামরুল ইসলাম (২৭)। ঢাকার ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে (ইইই) স্নাতক। পাঁচ বছর আগে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে জীবনের গতিপথ কোন দিকে বাঁক নেয় এ নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিল না। স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেই তাকে পড়তে হয় কঠিন বাস্তবের সামনে। প্রায় এক বছর ধরে চাকরির জন্য ঘোরাঘুরি করেন, চাকরি মেলেনি। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা মনে ঘুরপাক খেতে থাকে। ক্রমশ হতাশার অন্ধকার তাকে গ্রাস করতে থাকে। ঠিক এমন সময় হঠাত্ একদিন পত্রিকার মাধ্যমে কামরুল জানতে পারেন ভবিষ্যত্ আইটি লিডার হওয়ার জন্য আবেদনপত্র চাওয়া হয়েছে। দেরি না করে তিনি অনলাইনে আবেদনপত্র জমা দেন। বাছাইয়ে টিকেও গেলেন। এরপর অনলাইন পরীক্ষা এবং মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এবং চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়ে কুমিল্লায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন অ্যাকাডেমিতে (বার্ড) প্রশিক্ষণ গ্রহণ। ‘আমি যেন আমার পথেকর ঠিকানা খুঁজে পেলাম। এফটিএফএল কর্মসূচিতে প্রশিক্ষণ আমাকে সত্যিকার অর্থেই ভবিষ্যত্ আইটি লিডার হওয়ার পথ বাতলে দিয়েছে।’, বলেন কামরুল। ১৫০ জন স্নাতক তরুণ-তরুণী সরকারের লিভারেজিং আইসিটি ফর গ্রোথ, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্স প্রকল্পের অধীনে ফাস্ট ট্র্যাক ফিউচার লিডার (এফটিএফএল) কর্মসূচিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে। সুনিবিড় আর অপরুপ প্রকৃতিক সৌন্দর্য ঘেরা ১৫৬ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত বার্ডে এসব তরুণ-তরুণীদের প্রদান করা হয়েছে এক মাসের প্রশিক্ষণ। ২৯ মে থেকে শুরু হয় তাদের প্রশিক্ষণ, শেষ হয় ২৭ জুন। প্রশিক্ষণের বিষয় ছিল সফট স্কিল ও হার্ড স্কিল বেসিক। আইটি খাতের আমাদের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হচ্ছে কমিউনিকেশনে দক্ষতার অভাব। এতে দক্ষ করে তোলার জন্যই এলআইসিটি প্রকল্প প্রথমেই এফটিএফএল কর্মসূচি নাম দিয়ে প্রথম ব্যাচে ১৫০ জনকে এফটিএফএল ফাউন্ডেশন কোর্স নামে এক মাসের প্রশিক্ষণ প্রদান করে। এরপর ঢাকায় বিসিসি ও বিআইটিএমে শুরু হবে দুই মাসের প্রফেশনাল প্রশিক্ষণ। অভিজ্ঞ শিক্ষক, আইটি বিশেষজ্ঞরা সফট স্কিলের উপর এদের প্রশিক্ষণ দেয়। কুমিল্লা বার্ডের প্রশিক্ষণে প্রদান করা হয় নানা ধরনের প্রশিক্ষণ। এর মধ্যে ছিল নেগোশিয়েশন স্কিলস, ক্রিয়েটিভিটি, ইনোভেশন, বিজনেস এথিক্স, সফট স্কিল প্রভৃতি। এখানে চলমান প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষকরা ছাড়াও উপস্থিত থেকে প্রশিক্ষণার্থীদের উত্সাহ দিয়েছেন আইসিটি সচিব মো. নজরুল ইসলাম খান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কামালউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) নির্বাহী পরিচালক এসএম আশরাফুল ইসলাম, এলআইসিটি প্রকল্প পরিচালক মো. রেজাউল করিম, এনডিসি ও উপ-প্রকল্প পরিচালক তারেক এম বরকতউল্লাহ, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মোস্তফা জব্বার, বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাশরুর, বাংলাদেশ কল সেন্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আহমেদুল হক ববি প্রমুখ। প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে উপস্থিত হয়ে এন আই খান আইটি খাতে সরকারের নানা উদ্যোগ ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তার প্রণীত চার ধাপের কর্মপরিকল্পনার কথা এবং আগামীতে ডিজিটাল বাংলাদেশ কেমন হবে তা অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বুঝিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘চার ধাপের প্রথম ধাপে রয়েছে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্রের (ইউআইএসসি) মাধ্যমে কম্পিউটার লিটারেট মানুষ তৈরি করা। ইতোমধ্যে তৃণমূলে প্রায় তা এক লক্ষ তরুণ-তরুণীকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এক লক্ষ ফ্রিল্যান্সার তৈরির কর্মসূচি চালু করেছে। এরইমধ্যে ২০ হাজার ফ্রিল্যান্সার তৈরি হয়েছে বাকি ৮০ হাজার এ বছরের মধ্যেই তৈরি করা হবে। তৃতীয় ধাপে রয়েছে ফ্রিল্যান্সার থেকে এন্টারপ্রেনার (উদ্যোক্তা) তৈরি। ইতোমধ্যে তৈরি হওয়া ফ্রিল্যান্সারদের মধ্য থেকে প্রথম পর্যায়ে দুই হাজার উদ্যোক্তা তৈরি করা হচ্ছে। চতুর্থ ধাপে রয়েছে এন্টারপ্রেনার টু বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) বা আইটি ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। দেশের জেলা ও বিভাগে যেসব হাইটেক পার্ক গড়ে উঠছে সেখানে এসব এন্টারপ্রেনারদের জায়গা দেওয়া হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি দেশিয় উদ্যোক্তারা হাইটেক পার্কে নিজস্ব কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনা করবে এবং নিজেদের আইটি শিল্পপতি হিসেবে গড়ে তুলবে। এ ছাড়াও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের বিশাল বাজার থেকে বাংলাদেশি তরুণদের অর্থ আয়ের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য মোবাইল অ্যাপ তৈরিতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। এনআই খান টানা দেড় ঘণ্টা ধরে তার বক্তব্যে এভাবেই দেশের আইটি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার কথা তুলে ধরেন। ক্লাসের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এনআই খান বলেন, ‘শুধু প্রশিক্ষণ নিলেই হবে না, ট্রান্সমিট করতে হবে।’ মানুষের সাফল্যের সাফল্যের জন্য প্রয়োজন সুযোগের। রাষ্ট্র যদি সেই সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়, তা সামগ্রিকভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের সাফল্যের কারণ হতে পারে। এলআইসিটি প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার সীমিত আকারে হলেও দেশের তরুণ-তরুণীদের জন্য সেই সুযোগ সৃষ্টি করতে চায়। কুমিল্লায় ১৫০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে দিয়ে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে ৩০ হাজার দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে এলআইসিটি প্রকল্পের। এসব দক্ষ জনবল ক্রমান্বয়ে দেশের আইটি খাতে নেতৃত্ব প্রদান করবে। মধ্য আয়ের ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে তাহলে অনেকটাই এগিয়ে যাবে দেশ।  মো. ইফতেখার হোসেন