এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বিতর্ক তৈরি করে বেড়ানো ক্রীড়াবিদ সম্ভবত মারিও বালোতেল্লি। ইতালিয়ান এই তারকা কখনো দর্শকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, কখনো হোটেলে আগুন লাগিয়ে, কখনো কোচের সঙ্গে গণ্ডগোল করে, কখনো নিয়ম না মেনে গাড়ি চালিয়ে বিতর্ক তৈরি করেই চলেছেন।
সদাসর্বদা এই বিতর্কে পড়তে পড়তে বিরক্ত হয়েই একবার জার্সির নিচে আরেকটা টি-শার্ট পরে, সেখানে লিখে এনেছিলেন—হোয়াই অলওয়েস মি; সবসময় আমিই কেন?
ভালো প্রশ্ন।
এই প্রশ্নটা সাকিব আল হাসানও করতে পারেন। তিনিও বলতে পারেন—আমাকে নিয়েই কেন সবসময় বিতর্ক হয়!
বিতর্ক যে সাকিব আল হাসানের কতটা পিছু নিয়েছে, তা আর বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। সেই ক্যারিয়ারের শুরু থেকে যেমন দেশের সেরা ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজেকে; তেমনই প্রায় শুরু থেকেই ঝাঁপ দিয়েছেন বিতর্কের আগুনে। সর্বশেষ ‘প্রয়োজনে জাতীয় দলে আর খেলব না’ কথিত এমন হুমকির প্রেক্ষিতে জীবনের সবচেয়ে বড় দণ্ডটা পেয়েছেন—ছয় মাসের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হয়েছেন এবং দেড় বছর দেশের বাইরের অর্থকরী খেলাগুলো আর খেলতে পারবেন না।
এটা কী লঘু পাপে গুরুদণ্ড?
এই প্রশ্নে জাতি মোটামুটি তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। এক ভাগ সাকিবের মাঠের পারফর্মেন্সের পাশাপাশি মাঠের বাইরে তার আচরণে ক্ষুব্ধ, হতাশ অনেকদিন ধরেই। তারা বলছেন, শাস্তি ঠিকই হয়েছে। আরেক ভাগ বলছেন, ম্যারাডোনা-সুয়ারেজ-বালোতেল্লিকে যার যার দেশ আগলে রাখে; একটু আধটু খারাপ আচরণের কারণে আমরা সাকিবকে নিষিদ্ধ করব কেন? এই শাস্তি পুরোটাই প্রত্যাহার করতে হবে। আর এর মাঝে একটা মধ্যপন্থী অংশ তৈরি হয়েছেন। তারা বলছেন, সাকিব অন্যায় করেছে ঠিকই। কিন্তু তাকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তাতে সাকিবের চেয়ে দেশের ক্ষতি বেশি। অতএব শাস্তিটা কমানো হোক।
আমরা এই শাস্তি সঠিক বা ভুলের আলোচনার চেয়ে বরং একটু সাকিবের এই পর্যায়ে আসার প্রেক্ষাপটটা আলোচনা করতে পারি। সাকিব কী রাতারাতি এমন দুর্বিনীত, বদরাগী ছিলেন? হয়তো প্রকৃতিগতভাবে তিনি একটু অন্যরকম। হয়তো প্রকৃতিগতভাবে নিয়ম মানার প্রবণতাটা একটু কম। তাই বলে ঠিক এখন যে সাকিবকে আমরা দেখছি, এই সাকিবই শুরু থেকে ছিলেন; এটা কোনো বিশ্বাসযোগ্য কথা নয়।
সাকিবের ক্যারিয়ারের শুরুর সময়টায় লাজুক লাজুক চেহারার মিষ্টি হাসির ছেলেটির সঙ্গে বরং এইসব কথিত ভাবমূর্তি মেলানোই কঠিন। তাহলে কে সাকিবকে এই জায়গায় নিয়ে এলো?
