দুই যুগের অপেক্ষার অবসান

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৪, ২১:৩৯
ম্যাক্সি রড্রিগেজের প্রচণ্ড গতির শটটি প্রায় ফিরিয়েই দিচ্ছিলেন জ্যাসপার চিলিসেন। কিন্তু ক্রস বারে লেগে দিক পাল্টে সেটা আশ্রয় নিলো জালে। তীব্র চিত্কারে ফেটে পড়লেন আর্জেন্টাইন সমর্থকরা। শূন্যে হাত উচিয়ে আনন্দে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কেঁদে ফেললেন লিওনেল মেসি। সাও পাওলোর অ্যারেনা করিন্থিয়াসের গ্যালারি তখন আর্জেন্টিনার আনন্দে উন্মাতাল। অন্যদিকে হতাশায় ম্রিয়মাণ নেদারল্যান্ডস শিবির। টান টান উত্তেজনায় এতক্ষণ আটকে রাখা দম ছাড়লেন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি আর্জেন্টিনা সমর্থক। তবে এ সব কিছুও হয়তো ব্যাপারটার বিশালত্ব কিংবা সমর্থকদের আবেগ পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারছে না। প্রায় প্রতিবারই এক ঝাঁক প্রতিভাবান খেলোয়াড় নিয়ে বিশ্বকাপে আসা এবং শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গ। গত দুই যুগ ধরে ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের আসরে আর্জেন্টিনার যাত্রাটা ছিল এমনই। সেই হতাশাজনক যাত্রার ইতি ঘটলো গত বুধবার রাতে। টাইব্রেকারের ভাগ্যপরীক্ষায় নেদারল্যান্ডসকে ৪-২ গোলে হারিয়ে চব্বিশ বছর পর ফাইনালে পা রাখলো দিয়েগো ম্যারাডোনার দেশ। মেসির নিষ্প্রভতার রাতে দুইটি শট ঠেকিয়ে দিয়ে যেই রাতের নায়ক গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো। পুরো টুর্নামেন্টেই নিজেদের ছায়া হয়ে থাকা আর্জেন্টিনাকে কাগজে কলমে হয়তো সেমিফাইনালে এগিয়ে রেখেছিলেন খুব কম লোকই। সেই গ্রুপপর্ব থেকে প্রায় প্রতি ম্যাচেই মেসির একক কৃতিত্বের উপর ভর করে শেষ চারে আসা দলটির চাইতে তাই ডাচদেরই এগিয়ে রেখেছিলেন অনেকে। কিন্তু চব্বিশ বছরের শোককে আর্জেন্টিনা যে এভাবে শক্তিতে পরিণত করবে সেটা কে ভেবেছিলেন? সেই শক্তিতে ভর করে দলের প্রত্যেকেই যেন হয়ে গেছেন একেকজন মেসি। রক্ষণে রোজো, জাবালেতা, বিগলিয়া, ডেমিকেলিসরা খেললেন সর্বস্ব বাজি রেখে। রক্ষণ আক্রমণের সেতুবন্ধ রচনায় অসামান্য দক্ষতা দেখালেন হ্যাভিয়ের ম্যাশেরানো। দুই উইংয়ে লাভেজ্জি আর জাবালেতা দেখালেন টুর্নামেন্টে নিজেদের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত নৈপুণ্য। ফলে মেসির নিষ্প্রভতা কিংবা অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার অনুপস্থিতি চোখেই পড়লো না। খেলা শেষে মনেই পড়লো না যে, ম্যাচের পুরো ১২০ মিনিটে নেদারল্যান্ডস গোলসীমানায় একবারও বলে পা ছোঁয়াতে পারেননি মেসি। প্রায় একই অবস্থা ছিল ডাচদের সেরা তারকা আরিয়েন রোবেনেরও। খেলার প্রথম ৪৫ মিনিটে মাত্র একটি পাস দিতে সমর্থ্য হন রোবেন! তবে পার্থক্য হচ্ছে, এই ম্লান রোবেনের