হূদয় কাড়ে রমজানে মসজিদে নববীর

পরিবেশ, ইফতার ওতারাবী

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৪, ২১:৩৪
আল্লাহর ঘর কা’বার পথে- হজ্জ মৌসুমে যেমন সারা বিশ্বের সামর্থবান মুসলমানদের কাফেলা ছোটে তেমনি মাহে রমযানেও তার কমতি নেই বরং বেশী মনে হয়। দেখে যেন মনে হয় মানুষের মহাসমুদ্র। মানুষ কত যে আল্লাহর প্রেমিক তা রমযানে মক্কা ও মদিনায় না গেলে বুঝা যায় না, অনুমানও করা যায় না। পবিত্র কা’বা ঘর বেষ্টিত মসজিদুল হারাম এবং রসূলুল্লাহ (স.) এর রওয়াজা বেষ্টিত মসজিদে নব্বীতে ইফতার এবং সালাতুল তারাবী (তাদের ভাষায় কিয়ামুল নাইল) এর নামাযের সময় এক অপূর্ব ও অবর্ননীয় বেহেশতি পরিবেশের সৃষ্টি হয়। উভয় স্থানেই ইফতারের আধা ঘন্টা পূর্ব থেকেই চলে দস্তরখান বিছানোর কাজ। লক্ষ লক্ষ রোযাদার মুসলিম ভাইবোন সারিবদ্ধ হয়ে বসে আছে। তাদের কারো নিজস্ব ইফতারীর আয়োজনের চিন্তা ভাবনার কোনই প্রয়োজন নেই। বসে থাকলেই যথেষ্ট। তাদের প্রত্যেকের সামনে ইফতারী চলে আসবে। এজন্য মসজিদ কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেই রেখেছেন। একটি লোকও বাদ যাবে না সময়মতো ইফতারী পাবার খাদ্য সামগ্রী থেকে। প্রত্যেকের সামনেই চলে আসবে কাঁচা-আধাপাকা হরেক রকম খেজুর, টক দই, হালুয়া ও পাউরুটি। যমযমের পর্যাপ্ত পানিতো প্রতিটি সারির মাঝে রয়েছেই। উভয় মসজিদেই ২০/৩০ লক্ষ লোক প্রতিদিন ইফতারী করছে অথচ ইফতারীর সময় কোথাও কোন হৈ হুল্লোড়, চিত্কার এমনকি কোন কথাবার্তা নেই। সমগ্র মসজিদ নীরব ও নিস্তদ্ধ। কি অপরূপ সে পরিবেশ ও দৃশ্য যা অবর্ননীয় এক কথায় মনোমুগ্ধকর। পৃথিবীর কোথায়ও এত বড় মহাসমাবেশে এমনি নীরবতা পাওয়া যাবে না। সব’চে আনন্দ লাগে এবং নিজকে ধন্য মনে হয় যখন হূদয়ে জাগ্রত হয় যে, ” আমি ২০ থেকে ৩০ লক্ষ লোকের সাথে একত্রে একই খেজুর ও পানি দ্বারা ইফতার করছি। এতে আনন্দ অশ্রু ঝরবেই এবং নিজকে ধন্য মনে হবেই এতে কোন সন্দেহ নেই। মসজিদে নববী আরো এক ধাপ এগিয়ে। সেখানে মূল মসজিদের বাইরে থেকেই শত শত লোক ইফতারীর লোক সংগ্রহের জন্য দাড়িয়ে থাকে। যে তাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছে তাকেই সালাম দিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে রোযাদার ভাইদের ইফতারীর দাওয়াত দিচ্ছে যাতে তিনি তাদের ইফতারীর আয়োজনে শামিল হন। সত্যিই এ পরিবেশ মনোমুগ্ধকর ও ইসলামী ভাতৃত্ববোধ সৃষ্টির অনন্য দৃষ্টান্ত যা পৃথিবীতে নজিরবিহীন। মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর ভেতরে তৈল বর্জিত খাদ্যদ্বারা ইফতারী হয় যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যে ইফতারী শেষ বাকী ৩ মিনিটের মধ্যে দস্তরখান গুছিয়ে নেবার কাজ সেরে ফেলা হয়। এজন্য মুসল্লীদের কোন কাজ করতে হয় না। পরিবেশনকারীরাই এ কাজ করে সকল নামাযের স্থান পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন করে দেয়। এরপরে কেবলমাত্র হাটাচলার পথে পানি বা, অন্য কিছু পড়ে থাকলে মাগরিবের নামাযের পর পরও এগুলো সরিয়ে ডেটল/স্যাভলন দ্বারা ওয়াশ করে দেয়। ফলে কোন অবস্থাতেই মনে হবে না যে খানিকক্ষন আগে এ মসজিদে লক্ষ লক্ষ লোকের ইফতারী হয়েছিল। সত্যিই এর পরিচ্ছন্নতার