দক্ষিণ উপকূলে বর্ষা এলেই উত্কণ্ঠা

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৪, ২২:৩৭
সারা বছর ভালো গেলেও বর্ষাকাল এলেই উত্কণ্ঠা বাড়ে দেশের দক্ষিণ উপকূলের কোটি মানুষের। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে প্রতি বছর এ অঞ্চলের লাখ লাখ পরিবার গৃহহীন হচ্ছে। ভূমিহীন এ পরিবারগুলো বেড়ি বাঁধের উপর আশ্রয় নেয়। জীবন-জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমায় রাজধানী ঢাকা কিংবা দেশের বড় শহরগুলোতে। উপকূলে বেঁচে থাকা মানেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে জীবনযুদ্ধে শামিল হওয়া। নদী ভাঙ্গনের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা গেছে, গত ৪৩ বছরে এ অঞ্চলের ১৫টি নদীর কড়াল গ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে শতাধিক গ্রাম। গৃহহারা হয়েছে কয়েক লাখ পরিবার। খোদ নগর সংলগ্ন চরবাড়িয়া, চরমোনাই, চরকাউয়া, চরআইচা ও চরবদনার কীর্তনখোলা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে বিপুল সংখ্যক মসজিদ, স্কুলসহ কয়েক হাজার ঘর-বাড়ি বিলীন হয়েছে। আড়িয়ল খাঁ নদের ভাঙ্গনে শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের কালীগঞ্জ, রাজাপুর ও আটহাজার তিনটি গ্রাম বিলীন হয়ে গেছে। মেহেন্দিগঞ্জের ভাষাণচর, বাগরজা, শিন্নিরচর ও চর এককরিয়া নদী ভাঙ্গনের কবলে মানচিত্র থেকে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। উলানিয়া গ্রামটি মেঘনার ভাঙ্গনে বিলীন হওয়ার পথে। সেখানকার কালীরবাজার নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর এখন উলানিয়া মিয়াঁবাড়ি ও বড়বাজার হুমকির মুখে পড়েছে। গোবিন্দপুর ইউনিয়নের ৯টি গ্রামের মধ্যে মাত্র ১টি গ্রামের অস্তিত্ব আছে। ঐ গ্রামটিকে ৯টি গ্রামে বিভক্ত করে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখা হয়েছে। তাও ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। ঐ এলাকায় দু’ বছর পূর্বে পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী ভাঙ্গন রোধে একটি প্রকল্প গ্রহণ করলেও ঠিকাদার বিল না পাওয়ার অজুহাতে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে গৃহীত প্রকল্পের কাজসহ বহু স্থাপনা ভেসে যাচ্ছে মেঘনার কড়াল গ্রাসে। মেঘনার ভাঙ্গনে উলানিয়ার অদূরবর্তী ভোলার বঙ্গের চর, রাজাপুর, দৌলতখান, গুপ্তের বাজার, সৈয়দপুর, ভবানীপুর, খোদ ভোলা শহরের নিকটবর্তী ধনিয়া, কাঁচিয়া এখন বিলীন হওয়ার পথে। ভোলা শহর থেকে মেঘনার দূরত্ব এখন মাত্র ৭ কিলোমিটার। ভোলা শহর রক্ষায় কাঁচিয়ায় একের পর এক বেড়ি বাঁধ নির্মাণ ও ভাঙ্গন প্রতিরোধে ব্লক ফেলে মেঘনাকে শাসন করার চেষ্টা করা হলেও তা তেমন কাজে আসেনি। বরং নতুন করে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে নাসির মাঝি এলাকায়। জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেলেই এসব এলাকার বেড়ি বাঁধ ভেঙ্গে হু হু করে পানি ঢুকছে ভোলা শহরতলীতে। তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙ্গনে বোরহানউদ্দিনের কাঁচিয়া, পক্ষিয়া, হাকিমউদ্দিন ও পদ্মা মণষা গ্রাম ঝুঁকির মুখে। শাহবাজপুর গ্যাস ফিল্ডের কাছাকাছি চলে এসেছে নদী ভাঙ্গন। ভোলা ও বরিশালের মধ্যবর্তী আলিমাবাদ ইউনিয়নটি কালাবদর নদীর স্রোতে বিলীন হওয়ার পথে। পার্শ্ববর্তী চাঁদপুরা ইউনিয়ন রয়েছে হুমকির মুখে। মেঘনার ভাঙ্গনে পুরান হিজলা, চর মেমানিয়া, মৌলভীরহাট, গঙ্গাপুর, হরিনাথপুর, মল্লিকপুর, বাউশিয়া, বাহেরচর, হিজলা, গৌরবদী ও পালপাড়া গ্রামের কয়েক হাজার ঘর, ১০টি স্কুল এবং ৩টি হাট-বাজার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। মুলাদীর জয়ন্তি ও আড়িয়ল খাঁ নদের ভাঙ্গনে উপজেলার নন্দিবাজার, চরলক্ষ্মীপুর, পাতারচর, বানিমদন, নাজিরপুর, মৃধারহাট, ছবিপুর, গুলিঘাট ও বাটামারা গ্রামের ২ হাজার বাড়ি-ঘর, ৫টি বাজার ও ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গনে বানারীপাড়া-স্বরূপকাঠী সড়কটি ৭ বছর আগে নদীগর্ভে বিলীন হয়। এখন সেখানে বিকল্প সড়ক তৈরি করা হয়েছে। বাবুগঞ্জের সুগন্ধা, আড়িয়ল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গনে রাজগুরু, লোহালিয়া, ক্ষুদ্রকাঠী, বাহেরচর, ঘোষকাঠী, মহিষাদি, রাকুদিয়া, ছানি কেদারপুর, মোল্লারহাট, রহিমগঞ্জ, রফিয়াদি গ্রামের কয়েক হাজার বাড়ি-ঘর নীদগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে উপজেলা সদর ও মীরগঞ্জ বাজার থেকে সুগন্ধা নদীর দূরত্ব মাত্র ১শ গজ। উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ৫টিই নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। হুমকির মুখে রয়েছে বিমানবন্দর ও দোয়ারিকা-শিকারপুর সেতু। উজিরপুরে সন্ধ্যা ও সুগন্ধা নদীর ভাঙ্গনে বরাকোঠা ইউনিয়নের ৫টি গ্রাম ও শিকারপুরের ১০টি গ্রাম এবং গুঠিয়া ইউনিয়নের দাসেরহাট, কমলাপুর, সাকরাল, পরমানন্দ গ্রামের ২০ হাজার ঘরবাড়ি ও ৫টি স্কুল-মাদ্রাসা নদীতে বিলীন হয়েছে। ঐ উপজেলার সাকরাল গ্রামটি সম্পূর্ণ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। শিকারপুর ও শেরেবাংলা ডিগ্রি কলেজ সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গনে বানারীপাড়া উপজেলার কাজলাহাট, জম্বুদ্বীপ, ব্রাহ্মণকাঠী, নাজিরপুর, শিয়ালকাঠী, মসজিদবাড়ির ১৫ হাজার ঘর, ৭টি স্কুল-মাদ্রাসা ও ২টি বাজার গত বছর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এবার শিয়ালকাঠী, দাণ্ডয়াট ও নলশ্রী গ্রাম বিলীন হতে চলেছে। উজিরপুরের সাকরাল গ্রামের বাসিন্দারা জানান, প্রতি বছর আষাঢ় মাস এলেই উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়। এবারো নদী ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বরাকোঠা ইউনিয়নের প্রায় দেড় হাজার পরিবার নদী ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারিয়েছে। চৌধুরীর হাট, দাসেরহাট, হক সাহেবের হাট, কমলাপুর, শিকারপুর এলাকায় তীব্র ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। উজিরপুরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বাদল জানান- প্রতি বছরই নদী ভাঙ্গনের শিকার হওয়া মানুষকে পুনর্বাসন করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প না থাকায় মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। বাকেরগঞ্জের তুলাতলা, তাণ্ডব, খয়রাবাদ, বেবাজ, কাতিভাঙ্গা, রাঙ্গামাটি তুলাতলি নদীর ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। ঐ নদীর কড়াল গ্রাসে হুমকির মুখে রয়েছে কলসকাঠী, বোয়ালিয়া, বাখরকাঠী, নীলগঞ্জ, চরামদ্দি এলাকার কয়েক হাজার বাড়িঘর। প্রতি বছর নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও তা ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের পকেটে যায় বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, ভাঙ্গন প্রতিরোধে কখনোই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বসতভিটা হারানোর মানুষদের অভিযোগ ঃ স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত যে পরিমাণ টাকা নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সে টাকায় ভাঙ্গনকবলিত গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসন করা সম্ভব হতো। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙ্গনের শিকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ২/১ কিলোমিটার দূরে গিয়ে নতুন কোনো বেড়ীবাঁধে বসতি গড়েন; কিন্তু মাত্র ২/১ বছরের ব্যবধানে নদী আবার সেখানে আঘাত হানে। এভাবেই একের পর এক ভাঙ্গনের শিকার হয়ে অসহায় মানুষ এক পর্যায় গ্রাম ছেড়ে রুটি-রুজির সন্ধানে রাজধানী ঢাকা কিংবা বিভাগীয় কোনো বড় শহরে পাড়ি জমায়। এদের ঠাঁই হয় বস্তিতে। কেউ রিকশা চালিয়ে কিংবা ঠেলাগাড়ি ঠেলে আর নারীরা ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালায়। একসময় যাদের ছিলো গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ, শস্যে ভরা মাঠ তারাই নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে এখন নগরজীবনে হতদরিদ্র মানুষের তালিকাভুক্ত হয়ে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি হিসেব মতে- সারাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে ৪০ শতাংশ মানুষ। অথচ নদী ভাঙ্গনের শিকার ও ঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়া উপকূলীয় বিভাগ বরিশালে দারিদ্র্যের হার ৫৩ ভাগ। এ বছর বর্ষা মৌসুম শুরু হতে না হতেই জোয়ারের পানি ও সাগরে নিম্নচাপের কারণে শুরু হয়েছে নদী ভাঙ্গন। নদীতীরের বাসিন্দারা জানান, পানি নামতে শুরু করলে ভাঙ্গন আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। আবারো শত শত বাড়িঘর ও গ্রাম বিলীন হবে দক্ষিণের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৫টি নদীর কড়াল গ্রাসে। এই ১৫টি বড় ও প্রধান নদীর সাথে লড়াই-সংগ্রাম করেই তাদের বেঁচে থাকতে হয়।