জায়গা নিতে পারেননি অন্য কোন ডাচ। কিন্তু মেসির অনৌজ্জ্বল্যকে ঢেকে দেয় তার সতীর্থদের পারফরম্যান্স। পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে ১৯৯০ সালে ফাইনালে খেলার পর আগামী রবিবারের ফাইনালই হবে আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল। রিও ডি জেনিরোর ঐতিহ্যবাহী মারাকানা স্টেডিয়ামে সেখানে জার্মানির মুখোমুখি হবে তারা। ১৯৯০ সালের সর্বশেষ ফাইনালে ইতালির রোমে জার্মানীর কাছে ১-০ গোলে পরাজিত হয়ে হতাশ হয়েছিল আর্জেন্টিনা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে ফাইনালে পৌঁছানো আর্জেন্টিনার কোচ আলেসান্দ্রো সাবেয়া সেমিফাইনাল শেষে বলেছেন, ‘এটা দারুণ একটি জয়। ম্যাচটি অত্যন্ত কঠিন ছিল। আমার কিছু কিছু খেলোয়াড় পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিনটি আমাদের হয়ে থাকলো।’ সাও পাওলো বুধবার রাতে কোন দলই নির্ধারিত সময়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ফাঁকি দিতে পারেনি। বলা চলে, উল্লেখযোগ্য কোন সুযোগ তৈরী করতে পারেনি কেউই। একমাত্র লিয়নেল মেসির একটি ফ্রি-কিক ডাচ গোলরক্ষক সিলিসেন কোনরকমে রক্ষা করেন। পেটের পীড়ার কারণে গতকাল ডাচ অধিনায়ক রবিন ফস পার্সির খেলা প্রায় অনিশ্চিতই ছিল। কিন্তু তারপরেও হাই ভোল্টেজ এই ম্যাচের কারণে ডাচ কোচ লুইস ফন গাল কোন ঝুঁকি নিতে চাননি। যদিও ম্যাচে তার উপস্থিতি খুব একটা চোখে পড়েনি। অতিরিক্ত সময়ে অবশ্য তার পরিবর্তে ক্লাস হান্টেলারকে নামানো হয়। ম্যাচের শেষের দিকে ডাচ উইঙ্গার রবেনের একটি শট আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার মাশেরানো পায় না লাগালে ডাচরা হয়তো জয় নিয়েই মাঠ ছাড়তে পারতো। নির্ধারিত সময়ে গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ডি ভ্লার এবং ওয়েসলি স্নাইডারের শট আটকে দেন রোমেরো। যদিও, পুরো ম্যাচে প্রায় একাই মেসিকে অকার্যকর করে রাখা ডি ভ্লারের এমন কষ্ট হয়তো পাওয়া ছিল না। ম্যাচ শেষে অবশ্য ফন গাল স্বীকার করেছেন কোয়ার্টার ফাইনালে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় তিনি পেনাল্টি শ্যুট আউটে আগে সিলিসেনের পরিবর্তে পেনাল্টি বিশেষজ্ঞ টিম ক্রুলকে নামাতে পারতেন। কিন্তু তার আগেই তিনটি পরিবর্তন করে ফেলায় সেই উপায় আর ছিল না। প্রথম সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে বিদায় নেয়া স্বাগতিক ব্রাজিলের পরে এবার হতাশ হতে হলো গতবারের রানার্স-আপ নেদারল্যান্ডসকে। শিরোপার খুব কাছাকাছি গিয়েও দুইবার শিরোপা হাতছাড়া হবার হতাশায় যেন খুব বেশী মুষড়ে পড়েছিল কমলা শিবির। এখন শনিবার ব্রাসিলিয়ায় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটি হতে পারে পরাজিত এই দুই দলের জন্য সান্ত্বনার মিশন। -ওয়েবসাইট/বিবিসি