কাজও ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। প্রায় পৌনে দু’ঘণ্টা বিরতীর পর শুরু হবে এশার নামায ও তারাবীর নামায। রাত ৯ টায় শুরু হওয়া নামায ১১:১৫ মিনিটে শেষ হয়। প্রায় ২ ঘন্টা ১৫ মিনিটে নামায শেষ হয়। বাংলাদেশী মুসলমানদের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছিল এ দীর্ঘ সময়ে কিভাবে নামাযে থাকবো। তাই মনে কিছু ভীতি ও শঙ্কা কাজ করছিল। কিন্তু সালাতুত তারাবী যখন শুরু হলো তখন প্রথম রাকাতের আয়াত পাঠ শেষে ইমাম যখন রূকুতে যাচ্ছে তখন মনে হলো যেন তাড়াতাড়ী রূকুতে গেল, আরও কিছু আয়াত পড়লো না কেন ? এমনিভাবে ২০ রাকাত যখন শেষ হলো তখন মনে হয়নি যে ২ ঘন্টা ধরে নামায পড়েছি। এতে করে আমার এবং আমার সাথী ভাইদের কোন কষ্ট বা পায়ে ব্যথা অনুভব হয়নি। দীর্ঘ সময় নামায পড়ায় কষ্ট না অনুভূত হওয়ার কারণ হচ্ছে ইমাম সাহেবদের সুরেলা কণ্ঠে উচ্চারিত কুরআনের প্রতিটি শব্দ। আয়াত যা ছিল পরিষ্কার এবং প্রতিটি মুসলমান নর নারীর বোঝার উপযোগী। তাদের কণ্ঠ যেমন আমাদের আকৃষ্ট করেছে তেমনি যেখানে যেখানে ভয়ের। আযাবের আয়াত পাঠ করেছে সেখানে তাদের কণ্ঠের ক্রন্দনভাব আমাদের আবেগে আপ্লুত করেছে। অনুরূপভাবে যেখানে ছিল রহমতের। আল্লাহর পথে চলার আহ্বান সেখানে তাদের কণ্ঠের অনুরূপ ভঙ্গি আমাদের আন্দোলিত করেছে। আরবী ভাষাভাষী মানুষ না হয়েও মনে হয়েছে যেন আমরা বুঝতে পারছি তিনি কি বলছেন। তাঁদের কণ্ঠের মাধুর্যতা, উচ্চারনের তাল ও লয় যেন এক অপরূপ মহিমায় সমগ্র নামাযীকে আকৃষ্ট ও ধন্য করেছে। ঐ তেলাওয়াত যেমন ছিল হূদয়স্পর্শী তেমনি যখন তাদের কণ্ঠে আবেগপ্রবন আয়াত উচ্চারিত হয়েছিল তখন অন্তর হয়েছিল দোযখের ভয় ভীতি, হাশরের ময়াদানে হিসাব নিকাশ প্রদানের দিনের মত ভীত সন্ত্রস্ত্র আবার কখন কখন হয়েছিল হেদায়েতের পথে চলার শক্তি পাবার প্রেরণা। সর্বোপরি অধিকাংশ আয়াতের অর্থ বুঝিনি সত্য তবে কোরআন তাঁদের কণ্ঠে শুনে কোরআন পড়েছি বলা যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে :আল্লাহর ঘর বেষ্টিত মসজিদুল হারাম এবং বিশ্ব নবীর রওয়াজা বেষ্টিত মসজিদে নববী আমরা সকলেই মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে জানি এবং মানি। তাই যদি হয় তাহলে ঐ প্রাণকেন্দ্রদ্বয়ে যদি তারাবীর নামায দু’ ঘন্টা পনের মিনিট ব্যাপী পড়া হয় এবং তাদের ইমামের পড়া কোরআনের প্রতিটি আয়াত যখন নামাযরত প্রত্যেক মুসলিম নর নারীর বোধগম্য হয় তাহলে আমাদের দেশের নামাযে এত অষ্পষ্টতা কেন এবং কেনই বা কুরআন পড়ায় এত তাড়াহুড়া। এ নামায যদি তাড়াহুড়ার নামায হতো তাহলে ওখানে কেন আমাদের দেশের মত পড়া হয়না। যতটুকু বুঝি তাতে মনে হয় কুরআনের বিধিবিধান মানুষকে অবহিত করা, যাতে মানুষ ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য বুঝতে পারে। জানতে ও বুঝতে পারে কোনটা গ্রহণীয় আর কি কি বর্জনীয়। তাই ইমাম সাহেবগণ সুন্দর করে প্রতিটি আয়াত স্পষ্ট করে পড়েন এবং আয়াতের মর্মার্থ মানুষকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে বুঝানোর চেষ্টা করেন। আফসোস হয় আমাদের মসজিদগুলিতে যদি এমন পরিচ্ছন্ন কুরআন পাঠ হতো! লেখক :পরিচালক, (ভূমি-স্টেইট) রাজউক, ঢাকা।