কিছু বাইরের প্রশ্রয়-উস্কানি আছে, তবে আসল দায়টা নিতে হবে ক্রিকেট বোর্ডকে।
সাকিবকে আসলে শুরুর দিনগুলো থেকে কখনো কেউ মাথায় হাত রেখে বোঝানোরই চেষ্টা করেনি, এভাবে নয়, এভাবে নয়।
অশোভন আচরণের জন্য সাকিব প্রথম আলোচনায় আসেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২০১০ সালের সেই ঐতিহাসিক হোয়াইট ওয়াশের ম্যাচটাতেই। সেই ম্যাচে সেঞ্চুরি করা সাকিব ৯২ রানে যখন ব্যাট করছিলেন, তখন একজন দর্শক সাইড স্ক্রিনের সামনে ঘোরাঘুরি করছিলেন। হঠাত্ করেই সাকিব তেড়ে এসে ব্যাট দিয়ে রাগান্বিত প্রতিক্রিয়া দেখান এবং মুখে অশোভন ভাষা প্রয়োগ করেন। সে যাত্রা তাকে ডেকে সতর্ক করার চেয়ে বেশি কিছু করা হয়নি।
এরও কিছুদিন আগে অধিনায়ক সাকিব জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঘরের মাটিতে একটা ম্যাচ হারার পর সংবাদ সম্মেলনে বলেন—এটা আমার দল ছিল না।
এই ছোট দুটি ঘটনাই আসলে বিনাপ্রশ্নে পার পেয়ে যায় বোর্ডের কাছে। তারা এ নিয়ে কোনো শাস্তি দেওয়া বা সাকিবকে সতর্ক করার প্রয়োজন বোধ করেনি। এর ফলটা আমরা দেখতেই থাকলাম পরের বছরগুলোতে। সিলেটে, ঢাকায়, খুলনায় সরাসরি দর্শকের সঙ্গে গণ্ডগোল, সাবেক ক্রিকেটারদের নিজের কলামে অশোভন কথা বলা, ড্রেসিংরুমে বসে ক্যামেরার দিকে অশ্লীল ইঙ্গিত করা, একাধিকবার সংবাদ সম্মেলনে আক্রমণাত্মক আচরণ করা, মাশরাফি বিন মুর্তজার সঙ্গে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়ানো; এমন ঢের ঢের ঘটনা ঘটতে থাকল।
একটু ভেতরে গিয়ে ভাবলে দেখা যাবে, শুরুর দিকের ওই ছোট ছোট ঘটনাগুলোতে বোর্ড কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানোতে এই অবস্থায় আসার ‘প্রেরণা’ পেয়েছেন সাকিব। এটা আসলে শুধু সাকিবের ব্যাপারে নয়, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কখনোই প্রাথমিক পর্যায়ে ক্রিকেটারদের আচরণ নিয়ে কাজ করে না। তামিম ইকবাল বিজনেস ক্লাসের টিকিট না পেয়ে টিকিট ছুড়ে দেন, ড্রেসিংরুমে অ্যাক্রিডেশন ছাড়া ঢুকতে না পেরে হইচই করেন। মুশফিক প্রধান নির্বাচকের সঙ্গে তর্কের এক পর্যায়ে কাচে ঘুষি মেরে হাত কেটে ফেলেন, সংবাদ সম্মেলনে দল নিয়ে সমালোচনা করেন। এগুলো আমাদের সাংবাদিকদের জন্য লোভনীয় ঘটনা; এসব ঘটলে আমাদের ভালো লাগে। কিন্তু বোর্ড কেন এসব ঘটনায় পদক্ষেপ নেন না? না নিলে কী হয়, এবার দেখুন।
এতক্ষণের আলোচনায় অবশ্য মনে হয়, বোর্ড আসলে ‘প্রোঅ্যাক্টিভ’ না বলেই শুধু সমস্যা হচ্ছে। তারা এমনিতে ধোয়া তুলসীপাতা, শুধু ক্রিকেটারদের সময়মতো আগে শাস্তি দেয়নি। আসলেই কী তাই? বোর্ড কী আসলেই ধোয়া তুলসীপাতা? এই বিতর্কিত ঘটনাগুলোয় বোর্ডের ভূমিকা এমনিতেই কী যথেষ্ট খারাপ নয়।
সাকিব প্রসঙ্গেই থাকি। সাকিবের সর্বশেষ দুটি কাণ্ড নিয়ে আলাপ করা যাক।
প্রথমত তিনি ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে তার স্ত্রীকে অবমাননাকারীদের গায়ে হাত তুললেন। নাগরিক হিসেবে কাজটা আমরা প্রশংসা করতে পারি। একজন ‘ইভটিজার’ হলেও তো প্রতিবাদের হাতে পড়েছে। কিন্তু সমস্যাটা হলো, একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ম্যাচ চলাকালীন ড্রেসিংরুম থেকে বের হয়ে কারো সঙ্গে বিবাদে জড়ানো তো দূরে থাক, সাধারণ কারো সঙ্গে আলাপও করতে পারেন না; আইসিসির নিষেধাজ্ঞা আছে।
এখন কথা হলো, এই কাণ্ডে সাকিব তো যা করেছেন, করেছেনই। বোর্ডের সিস্টেমটা কি ঠিক ছিল?
প্রশ্ন এখানে অনেকগুলো। ড্রেসিংরুমে মোবাইল চালু থাকার কথা না, বাইরে থেকে কারো ঢুকতেও পারার কথা না। তাহলে সাকিব কীভাবে বাইরের খবর পেলেন? তার মানে সিকিউরিটি নিশ্ছিদ্র নয়! এরপর সাকিব বের হলেন কী করে? কারো অনুমতি নিয়ে গেলে সেই অনুমতি কেন দিলেন? তিনি কেন শাস্তি পাননি? অনুমতি না নিয়ে বের হলে দায়িত্বে অবহেলার জন্য ম্যানেজারের কী শাস্তি হয়েছে? ম্যানেজারের মোবাইল চালু থাকে; তার মাধ্যমে খবর এলে সাকিব যে বেরিয়ে যাচ্ছেন, এটাও তার জানার কথা।
এবার আসুন সর্বশেষ প্রসঙ্গে। সাকিব ক্যারিবিয় প্রিমিয়ার লিগে (সিপিএল) খেলতে গেলেন। বলা হলো, সাকিব অনাপত্তিপত্র (এনওসি) না নিয়ে গেছেন। সাকিব বললেন, শেষ মুহূর্তে তিনি এনওসি না পাওয়ায় ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান আকরাম খানকে ফোন করেছিলেন। চট্টগ্রামে থাকা আকরাম নাকি বলেছেন, ‘যাও, ভালো খেলো। আমি ফিরে ওটা সই করে পাঠিয়ে দেবো।’
এখন আকরাম সেটা অস্বীকার করছেন। অস্বীকার করলেও তিনি যে কথা বলেছেন, সাকিবের সঙ্গে সেটা অস্বীকার করেননি। এখন ক্রিকেট অপারেশন্স চেয়ারম্যানের ক্ষমতা এত কম হবে কেন যে, সাকিব মুখে অনুমতি চাওয়ার পরও সেটা তিনি করে দিতে পারবেন না। এই সামান্য কাগুজে জটিলতা এত দূর পৌঁছায় কেন? এ জন্য আকরাম খানের জবাবদিহিতাটা কোথায়!
আমার প্রশ্ন আরও পেছনে। সাকিবের এনওসির জন্য এভাবে দ্ব্বারে দ্বারে ফোন করতে হবে কেন? সাকিব সিপিএল খেলতে যাবেন, এটা কী গতকাল ঠিক হয়েছে? কয়েক মাস আগেই জানা কথা, তিনি যাবেন। তাহলে বোর্ডের নিজস্ব বিশাল কর্মীবাহিনী কী করে? তারা কেন সাকিবের সূচির খবর রেখে এনওসি হবে কি হবে না; সেটা ঠিক করে ফেলতে পারেন না। জাতীয় দলে ও তার আশপাশে সাকুল্যে আমাদের জনা কয়েক খেলোয়াড়; এর মধ্যে সাকিবই যা একটু দেশের বাইরে খেলে থাকেন। বিশাল ক্রিকেট অপারেশন্স বিভাগ তার খোঁজ না রাখতে পারলে তো এদের থাকারই যৌক্তিকতা থাকে না।
হ্যাঁ, সাকিব নতুন কোচের সঙ্গে তর্ক করতে গিয়ে বেফাঁস কথা বলে অন্যায় করেছেন। সেটা কোচ হাতুরুসিংহে ই-মেইল করে বোর্ডকে জানিয়েছেন। কথা হলো, আরও অনেকবারের মতো কোচ বনাম বোর্ডের এই গোপন মেইল ফাঁস হলো কীভাবে? আমরা সাংবাদিকরা চাইব, যেন ফাঁস হয়। কিন্তু এটুকু ঠেকানোর মতো যোগ্যতাও বোর্ডের থাকবে না?
একেবারে শেষ প্রান্তে চলে এসেছি আমরা। এবার বলি, শাস্তিটা কি ঠিক হলো?
একটুও না। সাকিবকে বিদেশে খেলা নিষিদ্ধ করতে পারেন; যদি মনে করেন, সাকিব আসলেই এত বড় অন্যায় করেছে। কিন্তু তাকে দেশের হয়ে খেলায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় কার ক্ষতি বেশি? সাকিবের, নাকি বাংলাদেশের। তাকে একটা সময়ের জন্য এনওসি না দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এটাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আট মাস পরে বিশ্বকাপ, সেখানে ছয় মাসের জন্য দেশের সেরা ক্রিকেটারকে ক্রিকেটের বাইরে রাখাটা তো দেশেরই সর্বনাশ। তাও যদি চুরি-ছিনতাই করে ধরা পড়ত!
এখন আমরা কোনো ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বিশ্বাস করতে চাই না। আমি মনে করি না, নির্দিষ্ট একটি ক্লাবকে ঠেকানোর জন্য গত প্রিমিয়ার লিগের মতো এবারও বিসিবি উঠে পড়ে লেগেছে। সেই ক্লাবে যাতে সাকিব খেলতে না পারেন, সে জন্যই ছয় মাস তাকে ক্রিকেটের বাইরে রাখা হয়েছে; এমনও বিশ্বাস করতে চাই না। আমরা বিশ্বাস করতে চাই না; বোর্ড প্রেসিডেন্টের একজন প্রিয় পরিচালকের ভুল ঢাকতে বারবার সাকিবকে বলির পাঠা হতে হচ্ছে।
আমরা শুধু বলতে চাই—ক্রিকেটারদের সতর্ক রাখুন, তারও আগে নিজেরা সতর্ক ও সত্ থাকুন; তা না হলে জিম্বাবুয়ে হয়ে উঠতে আর বেশি দেরি নেই বাংলাদেশের!
